নিষ্ঠুর রাজনীতি অসহায় মানুষ: অটোরিকশাচালকের শরীরে পেট্রল ঢেলে অগ্নিসংযোগ

1

হরতালের মতো অবরোধেও প্রাণ যাচ্ছে সাধারণ মানুষের। ১৮ দলের ৪৮ ঘণ্টা অবরোধের গতকাল প্রথম দিন কুমিল্লায় বিজিবি সদস্যসহ সারা দেশে ৭ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৫ শতাধিক। তাদের মধ্যে অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। অবরোধকারীরা ঢাকার এক সিএনজি অটোরিকশাচালকের শরীরে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিলে গুরুতর আহত হন। তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এ ছাড়া ককটেল বিস্ফোরণ ও আগুনে দগ্ধ হয়ে আরও ৫ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। অবরোধকালে পুলিশ ও আওয়ামী লীগকর্মীদের সঙ্গে অবরোধকারীদের সংঘর্ষে সিরাজগঞ্জে পথচারী ছাকমান হোসেন (৩৫) নিহত হন। এ ছাড়া সাতক্ষীরায় যুবলীগনেতা মাহমুদুল হাসান বাবুকে পিটিয়ে হত্যা করে জামায়াত-শিবিরকর্মীরা। কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার দৌলতগঞ্জ বাজারে পুলিশ ও ১৮-দলীয় জোটের নেতাকর্মীদের মধ্যে সশস্ত্র সংঘর্ষকালে ক্রসফায়ারে রিকশাচালক বাবুল মিয়া নিহত হন। কুমিল্লা নগরীর দক্ষিণ চার্থায় ১৮ দল-সমর্থকদের সঙ্গে বিজিবি ও পুলিশের সংঘর্ষে বিজিবির সদস্য রিপন নিহত হন।
অবরোধকারীদের আগুনে ঝলসে গেছেন সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালক ছাবেত আলী (৩৩)। গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টায় রাজধানীর হাতিরপুল ইস্টার্ন প্লাজার সামনে আগুনে পুড়ে তার মুখের চেহারাই বদলে গেছে। পুড়ে গেছে শ্বাসনালিও। তিনি ছাড়াও কুমিল্লায় অবরোধের আগুনে দগ্ধ হয়েছেন আরেক সিএনজিচালক মো. রুবেল (৪০)। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম দুজনরই ঠিকানা এখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসাপতালের বার্ন ইউন

স্বজনদের প্রশ্ন— হরতালেও আগুন, অবরোধেও আগুন, তাহলে আমরা যাব কোথায়?

ছাবেদ আলী বলেন, ‘যাত্রী নামিয়ে ভাড়া নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। হঠাত্ কয়েক যুবক এসে কোনও কথা না বলেই আমার শরীরে পেট্রল ছিটাতে থাকে। সিএনজি থেকে নামার আগেই দাউ-দাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে। মাটিতে পড়ে গড়াগড়ি খেতে থাকি।’
রাজধানীর খিলগাঁও তিলপাপাড়ায় ককটেলের আঘাতে আনোয়ারা বেগম (৫০) গুরুতর আহত হন। পল্টনে ফল ব্যবসায়ী আলমগীর হোসেন মাতুব্বরের (৫০) পা ঝলসে গেছে।
ছাবেত আলীর ভাতিজা আমিনুল ইসলাম জানান, গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টায় গুলশান থেকে যাত্রী নিয়ে ইস্টার্ন প্লাজার সামনে আসেন ছাবেত আলী। যাত্রী সুমেল হাজরা সিএনজি থেকে নেমে ভাড়া দেবেন— এমন সময় কয়েক যুবক এসেই ছাবেত আলীর শরীরে পেট্রল ছিটিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। ওই অবস্থায় দ্রুত সিএনজি থেকে নেমে মাটিতে গড়াগড়ি খেতে থাকেন। গুরুতর আহত ছাবেত আলীকে সেখানে দায়িত্বরত পুলিশ ভ্যানে তুলে হাসপাতালে নামিয়ে দিতে অনুরোধ করা হয়। তবে পুলিশ সাফ জানিয়ে দেয়, তারা ছাবেত আলীকে হাসপাতালে নিতে পারবে না। পুলিশের এমন আচরণে হতবাক হয়ে যান উপস্থিত সবাই। পরে তাকে রিকশায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসাপাতালে নেওয়া হয়। তার শরীরের ১৬ শতাংশ পুড়ে গেছে।
সাবেত আলীর গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধা সুন্দরগঞ্জের চণ্ডীপুরে। স্ত্রী আলেয়া বেগম ও ২ ছেলেকে নিয়ে ঢাকার ৫২ কালিবাড়ী বাসাবো এলাকায় থাকেন তিনি। বড় ছেলে দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্র। ২ সন্তানের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের চিন্তায় দিশাহারা আলেয়া বেগম।
গত মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় কুমিল্লা বিশ্বরোড সিএনজি পাম্পের সামনে অবরোধকারীদের তোপের মুখে উল্টে যায় সিএনজি অটোরিকশা। ভেতরে থাকা চালক মো. রুবেলকেসহ পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। পরে স্থানীয়রা রুবেলকে উদ্ধার করে স্থানীয় একটি হাসপাতালে ভর্তি করে। অবস্থার অবনতি হলে গভীর রাতে তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ভর্তি করা হয়। তার শরীরের ২৩ শতাংশ পুড়ে গেছে। তার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার কোতোয়ালির রায়সুদায়। স্ত্রী ও ৩ সন্তান নিয়ে কুমিল্লায় ভাড়া বাসায় থাকেন তিনি।
গতকাল দুপুরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, ব্যান্ডেজে মোড়ানো স্বামীর পাশে ঠাঁই দাঁড়িয়ে স্ত্রী নাসিমা বেগম। তিনি জানান, বড় মেয়ে স্বপ্না সপ্তম শ্রেণী, ছেলে ইমন পঞ্চম শ্রেণী ও শাওন প্রথম শ্রেণীতে পড়ালেখা করছে। তাদের পড়ালেখাসহ সংসারের যাবতীয় খরচ রুবেলের আয়েই মিটত। একজনের কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা ধার করে স্বামীকে ঢাকা এনেছেন তিনি। এখন সন্তানদের নিয়ে কোথায় যাবেন? তার এমন প্রশ্ন অবরোধকারীদের কাছে। এ সময় তার আহাজারিতে পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে।
এদিকে রাজধানীর খিলগাঁও তিলপাপাড়ায় দুর্বৃত্তদের ছোড়া ককটেলের আঘাতে আনোয়ারা বেগম গুরুতর আহত হন। তিনি ন্যাশনাল ব্যংকের শান্তিনগর শাখায় বাবুর্চির কাজ করতেন। ৩ ছেলে ও ১ মেয়ের জননী আনোয়ারা গোড়ান শান্তিপুরে থাকেন। গ্রামের বাড়ি বাগেরহাটের কোর্টপাড়া। তার ভাগ্নে সোবহান জানান, বিকাল সাড়ে ৩টায় খিলগাঁও সিটি করপোরেশনের সামনে পৌঁছলে আনোয়ারাকে লক্ষ্য করে একটি ককটেল নিক্ষেপ করা হয়। ককটেল তার মাথায় লেগে বিস্ফোরিত হলে গুরুতর আহত হন। কর্তব্যরত চিকিত্সক জানান, তার অবস্থা আশঙ্কাজনক। প্রায় একই সময় পল্টন মোড়ে ফল ব্যবসায়ী আলমগীর হোসেন মাতুব্বরের পা ঝলসে গেছে। আলমগীর জানান, তিনি সেগুনবাগিচা অডিট ভবনের সামনে ফল বিক্রি করেন। বিকাল ৩টায় সেগুনবাগিচা থেকে পল্টন মোড়ে গেলে একটি ককটেল তার পায়ের সামনে পড়ে বিস্ফোরণ ঘটে। এতে তার ২ পা ঝলসে যায়। তিনি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সা নিয়ে বাসায় ফিরে যান। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের আবাসিক চিকিত্সক ডা. পার্থ শঙ্কর পাল আমাদের সময়কে বলেন, অগ্নিদগ্ধ দুজনেরই শ্বাসনালি পুড়ে যাওয়ায় তাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
সন্ধ্যা পৌনে ৭টায় দক্ষিণ বনশ্রী বাটার শোরুমের সামনে ৫-৬ যুবক লেগুনার গতিরোধ করে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ সময় হুড়াহুড়ি করে যাত্রীরা নামতে পারলেও আটকা পড়ে যান চালক মোজাম্মেল হক (১৯)। তার শরীরের ১৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। এর আগে সন্ধ্যা ৬টায় মৌচাকে দেশটিভির সামনে অবরোধকারীদের আগুনে ঝলসে গেছেন সিএনজি অটোরিকশাচালক নিজামউদ্দিন (৩৭)। তার শরীরের ১২ শতাংশ পুড়ে গেছে। তাদেরও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

The Weeklydesh newspaper