চৌধুরী মুঈনুদ্দীনের সাক্ষাৎকার ও বিভ্রান্তি

1


এ বছর শীত একটু দেরিতে এলেও নভেম্বর মাসের শেষের দিকে এসে এখন বেশ জাঁকিয়ে বসেছে। সেই শীত উপেক্ষা করেই গণতন্ত্রের পীঠস্থান ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সামনে ২৭ নভেম্বর একে একে সমবেত হয়েছিলেন যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে থাকা ১৯৭১-এর বিচারপ্রার্থী মানুষেরা। ৭৫টি প্রগতিশীল সংগঠনের মোর্চা ‘আইসিটি সাপোর্ট ফোরাম’-এর ডাকে সাড়া দিয়ে সেদিন সবাই একত্রিত হয়েছিলেন একটিমাত্র দাবি তুলে ধরতে।

আর তা হল, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দোষী সাব্যস্ত এবং সাজাপ্রাপ্ত পলাতক যুদ্ধাপরাধী চৌধুরী মুঈনুদ্দীনকে যেন অবিলম্বে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এই পোস্টটির বিষয়বস্তু আজকের সমাবেশ নিয়ে নয়, চৌধুরী মুঈনুদ্দীনকে নিয়ে।

১৯৭১-এর ইতিহাস জানেন এমন যে কারও কাছেই আলবদর কমান্ডার মুঈনুদ্দীনের বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডে সরাসরি ভূমিকার কথা অজ্ঞাত নয়। তাই সে পুনরাবৃত্তিমূলক আলোচনায় এখন যাচ্ছি না। আরও একটি কারণেও সে আলোচনা এখন নিষ্প্রয়োজন– মুঈনুদ্দীনের অপরাধের বিষয়গুলো এখন আর কেবল ‘কথিত’ কিংবা ‘অভিযোগ’-এর পর্যায়ে নেই; আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ভিকটিম পরিবারের সদস্যদের এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্যে এখন তা আইনগতভাবেও প্রমাণিত সত্যে পরিণত হয়েছে।

এখানে উল্লেখ্য, সাক্ষী নিজে যদি প্রত্যক্ষদর্শী হন, তাহলে তার সাক্ষ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; সে প্রত্যক্ষদর্শী যদি নিজেও ভিকটিম হন, তাহলে সে সাক্ষ্যের গুরুত্ব আর সব কিছু ছাপিয়ে যায়, যা মুঈনুদ্দীনের ক্ষেত্রে ঘটেছে। তার বিরুদ্ধে মামলায় যারা সাক্ষ্য দিয়েছেন, তাদের মধ্যে এমন সরাসরি প্রত্যক্ষদর্শী ভিকটিম সাক্ষীও রয়েছেন (যেমন, সাক্ষী দেলওয়ার) [১][২]।

এই পোস্টটি মুঈনুদ্দীনকে বাংলাদেশে হস্তান্তর সংক্রান্ত আইনি-কূটনৈতিক জটিলতা কিংবা ব্রিটিশ প্রশাসনের দিক থেকে প্রায় দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে নানা দেশের যুদ্ধাপরাধীদের লালন করা নিয়েও নয়। এই পোস্টের বিষয়বস্তু লন্ডনে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম প্রতিনিধি সৈয়দ নাহাস পাশার নেওয়া চৌধুরী মুঈনুদ্দীনের একটি ‘এক্সক্লুসিভ’ সাক্ষাৎকার।

সাক্ষাৎকারটি পড়তে ক্লিক করুন:

http://bit.ly/1g9p66B

সাক্ষাৎকারটির লাইনে লাইনে মিথ্যাচার এবং মানুষকে বিভ্রান্ত করবার চেষ্টা। মূলত সে কারণেই এই পোস্ট লিখতে হচ্ছে। সাক্ষাৎকারের প্রতিটি লাইন ধরে আলোচনার পরিবর্তে মূলত কয়েকটি প্রধান মিথ্যাচার এবং বিভ্রান্তি সৃষ্টির প্রয়াস সচেতন পাঠকের কাছে তুলে ধরাই যথেষ্ট বলে মনে করছি।

১. স্বঘোষিত এক ‘মৃত্যুঞ্জয়ী মহাপুরুষ’-এর অসংলগ্ন বয়ান

সাক্ষাৎকারটিতে একদিকে মুঈনুদ্দীন যেমন একের পর এক দম্ভোক্তি করে গেছেন, অন্যদিকে প্রমাণিত এবং সর্বজনবিদিত কিছু সত্যের বিকৃত উপস্থাপনের চেষ্টাও লক্ষ্যণীয়। তিনি প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মন্তব্য করছেন– ‘‘বিচারক ও তাদের চ্যালাচামুণ্ডারা নিজেরা উল্টো ঝুলে পড়লেও আমাকে ঝোলাতে পারবে না।’’

একবার দাবি করছেন, ‘‘আমাকে মামলার নোটিশই দেওয়া হয়নি’’, তো আরেকবার বলে বসছেন, ‘‘আমার তো কোনো আইনজীবী ছিল না!’’

আবার তিনি নিজেকে একজন মুসলমান হিসেবে উল্লেখ করে অতীতের সব ‘মৃত্যুঞ্জয়ী মহাপুরুষদের’ সঙ্গে নিজেই নিজেকে দিব্যি এক কাতারে দাঁড় করিয়ে ফেলছেন আর বলছেন, ‘‘হায়াৎ-মওত, জীবন-মৃত্যুর সিদ্ধান্ত জমিনে হয় না, আসমানে হয়।’’ অর্থাৎ বিধাতার যদি অভিপ্রায় হয়ে থাকে তার ফাঁসিকাষ্ঠে মৃত্যু হবে না, তাহলে কোনো শক্তিই তাকে সেখানে নিতে পারবে না!

বিধাতার বিচারের উপর মুঈনুদ্দীনের অগাধ আস্থা থাকতেই পারে, তাতে দোষের কিছু দেখি না। সমস্যা হল, তাই যদি হয়ে থাকে তাহলে তাকে এই ধরাধামেই সাক্ষাৎকার দিয়ে বিভ্রান্তিমূলক অপপ্রচার করতে হয় কেন? এটিও বিধাতার হাতেই ছেড়ে দিলে পারতেন।

আর জীবন-মৃত্যুর সিদ্ধান্ত যদি মুঈনুদ্দীনের কথামতো ‘জমিনে না হয়ে আসমানেই’ হয়ে থাকে তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে– ১৯৭১-এর নিহত বুদ্ধিজীবী, ৩০ লাখ শহীদ কিংবা ধর্ষিতা-নির্যাতিতারা কার হাতের ভিকটিম ছিল? পাকিস্তানি মিলিটারি আর তাদের দোসর জামায়াত, শান্তি কমিটি, আলবদর, আলশামসদের? নাকি স্বয়ং সৃষ্টিকর্তার?

আশা করি বিষয়টি নিয়ে তিনি আরেকটু গভীরভাবে ভাববেন। বলতে বাধ্য হচ্ছি, মুঈনুদ্দীনের এই মন্তব্যগুলো ‘চিন্তায় সংলগ্ন’ মানুষের লক্ষণ বহন করে না। যাহোক তা নিয়ে আমাদের ভাবিত হওয়ার প্রয়োজন দেখি না। বরং মনোনিবেশ করা যাক এই সাফাই সাক্ষাৎকারে তার প্রদত্ত বক্তব্যের অসঙ্গতিগুলোতে।

২. আদালতের সমন, ওয়ারেন্ট এবং নোটিশ বিষয়ক মিথ্যাচার

সাক্ষাৎকারে চৌধুরী মুঈনুদ্দীন দাবি করছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল নাকি কোনোদিন তার কাছে অথবা তার উকিলদের কাছে কোনো ধরনের নোটিস জারি করেনি, চেষ্টাও নাকি করেনি। এমনকি দূতাবাসের মাধ্যমে বা সরাসরি তার বা তার দেশের ঠিকানায় কোনোভাবেই নাকি যোগাযোগ করা হয়নি।

মুঈনুদ্দীনের দাবি সত্য নয়। পলাতক আসামির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রচলিত আইন এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন ১৯৭৩-এর যে বিধি, তাই অনুসরণ করা হয়েছে তার ক্ষেত্রে। এখানে পলাতককে খুঁজে বের করে বাড়ি বয়ে গিয়ে নোটিশপত্র দিয়ে আসার এই আবদার একেবারেই অযৌক্তিক।

সবচেয়ে বড় কথা হল, তিনি যদি নির্দোষই হয়ে থাকবেন, তাহলে নিজের সুনাম অক্ষুণ্ন রাখার তাগিদে নিজ দায়িত্বেই ট্রাইব্যুনালের মুখোমুখি হতেন– হয় ব্যক্তিগতভাবে, নয়তো নিযুক্ত আইনি প্রতিনিধির মাধ্যমে।

ট্রাইব্যুনালে তার বিরুদ্ধে মামলার নোটিশ বিষয়ে মুঈনুদ্দীন যা দাবি করেছেন, আসুন দেখা যাক তা কতটা ভিত্তিহীন। রায়ের ২০-২১ নং অনুচ্ছেদে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বিষয়টি তুলে ধরেছেন, যা মুঈনুদ্দীন সযত্নে তার সাক্ষাৎকারে এড়িয়ে গিয়েছেন। উদ্ধৃত করছি [৩]:

(20) [T]he Tribunal, under Rule 29(1) of the Rules of Procedure, took cognizance of offences as mentioned in section 3(2) (a)(b)(g)(h) of the Act of 1973 and issued warrant of arrest for causing appearance of the accused persons as required under Rule 30, by its order dated 02.5.2013.

(21) Dhaka Metropolitan Police (DMP) submitted the execution report before the Tribunal stating that the accused persons could not be arrested as they have already absconded and they are learnt to have left the country since long. In this circumstance, the Tribunal, as required under Rule 31, ordered [order dated 12.5.2013] to publish a notice in two daily newspapers, one in Bangla and another in English asking the accused to appear before this Tribunal within ten (10) days from the date of publication of such notice. Accordingly notice was published in ‘The daily Janakantha’ (Bengali daily) on 14.5.2013 and in ‘The daily Star’ (English daily) on 15.5.2013. But despite publication of such notice the accused persons have not appeared before this Tribunal.

বিষয়টি একেবারেই স্পষ্ট। সহজভাবে বললে, চৌধুরী মুঈনুদ্দীন এবং আশরাফুজ্জামানের বিরুদ্ধে অপরাধসমূহ আমলে নেওয়ার পর ট্রাইব্যুনাল তাদের দুজনের বিরুদ্ধেই আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে এবং সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষকে অবগত করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) আসামিদ্বয়কে খুঁজে বের করার চেষ্টা করে। না পেয়ে তারা ট্রাইব্যুনালের কাছে সেই মর্মে রিপোর্ট পেশ করে।

উক্ত রিপোর্টের ভিত্তিতে ট্রাইব্যুনাল বিধি অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করে। আর তা হল জাতীয় একটি ইংরেজি এবং বাংলা পত্রিকায় এই মামলার উম্মুক্ত নোটিশ প্রকাশ। যথারীতি ১৪ এবং ১৫ মে, ২০১৩ ট্রাইব্যুনালের আনুষ্ঠানিক নির্দেশক্রমে যথাক্রমে দৈনিক জনকণ্ঠ এবং The Daily Star পত্রিকায় সে নোটিশ (public notice) প্রকাশিতও হয়। [৪]

সুতরাং আইনানুযায়ী পুরো মামলার বিষয়ে চৌধুরী মুঈনুদ্দীন যথাযথভাবে অবগত বলেই ধরে নেওয়া হবে। এভাবে ‘নোটিশ পাইনি’ বলে আসামিদের দিক থেকে অনন্তকাল ধরে বিচার ব্যবস্থার সঙ্গে লুকোচুরি-কানামাছি খেলার কোনো অবকাশ আইনে নেই। তাছাড়া উক্ত নোটিশ প্রকাশের পূর্বাপর ইংল্যান্ডসহ পৃথিবীর বিভিন্ন মিডিয়ায় চৌধুরী মুঈনুদ্দীনের বিরুদ্ধে মামলার খবরটি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, যার কয়েকটিতে তার নিযুক্ত আইনজীবী এবং তিনি নিজেও সরাসরি মন্তব্য প্রদান করেন।

সুতরাং ‘নোটিশ পাইনি তাই মামলার খবর জানি না’– এমন বলে বিচারের দীর্ঘ হাত এড়ানোর সুযোগ দেখি না। কারণ তিনি খুব ভালো করেই জানতেন যে তার বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সৎসাহস এবং কান্ডজ্ঞানসম্পন্ন নির্দোষ মানুষ এসবের মোকাবিলা করেন, নানা ছুতো-নাতায় পালিয়ে বেড়ান না।

৩. নোটিশ নেই, তাই আইনজীবীও নেই

সাফাই সাক্ষাৎকারটিতে মুঈনুদ্দীন আরও বলার চেষ্টা করেছেন যে, যেহেতু তিনি ট্রাইব্যুনালের কাছ থেকে কোনো নোটিশই পাননি, সেহেতু তার পক্ষের আইনজীবী নিয়োগ করারও সুযোগ পাননি। একজন আসামি তার ন্যূনতম অধিকার রক্ষার্থে আইনজীবী নিয়োগ করতে পারেননি, সেটা শুনলে যে কোনো বিবেকবান মানুষেরই হৃদয় আর্দ্র হবে।

কিন্তু সমস্যা হল, মুঈনুদ্দীনের কথাটা সত্য নয়, যা উপরে একবার ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আর তিনি কোনো আইনজীবী নিয়োগ করারই সুযোগ পাননি– এই দাবিও কি সত্যি? একটু খতিয়ে দেখা যাক।

প্রকাশিত সংবাদ থেকে আমরা দেখতে পাই, যখনই মুঈনুদ্দীনের বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, তার প্রতিবারই ব্যারিস্টার টোবি ক্যাডম্যান নামের এক আইনজীবী মিডিয়ার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে মুঈনুদ্দীনের পক্ষ সমর্থন করে পেশাগত মন্তব্য প্রদান করেছেন। কখনও ‘ডেইলি মেইল’ পত্রিকায়, কখনও ‘গার্ডিয়ানে’, কখনও বিবিসিতে, কখনও আল-জাজিরায়। এই মন্তব্যগুলো টোবি ক্যাডম্যান কোন ক্ষমতাবলে করেছিলেন আসলে? মুঈনুদ্দীনের নিযুক্ত আইনজীবী হিসেবে? নাকি স্রেফ নিজের বিবেকের তাড়নায়?

মজার ব্যাপার হল, ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক মুঈনুদ্দীনের বিরুদ্ধে মামলার পাবলিক নোটিশ প্রদানেরও বহু আগে থেকেই টোবি ক্যাডম্যান আসলে তার আনুষ্ঠানিকভাবে নিযুক্ত আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। যেমন, ‘দি সানডে টেলিগ্রাফ’ পত্রিকার সাংবাদিক অ্যান্ড্রু গিলিগানের কাছে টোবি ক্যাডম্যানের লেখা হুমকি-প্রদানকারী চিঠিটির কথাই ধরা যাক, যেটি লেখা হয়েছিল ১৩ এপ্রিল ২০১২, অর্থাৎ ট্রাইব্যুনালের পাবলিক নোটিশেরও বছর খানেক আগে।

সেখানে ক্যাডম্যান সরাসরি নিজের পরিচয় দিচ্ছেন এই বলে– “Dear Mr. Gilligan, As you may be aware I am currently advising Mr. Chowdhury Mueen-Uddin and his family on this matter.” [৫]।

উক্ত চিঠিতে ক্যাডম্যান মুঈনুদ্দীনের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য অভিযোগগুলো আগে থেকেই অস্বীকার করছেন। কেবল তাই নয়, বরং এই চিঠি থেকে এটাও অত্যন্ত স্পষ্ট যে মুঈনুদ্দীন তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ঠিক কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বা ভবিষ্যতে নেওয়া হতে পারে সে ব্যাপারে সম্পূর্ণভাবে অবগত। তার নিযুক্ত (?) আইনজীবী ক্যাডম্যান লিখছেন:

“If formal charges are brought, as appears to be the case in light of the comments of the investigator and the Bangladesh Minister for Law, Justice and Parliamentary Affairs, then Mr. Mueen-Uddin may consider issuing a formal response in the appropriate form.” [৫]

অর্থাৎ যদি কখনও ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হয় তাহলে– ক্যাডম্যানের ভাষায়– তার মক্কেল চৌধুরী মুঈনুদ্দীন অবস্থা বুঝে এর প্রত্যুত্তর প্রদানের বিষয়টি ‘বিবেচনা করবেন’ (‘may consider’)। সুতরাং এটা স্পষ্ট যে নোটিশ না পাওয়ায় মামলা লড়া সম্ভব হয়নি কিংবা নোটিশ না পাওয়ায় আইনজীবীও নিয়োগ করা সম্ভব হয়নি– মুঈনুদ্দীনের এই দুটো দাবির কোনোটিই সত্যানুগ নয়।

তার বিরুদ্ধে মামলায় সুনির্দিষ্ট অভিযোগের প্রত্যুত্তর দেওয়া বা না দেওয়ার বিষয়টি পুরোই আসলে ছিল তার নিজের সিদ্ধান্ত, যদিও তিনি সাফাই সাক্ষাৎকারে সেটিরও দায় ট্রাইব্যুনালের ওপর চাপানোর প্রয়াস চালিয়েছেন!

ঠিক যেভাবে তিনি টোবি ক্যাডম্যানকে নিয়োগ দিয়েছেন তার পক্ষ হয়ে লড়বার জন্য, চাইলে ঠিক একইভাবে তিনি বাংলাদেশের যে কোনো আইনজীবী নিয়োগ দিতে পারতেন। কিন্তু দেননি। সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেছেন, বর্তমান জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গেও তার সম্পর্ক বন্ধুত্বেরই। ট্রাইব্যুনালে জামায়াতের আসামিদের পক্ষ নিয়ে যে আইনজীবীদের টিম লড়ছে, তিনি চাইলেই তাদেরও নিয়োগ দিতে পারতেন তার হয়ে মামলাটি লড়বার জন্য।

আমি নিশ্চিত, আসামি পক্ষের আইনজীবীরা তাকে ফিরিয়ে দিত না!

আসল কথা হল, মুঈনুদ্দীন নিজে মামলাটি না লড়ার সিদ্ধান্ত নিলেও ট্রাইব্যুনাল আইন অনুযায়ী নিজ খরচে যোগ্য আইনজীবী নিয়োগ করে দিয়েছে মামলাটি পরিচালনার জন্য (রায়ের অনুচ্ছেদ-২১ দ্রষ্টব্য)। তাই তিনি আইনগত সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন– এমন ইঙ্গিত একেবারেই ধোপে টেকার নয় এখন।

৪. পলাতক নির্দোষ! ৪০ বছরেও মামলার অনুপস্থিতি (কল্পিত)

নিজের নির্দোষিতার পক্ষে যুক্তি হিসেবে চৌধুরী মুঈনুদ্দীন যুক্তি দেখিয়েছেন এই বলে যে দালাল আইনের আওতায় যাদের বিরুদ্ধে বিচার শুরু হয়েছিল সে তালিকায় তার নাম নেই। তিনি এটি স্পষ্ট করেননি যে যদি নিজেকে তিনি নির্দোষই ভাববেন, তাহলে ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ থেকে কেন পলায়ন করেছিলেন!

সৎসাহসসম্পন্ন নির্দোষ মানুষ হিসেবে দেশে থেকে বিচারপ্রক্রিয়ার মুখোমুখি হয়ে সকল ষড়যন্ত্রের মুখোমুখি হলেই তো সব সমস্যার সমাধান হয়ে যেত; মামলায় সত্য বেরিয়ে আসত; তিনিও অপবাদ এবং ‘তথাকথিত ষড়যন্ত্রমূলক অপপ্রচার’-এর হাত থেকে চিরতরে মুক্তি পেতেন!

তিনি সেটা করেননি। সম্ভবত এখানে তাৎপর্যপূর্ণ হল দালাল আইন প্রণয়নের তারিখটি। আইনটি প্রণীত হয় ১৯৭২ সালে, আর তিনি দেশত্যাগ করেন এর অব্যবহিত পরেই, আইনটির প্রক্রিয়া পুরোপুরি শুরু হওয়ার আগেই। দালাল আইনে বিচার করবার মতো হাজার হাজার দেশীয় ছোট-বড় দালাল হাতের কাছেই থাকাতে, সে আইনে পলাতকদের বিচারের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি, এটা তো খুবই সহজ ব্যাপার। এ থেকে কি কোনোভাবে নিজের নির্দোষিতার পক্ষে যুক্তি দাঁড় করানো যায়?

১৯৭৫ সালে হুট করে দালাল আইনের আওতায় বিচারপ্রক্রিয়া বন্ধ এবং বাতিল না হয়ে গেলে, সেই আইনের আওতায় পলাতকদেরও বিচার শুরু হত না তা কি হলফ করে বলা যায়?

মুঈনুদ্দীন আরও দাবি করছেন, তিনি নির্দোষ বলেই নাকি গত চল্লিশ বছরেও ভিকটিমরা বা তাদের পরিবারের কেউ তার বিরুদ্ধে মামলা করেননি। দাবিটি তিনি করেছেন মামলার এক নম্বর সাক্ষী মাসুদা বানু রত্নার সাক্ষ্যের প্রেক্ষিতে, যিনি বুদ্ধিজীবী হত্যাযজ্ঞের অন্যতম ভিকটিম অধ্যাপক গিয়াসউদ্দিন চৌধুরীর ভাগ্নি।

এখানেও মুঈনুদ্দীনের বক্তব্য সত্য নয়। প্রকৃত ঘটনা হল, অধ্যাপক গিয়াসউদ্দিন চৌধুরীর পরিবারের পক্ষ থেকে মুঈনুদ্দীনের বিরুদ্ধে অতীতেও মামলা দায়ের করা হয়েছিল। অধ্যাপক চৌধুরীর ছোট বোন ফরিদা বানু নিজেই ১৯৯৭ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ঢাকার রমনা থানায় মুঈনুদ্দীন এবং আশরাফুজ্জামান খান, দুজনের বিরুদ্ধে এজাহার (FIR) দায়ের করেছিলেন। [৬]

এজাহারে ১৪ ডিসেম্বর, ১৯৭১-এ অধ্যাপক চৌধুরীর অপহরণ এবং হত্যার জন্য দুজনের বিরুদ্ধেই অভিযোগ দায়ের করা হয়। এজাহারের প্রেক্ষিতে সিআইডি (Criminal Investigation Department) তদন্তও শুরু করে। তদন্তের রিপোর্টে– যা মন্ত্রণালয়ের কাছে পেশ করা হয়েছিল পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য– অধ্যাপক গিয়াসের অপহরণের হোতা হিসেবে স্পষ্টভাবে অভিযুক্ত দুজনের নাম উল্লেখ করা হয়।

তখন এখনকার মতো সুনির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ছিল না। ছিল না গণহত্যা কিংবা এ জাতীয় বুদ্ধিজীবী হত্যার সুষ্ঠু বিচার করবার মতো প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান। সর্বোপরি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনজনিত সদিচ্ছার অভাবও এতে যুক্ত হয়। এসব নানা কারণে সিআইডির সেই তদন্ত রিপোর্টের ভিত্তিতে পূর্ণাঙ্গ বিচার আর শুরু হয়নি।

কিন্তু প্রথম সুযোগেই সেই বিচারহীনতার অবসানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বাংলাদেশে, যখনই দেশে একটি পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

৫. স্কাইপ ঘটনা: জুতসই বিভ্রান্তির ভাঙা রেকর্ড

প্রথমেই তিনি দাবি করছেন তার বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালের বিচার নাকি প্রহসনের বিচার! মূল প্রমাণ হিসেবে তিনি ‘স্কাইপ ঘটনার’ উল্লেখ করে বলছেন, সেখানে তার মামলা আদালতে আসারও বহু আগেই নাকি তাকে কি শাস্তি দেওয়া যেতে পারে সে বিষয়ে বিচারক এবং অন্যান্যদের মধ্যে পূর্বালোচনার প্রমাণ রয়েছে।

‘স্কাইপ’ শব্দটি উচ্চারিত হলেই একটু কম ওয়াকিবহালদের অনেককে বিভ্রান্ত হয়ে যেতে দেখেছি, সম্ভবত যথেষ্ট তথ্যের অভাবের কারণেই। মুঈনুদ্দীন যে এই বিভ্রান্তি সৃষ্টির সুযোগ হাতছাড়া করবেন না সেটা অনুমেয়।

বিচারকের ব্যক্তিগত কথোপকথনে আড়িপাতা বা স্কাইপ ঘটনা ষড়যন্ত্র তো বটেই। কিন্তু তিনি যেটা এখানে উল্লেখ করেননি তা হল, সেখানে মূল ষড়যন্ত্রকারীরা তারই সুহৃদ– যারা এই বিচারপ্রক্রিয়ার বিপক্ষে ছিল এবং আছে সেই শুরু থেকেই। তিনি আরও যেটি বলছেন না তা হল, কথিত সে আলোচনায় তার বিরুদ্ধে করা মামলার সম্ভাব্য শাস্তি বিষয়ে আসলে কোনো আলাপই হয়নি, কারণ তা ছিল একেবারেই অবান্তর।

সবচেয়ে বড় কথা হল, কথিত এই স্কাইপের রেকর্ডিং বা একপেশে ইমেইলের কপিগুলো এতই অসম্পূর্ণতা এবং (সম্ভাব্য) জালিয়াতির দোষে দুষ্ট যে খোদ আসামি পক্ষের আইনজীবীরাই ট্রাইব্যুনালে এই কপিগুলোর উৎস বা সঠিকতা বা পূর্ণাঙ্গতা বিষয়ে কোনো ধরনের প্রত্যয়ন করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন, এমনকি ট্রাইব্যুনালের পক্ষ থেকে তাদের একাধিকবার এই তথাকথিত স্কাইপ তথ্য-প্রমাণগুলোকে প্রত্যয়ন (authenticate) করতে বলার পরও।

মিডিয়ার সামনে কিংবা অপেক্ষাকৃত কম অবগতদের সামনে আসামি পক্ষের আইনজীবীরা যতই কল্পকাহিনী ফেঁদে, খণ্ডিত তথ্যের ততোধিক খণ্ডিত ও মনগড়া অপব্যাখ্যা দিয়ে মানুষকে যতই বিভ্রান্ত করে বেড়ান না কেন– আদালতে কথিত এইসব তথ্য-প্রমাণের প্রত্যয়নে আসামি পক্ষের আইনজীবীদের অস্বীকৃতির বিষয়টি অত্যন্ত ইঙ্গিতবহ।

সবচেয়ে যেটা গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু অনেকেরই অজানা তা হল, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিজ্ঞ বিচারকবৃন্দ স্ব-উদ্যোগে এবং আসামি পক্ষের দরখাস্তের ভিত্তিতে চার চারটি পৃথক প্রসিডিংয়ের মাধ্যমে কথিত স্কাইপ ঘটনাটি খতিয়ে দেখেছেন সেখানে আদৌ কোনো নিয়মের ব্যত্যয় কিংবা অবিচার হয়েছে কি না। খতিয়ে দেখে ট্রাইব্যুনাল নিজেরা সন্দেহাতীতভাবে সন্তুষ্ট হবার পরই চার চারটি পৃথক আদেশের মাধ্যমে বিষয়টির চূড়ান্ত নিষ্পত্তিও করেছেন।

আসামি পক্ষের কথিত তথ্য-প্রমাণ নিরীক্ষণ করে ট্রাইব্যুনাল কোনো অনিয়ম বা অবিচারের আলামত পাননি। এমনকি খোদ ‘ইকোনমিস্ট’ পত্রিকাও তাদের মূল প্রতিবেদনে আইসিএসএফ সদস্য ড. আহমেদ জিয়াউদ্দিনের সঙ্গে বিচারক নিজামুল হকের কথোপকথন বিষয়ে স্বীকার করে নিচ্ছে:

‘We do not believe he has broken any laws and cannot be held responsible for the actions of others.’ [৭]


৬. আলবদর সদস্যের কথিত ইস্তফা, গণহত্যায় জামায়াতের সংশ্লিষ্টতার স্পষ্ট স্বীকারোক্তি

আমরা সবাই জানি, জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন ছাত্র সংগঠন ‘ইসলামী ছাত্র সংঘ’ থেকেই জল্লাদ এলিট বাহিনী আলবদর সদস্যদের রিক্রুট করা হত। এই ঐতিহাসিক সত্য আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের একাধিক মামলায় গৃহীত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আজ সুপ্রতিষ্ঠিত। আগ্রহীরা সাজাপ্রাপ্ত আন্তর্জাতিক অপরাধী আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ, কামারুজ্জামান কিংবা গোলাম আযমের মামলার রায়গুলো পড়ে দেখতে পারেন, যেখানে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে এই বিষয়ে।

মুঈনুদ্দীন অবশ্য স্বীকার করছেন, একসময়কার ইসলামী ছাত্র সংঘের তিনি একজন সদস্য ছিলেন বটে, কিন্তু অস্বীকার করছেন আলবদর বাহিনীর সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়টি।

আজকে ২০১৩ সালে এসে হঠাৎ তিনি দাবি করছেন, ২৫ মার্চের পর থেকেই পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর ‘অ্যাকশনের’ বিরুদ্ধে এক রকমের প্রতিবাদ হিসেবেই নাকি তিনি তার ‘দলীয় রাজনৈতিক দায়িত্বগুলো’ থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন। এটা নিঃসন্দেহে একটি নতুন তথ্য। কারণ এই তথ্য তিনি ১৯৯৫ সালে চ্যানেল ফোর-এর ডকুমেন্টারি প্রচারের পর ফলাও করে জানাননি, কিংবা এক বছর আগেও দাবি করেননি কিংবা গত বিয়াল্লিশ বছর, এমনকি ট্রাইব্যুনালে তার বিরুদ্ধে মামলাতেও তার আইনজীবীর মাধ্যমে উত্থাপন করেননি।

উল্লেখ্য, ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক নিযুক্ত মুঈনুদ্দীনের আইনজীবী তার পক্ষে এত এত কথা বলেছেন, অথচ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারত যে তথ্যটি, সেই ‘ইস্তফা’ দেওয়ার কথাটি একবারের জন্যও উল্লেখ করেননি। বিস্তারিত জানতে মুঈনুদ্দীনের মামলার রায়ের পৃষ্ঠা ৪৪-৪৮ দেখুন, বিশেষ করে অনুচ্ছেদ ৩২।

যদি ধরেও নিই পদত্যাগের বিষয়ে তিনি সত্য বলছেন, তাহলে নিশ্চয়ই এই পদত্যাগের পক্ষে মুঈনুদ্দীন আরও তথ্য-প্রমাণ হাজির করবেন সেটাই আমরা আশা করব। কারণ ইতিহাসের সত্য, এমনকি প্রত্যক্ষদর্শী ভিকটিম সাক্ষীর সরাসরি সাক্ষ্যের বিপরীতে এভাবে হুট করে কিছু একটা দাবি করলেই তো আর হয় না!

নিজের এই সাফাই সাক্ষাৎকারেই তিনি দাবি করেছেন, বহু গুণীজন নাকি তাকে ‘প্রতিভাবান এবং সম্ভাবনাময়’ সাংবাদিক বলে মনে করতেন। আমরাও সেটা মনে করতে চাই। প্রতিভাবান এবং সম্ভাবনাময় একজন সাংবাদিক হিসেবে মিডিয়ায় ‘বক্তব্যের সপক্ষে প্রমাণ’ এবং ‘সময়োচিত অস্বীকৃতি (timely denial)’ এই দুটো বিষয়ের গুরুত্ব তো তাকে নতুন করে শেখাবার কিছু নেই। যে পাকিস্তানি বাহিনীর অনাচারে তিনি প্রতিবাদী হয়ে দলীয় দায়িত্ব থেকে ইস্তফাই দিয়ে বসতে পারলেন (তার দাবি মতে), যুদ্ধের সেই ন’মাস তাহলে তিনি একজন সৎ ও দায়িত্বশীল সাংবাদিক হিসেবে সেসব অনাচারের কথা তুলে ধরেছিলেন কি?

মনে করিয়ে দিই– এই তো কদিন আগেই বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন, ‘পূর্বদেশ’-এর মতো একটি পত্রিকার একজন ‘স্টাফ রিপোর্টার’-এর জীবন এতটাই নাকি ব্যস্ততার যে এই দায়িত্ব পালনকালে কারও হাতেই কোনো ধরনের হত্যাযজ্ঞের অপারেশন চালানোর মতো যথেষ্ট সময় থাকার কথা নয়। সত্য হল, ব্যস্ত ‘স্টাফ রিপোর্টার’ চৌধুরী মুঈনুদ্দীন অন্য সব বিষয়ে রিপোর্ট করার সময় পেলেও, ১৯৭১ সালে তার দেশে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আর তাদের দেশীয় সহচরদের দ্বারা সংঘটিত ব্যাপক গণহত্যার বিষয়ে কখনও একটি রিপোর্ট করার সময় পাননি!

তাহলে যুদ্ধের ন’মাস সারাদিন এত ব্যস্ত থেকে ঠিক কী বিষয়ে তিনি রিপোর্ট লিখে যেতেন সেটা এখন সিরিয়াস গবেষণার বিষয়!

প্রসঙ্গত, ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস স্ট্র্যাটিজি ফোরাম (আইসিএসএফ) এর মিডিয়া আর্কাইভের কর্মীরা সে সময়কার সমস্ত পত্রপত্রিকা সংরক্ষণের কাজে গত চার বছর ধরেই সক্রিয়। সেই সময়কার গণহত্যা বিষয়ে তথাকথিত প্রতিবাদী চৌধুরী মুঈনুদ্দীনের এমন একটি ‘সত্যান্বেষী’ রিপোর্টও আমাদের চোখে পড়েনি।

আর তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই সেই ন’মাস যুদ্ধকালীন সেন্সরশিপ চালু থাকায় তার পক্ষে গণহত্যা নিয়ে রিপোর্ট করা সম্ভব হয়নি, তাহলেও প্রশ্ন থেকে যায়। কারণ এরপর বিয়াল্লিশ বছরেও কি তিনি সে সব অত্যাচারের কথা বিশ্ববাসীর কাছে সঠিকভাবে তুলে ধরার মতো ফুরসত পাননি?

বরং আল-জাজিরাসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে তাকে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে আমরা উল্টোটাই করতে দেখেছি। যেখানে সরাসরি তার নাম কেবল দেশি মিডিয়ায় নয়, এমনকি বিদেশি মিডিয়াতেও ছবিসহ তুলে ধরা হয়েছে (যেমন, নিউ ইয়র্ক টাইমসের রিপোর্ট) [৮] আলবদর বাহিনীর একজন জল্লাদ কমান্ডার হিসেবে। সেখানে তো তার সংঘবদ্ধ গণহত্যা থেকে নিজেকে প্রকাশ্যে বিযুক্ত করার পাশাপাশি মূল সত্য তুলে ধরাটা (বিশেষ করে ইস্তফা প্রদানের ব্যাপারটি) আরও বেশি যুক্তিযুক্ত ছিল!

একজন দায়িত্বশীল সাংবাদিক এই ‘প্রয়োজনীয় অস্বীকৃতি’ (essential denial) দলিলবদ্ধ করবেন না বা সময় থাকতে অন-রেকর্ড করবেন না, তা কি আদৌ বিশ্বাসযোগ্য? আমরা তা মনে করি না।

সাফাই সাক্ষাৎকারে মুঈনুদ্দীন অবশ্য দাবি করছেন, মিডিয়ার তখনকার এই সব রিপোর্টই নাকি তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক অপপ্রচারের অংশ। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ পত্রিকার কী দায় পড়েছে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে নামার? কিংবা যে ‘দৈনিক পূর্বদেশ’ পত্রিকার ‘স্টাফ রিপোর্টার’ হিসেবে নাকি তিনি যুদ্ধের ন’মাস সাংবাদিকতার গুরুদায়িত্বে ‘প্রাণাতিপাত’ করেছেন বলে দাবি করেছেন, ঠিক সেই পত্রিকাতেই কেন তার বিরুদ্ধে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার রিপোর্ট ফলাও করে প্রকাশিত হবে?

প্রসঙ্গত, ১৯৭১ সালের ২৯ ডিসেম্বর ‘দৈনিক পূর্বদেশ’ পত্রিকা ‘‘অপারেশন ইনচার্জ মুঈনুদ্দীন: এই নরঘাতককে খুঁজে বের করতেই হবে’’ শিরোনামে এই তদন্ত প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছিল [৯]–

“বাংলাদেশের সোনার সন্তান জ্ঞানপ্রদীপ সাংবাদিক শিক্ষক, চিকিৎসক, বুদ্ধিজীবীদের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বেসামরিক নায়ক বাংলার কুসন্তানদের অন্যতম চৌধুরী মুঈনুদ্দীন আজ পলাতক। নরঘাতক হানাদার শত্রুদের এদেশীয় দোসর জামায়াতে ইসলামীর ফ্যাসিবাদী সংস্থা আলবদর বাহিনীর অন্যান্য হত্যাকারীর মতো চৌধুরী মুঈনুদ্দীন আজ আত্মগোপন করে আছে। কয়েকদিন পূর্বে জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা শহর শাখার দফতর সম্পাদক আবদুল খালেক মজুমদার ধরা পড়ে। সে যে স্বীকারোক্তি দান করে তাতে সে বুদ্ধিজীবীদের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত কয়েকজনের নাম প্রকাশ করে এবং চৌধুরী মুঈনুদ্দীন ঢাকায় এই হত্যাযজ্ঞের জন্য ’অপারেশন-ইন-চার্জ’ ছিল বলে প্রকাশ করেছে।’’

এখানে তার বিরুদ্ধে নানাজনের ব্যক্তিগত ষড়যন্ত্রমূলক অপপ্রচারের যে তত্ত্বটি মুঈনুদ্দীন সাহেব প্রচারের চেষ্টা করছেন তা কি আদৌ গ্রহণযোগ্য মনে হয়?

দলীয় রাজনৈতিক দায়িত্ব থেকে মুঈনুদ্দীনের তথাকথিত পদত্যাগের দাবিটি আরেকটি কারণে আগ্রহের উদ্রেক করে। পাকিস্তানি বাহিনীর ‘অ্যাকশন’-এর প্রতিবাদে জনৈক চৌধুরী মুঈনুদ্দীনকেই কেন হঠাৎ তার রাজনৈতিক দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করতে হবে? তার বর্ণিত এই ‘রাজনৈতিক দায়িত্বগুলো’র ধরনই-বা ঠিক কী ছিল যা তার বিবেককে এতখানি আহত করেছিল সেই সময়? আগ্রাসী পাকিস্তানি বাহিনী আর তার নিজের তখনকার রাজনৈতিক দল ‘ইসলামী ছাত্র সংঘ’– এই দুয়ের মধ্যে সম্পর্কের ধরনই-বা কেমন ছিল?

মজার ব্যাপার হল, এখানে চৌধুরী মুঈনুদ্দীন প্রকারান্তরে আসলে নিজেই স্বীকার করে নিচ্ছেন– পাকিস্তানি বাহিনীর যাবতীয় হত্যাকাণ্ড এবং অত্যাচারের অংশীদার ছিল জামায়াতে ইসলামী এবং এর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘ, যে কারণে তাকে পদত্যাগের মাধ্যমে তথাকথিত এই ‘প্রতিবাদ’কর্মটি (যদি সত্যি সত্যি তিনি পদত্যাগ করে থাকতেন) করতে হয়েছিল।

আমরা জানতে আগ্রহী জামায়াতে ইসলামী কিংবা ডিফেন্স টিমের সদস্যদের এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য আছে কি না মুঈনুদ্দীনের এমন সরাসরি স্বীকারোক্তির পরও।

পরিশেষে

বাংলাদেশের মাটিতে ১৯৭১-এর অপরাধীদের বিচার শুরু হয়েছে অবধি এ নিয়ে চলছে লাগাতার ষড়যন্ত্র। দেশীয় রাজনীতির অন্ধকার অংশটির প্রত্যক্ষ মদদ যেমন আছে এই বিচারপ্রক্রিয়া বানচাল এবং একে প্রশ্নবিদ্ধ করার কাজে– তেমনি ভিনদেশি বেসরকারি গোয়েন্দা সংস্থা, নামিদামি লবিয়িং ফার্ম, পাবলিক রিলেশন্স ফার্ম, শক্তিশালী মিডিয়া হাউজ, গোটাকয়েক নামজাদা ল’ফার্ম এবং মিডিয়া হাউজও সার্বক্ষণিকভাবে সক্রিয় সুবিচার নস্যাত করার এই যৌথযজ্ঞে।

পৃথিবীর যত জায়গায় আজ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার হয়েছে, কোথাও আসামি পক্ষ বা তাদের লবি এতখানি শক্তিশালী ছিল না। মহাক্ষমতাধর হিটলারের নাজি বাহিনীও ন্যুরেমবার্গ ট্রায়ালের আগে সম্পূর্ণ ক্ষমতাহীন হয়ে পড়েছিল। মরণকামড় দেওয়ার মতো শক্তি তাদের ছিল না।

অন্যদিকে, ১৯৭১-এর এই আসামি চক্রটি চার দশক ধরে নিজেদের শক্তিশালী করেছে, যোগাযোগে, অর্থনীতিতে, রাজনৈতিক পেশিশক্তিতে। সেদিক থেকে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার এক অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জ, পুরো পৃথিবীর বিচারের ইতিহাসের প্রেক্ষিতেই সে কথা সত্য।

হাজার সীমাবদ্ধতার মধ্যেও চার দশকের পুরোনো অপরাধের বিচারের মতো এক অত্যন্ত দুরূহ কাজ সম্পন্ন করেছে এই দরিদ্র দেশটি, এর জনগণ এবং এর নতুন প্রজন্মের সন্তানেরা। এ কোনো সামান্য ব্যাপার নয়। এই কর্মযজ্ঞে তাই সাংবাদিক, শিক্ষক, ছাত্র, বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু ভূমিকা রাখা প্রয়োজন সার্বিক প্রয়োজনীয়তা মাথায় রেখে, পুরো পরিস্থিতির ব্যাপারে সজাগ থেকে।

তাই চৌধুরী মুঈনুদ্দীনের মতো একজন প্রমাণিত যুদ্ধাপরাধীর পক্ষে এ ধরনের একতরফা, প্রশ্নহীন সাক্ষাৎকারটি কোনো ধরনের কার্যকর চ্যালেঞ্জ ছাড়া এভাবে প্রচারিত হতে দেখাটা আমাদের জন্য হতাশাব্যঞ্জক। সাংবাদিকতার নিরপেক্ষতা এবং নৈতিকতার কথা বাদ দিলেও, শুধুমাত্র বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে মুঈনুদ্দীনের দেওয়া বক্তব্যগুলো সাক্ষাৎকারের সময়ই সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী জনাব সৈয়দ নাহাস পাশা যুক্তিসহ খণ্ডন করে পাঠকের জন্য প্রশ্নাকারে তুলে ধরতে পারতেন।

আর এই প্রয়োজনীয় যুক্তি খণ্ডনটুকু করবার জন্য খুব যে ব্যাপক গবেষণার প্রয়োজন ছিল এমনও নয়। কিছু কিছু প্রতিষ্ঠিত এবং সর্বজনবিদিত তথ্য দিয়ে তা খুব ভালোভাবেই করা যেত বলে মনে করি।

তাই দেশ এবং দেশের বাইরে যত মিডিয়া এবং পত্রিকার প্রতিনিধিরা রয়েছেন, আশা করি তারা বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখবেন। কারণ বিচারের বিরুদ্ধ শক্তিটির হাতে রয়েছে লাখো ডলারের প্রচারযন্ত্র।

এর বিপরীতে আমাদের ১৯৭১-এর বিচারপ্রার্থী জনগণের সে অর্থে নিজের জীবন এবং পরিবার থেকে সময়টুকু দিয়ে সুবিচারের দাবি এগিয়ে নিয়ে যাওয়া ছাড়া দেবার মতো আর তেমন কিছুই নেই।

তথ্যসূত্র:

[১] Muktasree Chakma Sathe, ‘Tales of a Lone Survivor’, Dhaka Tribune, 4 November 2013

http://bit.ly/HoR4Pp

[২] আইসিএসএফ-এর ই-লাইব্রেরিতে আর্কাইভকৃত মুঈনুদ্দীন মামলার রায়ের পূর্ণ কপি:

http://bit.ly/1aYd2Di

[৩] আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২, প্রধান প্রসিকিউটর বনাম চৌধুরী মুঈনুদ্দীন এবং আশরাফুজ্জামান। সম্পূর্ণ রায়ের ডাউনলোড লিঙ্ক:

http://bit.ly/1aYd2Di

[৪] এখানে দেখুন: Staff Correspondent, ‘War Crimes Trial: Publish ad for Mueen-Uddin’s, Ashrafuzzaman’s appearance – ICT-2 directs registrar’s office’, The Daily Star 14 May 2013

http://bit.ly/18pbJj8

[৫] ‘দি সানডে টেলিগ্রাফ’ পত্রিকার সাংবাদিক অ্যান্ড্রু গিলিগানের কাছে টোবি ক্যাডম্যানের লেখা চিঠি–

http://bit.ly/1cxAkQ5

[৬] সূত্র: রমনা থানা পুলিশ মামলা নং ১১৫/১৯৯৭, তারিখ: ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৯৭। এজাহারটি দায়ের করা হয়েছিল দণ্ডবিধির ১২০(বি), ৪৪৮, ৩৬৪, ৩০২, ২০১, ৩৪ এবং ১১৪ ধারাসমূহের আওতায়।

[৭] The Economist, ‘Trying war crimes in Bangladesh
The trial of the birth of a nation’, December 15 2012

http://econ.st/RpQnK7

[৮] Fox Butterfield, ‘A Journalist is Linked to Murder of Bengalis’ New York Times, 3 January 1972

[৯] দৈনিক পূর্বদেশ, ‘‘অপারেশন ইনচার্জ মুঈনুদ্দীন: এই নরঘাতককে খুঁজে বের করতেই হবে’’, ২৯ ডিসেম্বর, ১৯৭১।

রায়হান রশীদ : শিক্ষক, গবেষক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

The Weeklydesh newspaper