জাতীয় স্বার্থের বিষয়ে হেফাজতিদের দৃষ্টি আকর্ষণ

1

আধুনিক শিক্ষার ব্যবস্থার অধীনে উন্নত মানের শিক্ষা ছাড়াও প্রকৌশল, চিকিৎসা বিদ্যা, আইনশাস্ত্র, উদ্ভিদ বিজ্ঞান, পদার্থ ও রসায়ন বিজ্ঞান, অর্থনীতি ও সমাজনীতি প্রভৃতি বহুবিধ বিষয়ে শিক্ষার্থীরা শিক্ষা গ্রহণ করে থাকেন। এ জন্য শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হয়। এ শিক্ষা ব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের প্রশাসনের ও বিচার বিভাগের বিভিন্ন স্তরে কর্ম সম্পাদনের দক্ষতা অর্জনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। আপনারা শিক্ষা লাভ করেন মাদ্রাসা নামে পরিচিত প্রতিষ্ঠানে। অনেক বিত্তবান লোক অনৈতিক ও অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন করে পরকালে মুক্তি লাভের প্রত্যাশায় কিছু অর্থ ব্যয় করে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে। কুরবানির সময় পশুর চামড়া সংগ্রহে নেমে যায় এসব মাদ্রাসার ছাত্র। আর ঈদুল ফিতরের সময় চলে জাকাত-ফেতরা সংগ্রহের অভিযান। এসব প্রতিষ্ঠানে কয়জন ছাত্র বেতন দিয়ে পড়ালেখা করে? বিনা-বেতনে ও মাদ্রাসার লিল্লাহ বোর্ডিং-এ অবস্থান করে আর্থিক সহায়তা গ্রহণ করে এখন ইসলামকে হেফাজত করার কাজে সংঘবদ্ধভাবে নেমেছেন। কিন্তু আল্লাহ স্বয়ং ইসলাম হেফাজতের দায়িত্ব নিয়েছেন। স্রষ্টার দায়িত্ব কি বান্দা পালন করতে পারে? অভিভাবকদের অর্থ ব্যয় করে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গ কর্ম জীবনে আয় উপার্জন করেÑ আবার স্ব স্ব ক্ষেত্রে সুষ্ঠু অবদান রেখে পারিবারিক ও জাতীয় জীবনকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনস্বীকার্যভাবে উন্নতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। মাদ্রাসায় পড়–য়া ছাত্ররা যারা মুফতি-মৌলভি পদাধিকারী তারা ছাত্র জীবন ও কর্মজীবন উভয় ক্ষেত্রেই পরজীবীর মতো অপরের দান খয়রাতের ওপর নির্ভরশীল।

মাদ্রাসায় শিক্ষা লাভ করায় আপনাদের কর্ম ক্ষেত্রতো মোটামুটি নির্র্ধারিত ও নির্দিষ্ট। মসজিদের ইমাম, সহ-ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেম প্রভৃতি পদসমূহ বরাবরই আপনাদের দখলে আছে ও থাকবে। আর দেশে মাদ্রাসার সংখ্যা যতো বৃদ্ধি পাবে ততোই আপনাদের জন্য মাদ্রাসায় শিক্ষকতার সুযোগ বাড়বে। কিন্তু আপনারা নিজেদের মধ্যে কওমি-দেওবন্ধি, জামাতি-তাবলিগ, আহলে সুন্নত ও পীরপন্থী প্রভৃতি বিভাজন সৃষ্টিতে লিপ্ত আছেন। বাস্তব জগতে সুন্দর ও সুস্থ জীবনের জন্য অনেক প্রকৌশলী, চিকিৎসক, অর্থনীতিবিদ, আইনজীবী, প্রশাসক, বিচারক, বিজ্ঞানী, সমাজবিদ ও সাহিত্যিক প্রয়োজন। এসব কোনো ক্ষেত্রে আপনাদের মাদ্রাসা পড়–য়া ছাত্রদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়?

আমরা ছেলেবেলা থেকে দেখে এসেছি জামাতে উলা পাস না করা পর্যন্ত মাদ্রাসা ছাত্রদেরকে মুন্সি বলে ডাকা হতো। উলা পাস ব্যক্তির পদবি ছিল মৌলভি এবং টাইটেল পাস করলে মৌলানা উপাধি দেয়া হতো। এমনকি হুজুরপন্থীদের নাটের গুরু খোদ জামাতে ইসলামির প্রতিষ্ঠাতা আবুল আলা মওদুদী নিজেও মওলানা উপাধি নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন। আজকে দেখা যায় অনেকেই মুফতি, শায়েখ-মাশায়েখ, কেউ শায়খুল হাদিস আবার কেউ আল্লামার স্তর পর্যন্ত উন্নীত হয়েছেন। আপনাদের অতি সাধের পাকি আমলে এসব মুফতি-মাশায়েখ-আল্লামা প্রভৃতি পদবি গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় পড়ালেখা কি মাদ্রাসাতে প্রচলিত ছিল না? থাকলে ঐ আমলে ঘরে ঘরে মুফতি, মাশায়েখ-আল্লামা প্রভৃতি উপাধিধারীদের এতো ছড়াছড়ি দেখা যায়নি কেন? প্রসঙ্গত, মুফতি প্রভৃতি উপাধিধারীদের জ্ঞানের গভীরতা প্রশ্নে প্রয়াত ফজলুল হক আমিনীর ‘আমরা হবো তালেবান, বাংলা হবে আফগান’ শীর্ষক সেøাগানটির প্রতি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করবো। সবাইকে ভাবতে বলি প্রয়াত ঐ মুফতির জ্ঞানের পরিধি গভীর হলে তিনি কি শিক্ষা, সাহিত্য, প্রশাসন, গবেষণা ও অর্থনীতি প্রভৃতি সকল ব্যবস্থায় ঐতিহাসিকভাবে বিশ্বের পশ্চাৎপদতম দেশের পর্যায়ে বাংলাদেশকে পৌঁছানোর মিশনে নামতে পারতেন? তিনি কি সত্যিকারে স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্বে বিশ্বাসী ছিলেন?

মাদ্রাসায় অধ্যয়ন করে যারা ধর্মীয় বিদ্যায় বিদ্বান বা আলেম হন তারা কর্ম জীবনে নামাজ পড়ান, ওয়াজ করেন, খতম, মিলাদ, জানাজা ও দরুদ প্রভৃতি ধর্মীয় কাজ সম্পাদন করেন। এ সবের বিনিময়ে তাদের আয়ের পরিমাণ অব্যশই অসীম নয়Ñ বরং সসীম। আমাদের জানামতে নামাজের জামাতে ইমামতি করে বা আগ্রহী মুসলমানকে কুরআন শরিফ পাঠ শেখানোর বিনিময়ে কোনো আর্থিক সুবিধা গ্রহণ হালাল নয়। কিন্তু বাংলাদেশে তো এই বিনিময় প্রথা অনেকটা রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। আপনারা কি এ রেওয়াজকে সমর্থন করেন? এতোদিন তো আপনারা কুরবানির চামড়া ও জাকাত ফিতরার মাধ্যমে দিন গুজরান করেছেন। এতোকাল পরে আকস্মিকভাবে রাজনৈতিক বাণিজ্যে নেমে একবারেই শতকোটি টাকা হাতাবার সুযোগ পেয়েছেন। আমার সত্তরোর্ধ্ব জীবনে কোনো আলেম সমাজ কর্তৃক এতো বড় রাজনৈতিক বাণিজ্যে অংশগ্রহণের কথা শুনিনি। নামাজে যিনি ইমামতি করেন, সকল মুক্তাদির নামাজ কবুল হওয়া অনেকটা তার ইমান ও আমলের বিশুদ্ধতার ওপর নির্ভর করে। আপনাদের অনেকেই ইমামতি করেন। তাহলে ৬ এপ্রিলের লং মার্চ উপলক্ষে যে রাজনৈতিক বাণিজ্যের সংবাদ প্রচারণা পাচ্ছেÑ আল্লাহকে হাজির নাজির মনে করে সে ব্যাপারে আপনাদের সঠিক ও সত্য বক্তব্য প্রকাশ করুন।

হাটহাজারীতে দেওবন্ধপন্থী একটি বৃহৎ মাদ্রাসা আছে বলে অনেকেই জানতেন। কিন্তু বরাবরই এ মাদ্রাসার ছাত্র শিক্ষক ও সেখান থেকে পাস করা আলেম-ওলামারা অরাজনৈতিক চরিত্রের অধিকারী বলে শোনা যেতো। এখন শোনা যায় মওলানা শফী ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকালে মুজাহিদ বাহিনী গঠন করে পাকি সেনাদের সহযোগী ভূমিকা পালন করেছিল। ৪২ বছর দেশের অধিক সংখ্যক লোক হেফাজতের নামও জানতো না। কিন্তু জামাতি নরঘাতকদের বিচারের প্রশ্নে গণজাগরণ মঞ্চ বাংলার জনগণকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ফিরিয়ে আনার জাগরণ সৃষ্টি করলে কল্পিত ধর্মীয় দুশমনের জিগির তুলে জামাতিদের সার্বিক পৃষ্ঠপোষকতায় আপনাদেরকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে জেহাদ করার প্রেরণা জাগ্রত হলো কেন? স্বাধীন বাংলা দেশের কথা শুনলে, মুক্তিযুদ্ধে আমাদের ভাইয়েদের গৌরবগাথার স্মৃতি ভেসে উঠলে আপনাদের গায়ে ফোসকা পড়ে কেন? আজকে এই বাংলার নাগরিক নোবেল পুরস্কার অর্জন করেছেন, বাংলার দামাল ক্রিকেটার শ্রীলঙ্কাতে এক ইনিংসে ডবল সেঞ্চুরি, প্রায় ডবল সেঞ্চুরি ও সেঞ্চুরি করার কৃতিত্ব অর্জন করেÑ বাংলার ছেলেরাই শুধু নয়, মেয়েরাও এভারেস্টের চূড়ায় লাল-সবুজ পতাকা ওড়ায়; বাংলার কৃষিবিজ্ঞানী পাটের জিন তত্ত্ব আবিষ্কার করে, জাতিসংঘ শান্তি মিশনে বাঙালি সেনা ও পুলিশ ভাইয়েরা বিশ্ব জোড়া সুনাম কুড়িয়েছেÑ এসব কি আপনাদের মনে কোনো আবেগের সঞ্চার করে না? ২৪ এপ্রিল তারিখে সাভারে ভবন ধসের যে অতি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটলো তখন জাগরণ মঞ্চ রক্তদান কর্মসূচি গ্রহণ করলোÑ কিন্তু আপনারা হেফাজতিরা কি করেছেন? বাঙালির এসব কৃতিত্বের জন্য আপনাদের মনে যদি আবেগ সঞ্চারিত হয়, তাহলে গণজাগরণ মঞ্চের বিরুদ্ধে বৈরী প্রচারণা ও আচার-আচরণ ক্ষান্ত করুন। শাহবাগ মঞ্চ থেকে ইসলামবিরোধী কথা কেউ উচ্চারণ করেছে বলে কোনো অভিযোগ শোনা যায়নি। ব্লগে কি ঘটেছে যারা ব্লগের কাজে অভিজ্ঞ তারাই বলতে পারবেনÑ আমরা ব্লগার নইÑ সাধারণ লোক। ব্লগের লেখা পড়িও নাÑ ব্লগে লেখিও না। তবে সমাজে ২/৪ জন উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তি সব সময়ই সব দেশেই থাকে। তাদের নিন্দনীয় কাজের তদন্ত ও সাজা দেয়ার জন্য সরকার বিদ্যমান আইন বলে ব্যবস্থা নিতে আগ্রহী। সুতরাং বিপুল আকারে ধর্মদ্রোহীরা ব্লগে লেখালেখি করছে মাহমুদুর রহমানের এমন উগ্র প্রচারণায় বিভ্রান্ত হয়ে আপনারা এমনকি হু. মু. এরশাদ পর্যন্ত ধর্মযুদ্ধের ঘোষণা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সংগঠিত প্রগতিশীল আন্দোলন ব্যর্থ করার প্রয়াস নিয়েছেন। এসবই তো ’৭১-এর জল্লাদদের বিচার থেকে নিষ্কৃতি দেয়ার মানসে করেছেন। এখন ক্ষান্ত দিন।

নারীনীতির প্রশ্নে আপনাদের দাবি দেশের অর্ধেক জনতা-নারী সমাজকে আপনারা ঘরের মধ্যে আর্গল বন্দী করে রাখতে চান। আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত মহিলা প্রকৌশলী, চিকিৎসক, অধ্যাপক, ব্যারিস্টার, প্রশাসক কোন দুঃখে আপনাদের নারীনীতি সমর্থন করে দেশের আপামর নারী সমাজ (নিজেদের সহ) অর্গল বন্দী হওয়ার দাসত্ব মেনে নেবে? নারী সমাজকে আল্লাহ শারীরিক দিক থেকে দুর্বল করে সৃষ্টি করেছেন। তাই বলে মানসিক দিক থেকে তো দুর্বল করেননি। তাদের এই শারীরিক দুর্বলতা পুরুষের জন্য পরীক্ষা। আল্লাহ দেখতে চান যে পুরুষ শারীরিক শক্তি বলে দুর্বল করে সৃষ্টি করা নারীদের অধিকার রক্ষায় আগ্রহীÑ না তাদের নিগ্রহ ও নির্যাতন করে দমিয়ে রাখতে অধিকতর আগ্রহী।

আপনারা সংবাদপত্র ও টেলিভিশন চ্যানেলে সংবাদে দেখেন না সমাজে নারীরা কি ভয়ঙ্কর পরিমাণে নিগৃহীত হচ্ছে। যৌতুকের কারণে কতো নারী নির্যাতিত হচ্ছেÑ কতো নারীর সংসার ভাঙছে? কেবল নারীরাই নয়Ñ শিশুরা পর্যন্ত মাঝেমধ্যেই যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। এক আদম এক হাওয়া থেকেই তো আজ ৬০০-৭০০ কোটি মানব সন্তান পৃথিবীর বুকে বিচরণ করছে। এতোসব অত্যাচার, নির্যাতন ও নিগ্রহ দেখে যদি আপনাদের মনের কোণে তাদের জন্য একটুও দরদ উথলিয়ে উঠতো, তাহলে নারীদের ওপর সব ধরনের নির্যাতন- যথা শারীরিক, মানসিক, আর্থিক ও সামাজিকÑ বন্ধের জন্য আপনারা জোড়ালো দাবি তুলতেন। মুফতি-আল্লামা খেতাবধারী কতোজনের কন্যারা চিকিৎসক, প্রকৌশলী, ব্যারিস্টার, অধ্যাপক ও প্রশাসক হয়েছেন তা আমার জানা নেই। আপনারাতো তাদের উচ্চ শিক্ষাÑ বিশেষ করে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করার ঘোর বিরোধী। এসব পেশা জীবনে যদি ছেলেরাই একচেটিয়া আধিপত্য বজায় রাখে এবং নারীরা থাকে বঞ্চিত তাহলে ২০ বছর পরে আমাদের সমাজে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যারিস্টার ও প্রশাসকের ঘাটতি দেখা দেবে না কি? রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের পক্ষে ধর্মের নামে আপনারা দেশে পশ্চাৎমুখিতার ভাইরাস ছড়াচ্ছেন। আহলে সুন্নতিরা জনগণের উদ্দেশে ১২ দফা দাবি পেশ করেছেন। এ দাবি জনগণ গ্রহণ করলে সরকারও গ্রহণ করতে বাধ্য হবে। কিন্তু আপনারা তো জনগণকে তোয়াক্কাই করেন না।

জনগণের সমর্থন নিয়ে এরা সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করবে। আপনাদের দাবির প্রশ্নে জনগণের সমর্থনের প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন কি? এ দাবি মেনেই সরকারে থাকতে হবেÑ সরকারে আসতে হবে। বুঝা যায় সরকার একটি ঘরÑ আপনাদের ১৩ দফা দাবি এই ঘরের তালা খোলার চাবি। আপনাদের আন্দোলন ও পরিকল্পনায় জনগণ এখন সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। দেশ চলে সংবিধান অনুযায়ী সংবিধানের বিধিবিধান অনুসরণ ছাড়া কেউ ক্ষমতায় যেতে পারে না। তাহলে আপনাদের ১৩ দফা কি সংবিধানের ঊর্ধ্বে? যদি তাই হয়, তাহলে দাবির মধ্যে যাই থাক এ দাবি বাস্তবায়নের প্রস্তাবিত পদ্ধতি রাষ্ট্রদোহিতামূলক বলা যায়। আপনাদের ১৩ দফা মেনেই সরকারের থাকতে হবে এ কথা কি নির্বাচন ব্যবস্থার বিরোধী নয়? আপনাদের নির্বাচনকে ভয় পাওয়ার নির্দিষ্ট কারণ রয়েছে। দেশে ২০-৩০ লাখ মাদ্রাসা পড়–য়া ছাত্র আছেÑ তাদের বাইরে জামাতি টাকা ছড়িয়ে না হয় আরো ৩০ লাখ সমর্থক সংগ্রহ করলেন। খুলনার সমাবেশে আপনারা জেহাদের মাধ্যমে দাবি আদায় করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। গণতান্ত্রিক দেশে জেহাদের প্রশ্ন ওঠে কেন? সামনে নির্বাচনÑ আপনাদের দাবির সপক্ষে প্রার্থী দাঁড় করান। সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে ক্ষমতায় যাবেন এবং দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে সংবিধানও সংশোধন করবেন।

’৯১ সালে দেশে গণতান্ত্রিক শাসন পদ্ধতি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে বিভিন্ন জনকল্যাণমুখী কর্মসূচি বাস্তবায়নের ফলে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের প্রায় সব সূচকে আমাদের অগ্রযাত্রার প্রেক্ষিতে মার্কিন রাষ্ট্রদূত সুযোগ পেলেই বাংলাদেশকে অন্যতম উন্নয়ন মডেল বলে আখ্যায়িত করছেন। অনেক সমঝদার ব্যক্তি মত পোষণ করেন যে, তথাকথিত তলাবিহীন ঝুড়ির অবস্থা কাটিয়ে উঠে বাংলাদেশ বিভিন্ন উন্নয়ন সূচকে পাকিস্তান ও ভারতকে টপকিয়ে যাচ্ছে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে পাকি আইএসআই জামাতিদের মাধ্যমে দেশে এমন সহিংস নৈরাজ্য ও হরতাল এবং সর্বোপরি হীন অপপ্রচারের মাধ্যমে সরল প্রাণ মুসলিম জনতাকে ক্ষিপ্ত করে জাতীয় সম্পদ ও স্থাপনা ধ্বংসের কাজে লিপ্ত করে এবং উন্নয়নবিরোধী ধ্যান-ধারণা উস্কিয়ে দিয়ে আমাদের অগ্রযাত্রা ব্যাহত করার এক দুরভিসন্ধিমূলক অপপ্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। আমরা অনুরোধ করবো হেফাজতিরা পূর্বের ন্যায় ধর্মপ্রচার ও অনুশীলনের কাজে নিজেদের ব্যাপৃত রাখুন। দেশে ধর্মের নামে যুদ্ধোন্মাদনা সৃষ্টি করা ইসলাম প্রশ্রয় দেয় না। তবে যারা রাজনৈতিক বাণিজ্যের যে দুর্লঙ্ঘ লোভের শিকার হয়েছেন তা থেকে সহসা তাদের সরে আসা সম্ভব বলে মনে হয় না। আসলে ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করে জামাতি-হেফাজতি ও বিএনপির বর্তমান ধ্বংসাত্মক ও সহিংস কর্মকা-ের প্রতি আমরা বাংলার জনগণের পক্ষে ধিক্কার জানাই।

দেশের সংবিধান কোনো ধর্মীয় দলিল নয়। এটা রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে একটা রাজনৈতিক চুক্তি। রাষ্ট্র সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। সার্বভৌম ক্ষমতার কতোটুকু রাষ্ট্র স্বেচ্ছায় স্বীয় নাগরিকদের ভোগ করার অধিকার দিলো সংবিধানে তাই বিধৃত থাকে। ধর্ম পালনের অধিকার নাগরিকদের নিজস্ব ও অরাজনৈতিক অধিকার। রাষ্ট্রে একাধিক ধর্মের নাগরিক বসবাস করে। রাষ্ট্র সব ধর্মের নাগরিককে স্বাধীনভাবে স্ব স্ব ধর্ম পালন করার অধিকার দেয়। রাষ্ট্র কোনো নাগরিককে তার ধর্ম পালনে বাধা দেয়ার অধিকার রাখে না। আবার কোনো ধর্মের অনুসারী যদি অন্য কোনো ধর্মের অনুসারীদের নিজ ধর্ম পালনে বিঘœ সৃষ্টি করার পাঁয়তারা করে, তবে রাষ্ট্র নিরপেক্ষভাবে মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করে উভয়ের মধ্যে সমঝোতার পরিবেশ সৃষ্টি করবে। নাগরিকগণ ব্যক্তিগত ও সামাজিকভাবে ধর্মের অনুসারী। রাষ্ট্র কোনো ধর্মের অনুসারী নয়। ধর্ম বিশেষভাবে পারলৌকিক বিষয় আর রাষ্ট্র সম্পূর্ণভাবে ইহলৌকিক বিষয় নিয়ে ব্যস্ত। রাষ্ট্রের কোনো ধর্ম থাকার কথা নয়। তথাপি যেহেতু সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বলে স্বীকৃত আছেÑ তা প্রত্যাহার করলে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনমনে একটা চেতনাগত ভুল বোঝাবুঝির আশঙ্কা আছে। বিধায় এ ব্যাপারে কোনো পরিবর্তন সঙ্গত হবে না। তবে আল্লাহর ওপর সম্পূর্ণ আস্থাতো বান্দার থাকারই কথা এবং সৃষ্টিকর্তার ওপর সব ধর্মের অনুসারীদের অবশ্যই আস্থা রয়েছে। সুতরাং সৃষ্টিকর্তার ওপর সম্পূর্ণ আস্থার কথা সংবিধানে সংযোজন করলে, এতে কোনো নাগরিক আপত্তি করবে বলে মনে হয় না।

সকলেই জানে জাকাত আদায় করা ইসলামের মৌলিক পাঁচ স্তম্ভের অন্যতম এবং তা ফরজ। রাসুলুল্লাহ (সা.) এর মহা প্রয়াণের পর একদল নব্য মুসলমান জাকাত আদায় থেকে অব্যাহতি চেয়ে আন্দোলনে নামে। ১ম খলিফা হযরত আবু বকর গুরুত্বপূর্ণ ফরজ হুকুম অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে জেহাদের প্রস্তুতি নেন। আজকের সমাজে কতোজন বিত্তশালী মুসলিম স্বীয় সম্পদের ৪০ ভাগের এক অংশ প্রতি বছর গরিব দুঃখীদের মধ্যে বণ্টন করেন? আপনাদের দাবিনামায় সব সম্পদশালী মুসলমানকে সঠিকভাবে জাকাত আদায় করতে বাধ্য করতে হবে এ বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকলে এতে অসংখ্য দীন দরিদ্র মুসলমান উপকৃত হতো। কিন্তু হেফাজতিদের একদেশদর্শী শিক্ষা ও সাহচর্যের কারণে এ ধরনে জনহিতকর বিষয় তাদের মস্তিষ্কে আসে না।

এম এ রশীদ : সাবেক যুগ্ম সচিব ও কলামিস্ট।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

The Weeklydesh newspaper