এই সন্ত্রাস কত দিনের এবং কী জন্য?

1
আবদুল গাফফার চৌধুরী:
আমার ভবিষ্যদ্বাণী সঠিক হয়েছে তা বলি না, তবে আশঙ্কাটা সত্য হয়েছে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিএনপি-জামায়াত হরতাল-অবরোধের নামে জ্বালাও-পোড়াও সন্ত্রাসে নেমেছে। যেসব জায়গায় জামায়াতের দাপট বেশি, যেমন সাতক্ষীরা, বগুড়া, সিলেট, চট্টগ্রাম ইত্যাদি সেসব জায়গায় হরতাল বা অবরোধপূর্ব তা-বটা একটু বেশি হয়েছে। ঢাকার ছবি টেলিভিশনেই দেখছি। মঙ্গলবারের (২৬ নবেম্বর) ছবি। সকালের দিকে রাস্তাঘাট প্রায় জনশূন্য ছিল। কিন্তু দিন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাস্তাঘাট আবার স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে।
বিএনপি-জামায়াতের ট্যাকটিস, হরতাল বা অবরোধ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে এবং হরতালের নির্দিষ্ট সময় শুরু হওয়ার আগেই তারা ভাংচুর শুরু করে এবং অপ্রস্তুত জনসাধারণের ওপর হামলা চালায়। এই দুষ্কৃতিরা জানে, পুলিশ মাঠে নামলে তারা আর বীরত্ব দেখাতে পারবে না। এ জন্য সরকারেরও উচিত বিএনপি-জামায়াত হরতাল বা অবরোধ ডাকলেই আগেই প্রিয়েমটিভ এ্যাকশন নেয়ার জন্য তৈর থাকা। তাহলে জনগণের জানমালের নিরাপত্তার ব্যবস্থা আরেকটু নিশ্চিত হবে।
হাসিনা সরকার যদি শক্ত থাকেন, তাহলে তিন দিন কেন ত্রিশ দিন হরতাল, অবরোধ ডেকেও বিএনপি-জামায়াত নির্বাচন বানচাল করতে পারবে না। কারণ দেশের মানুষ তাদের সঙ্গে নেই। গু-া দ্বারা গু-ামি করে কোন দাবি আদায় করা যায় না। আমরা গান্ধী ও মুজিবের নেতৃত্বে হরতাল, অবরোধের আন্দোলন দেখেছি। এই আন্দোলনে দলের নেতাকর্মীরা আইন অমান্য করে পুলিশ এমনকি সেনাবাহিনীর মুখোমুখি হয়েছে। দলে দলে গ্রেফতার বরণ করেছে। গুলিতে অকাতরে প্রাণ দিয়েছে।
আর বর্তমানের খালেদা-নিজামীদের আন্দোলনে নেতাকর্মীদের রাজপথে দেখা যায় না। দলের সশস্ত্র ক্যাডার এবং ভাড়াটে গু-ারা রাস্তাঘাটে লুকিয়ে চুরিয়ে গাড়ি-ঘোড়া, নিরীহ মানুষের ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে পালিয়ে যায়। কাপুরুষদের এই সন্ত্রাস বেশি সময় টিকিয়ে রাখা যায় না। এই সন্ত্রাস জনগণের মধ্যে ত্রাস সৃষ্টি করতে পারে, সমর্থন সৃষ্টি করতে পারে না। তাই বিএনপি-জামায়াতের তথাকথিত আন্দোলন বার বার ব্যর্থ হয়। এবারেও ব্যর্থ হবে। মাঝখানে দেশের সাধারণ মানুষের জানমালের কিছু ক্ষতি করবে এবং ত্রিশ লাখ শিশু পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যত নষ্ট করবে। যেসব দলের দেশপ্রেম নেই, তারা দেশের শিশুদের ভবিষ্যত নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করবে কেন?
এই লেখাটা লিখছি এবং টেলিভিশনে আজকের (মঙ্গলবার) ঢাকার রাস্তাঘাটের অবস্থা দেখছি। জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হয়ে আসছে। রিক্সা, সিএনজি, কিছু প্রাইভেট গাড়িও চলছে। কোথাও বিএনপি-জামায়াতের মিটিং-মিছিলের টিকিটিরও দেখা নেই। অবরোধের প্রথম দিনই যখন এ অবস্থা, তখন বাকি দুই দিন কী হবে, তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। এর পর দলনেত্রী (তাঁকে ‘দেশনেত্রী’ বলা হয়) বেগম জিয়া সেজেগুজে আবার জনসমক্ষে আসবেন এবং তার যে অবরোধের ডাকে দেশের মানুষ সাড়া দেয়নি, সেই অবরোধ সফল করার জন্য দেশবাসীকে ধন্যবাদ জানাবেন। হয়ত আবার আরও কঠোর কর্মসূচীর নামে ৪৮ ঘণ্টার বদলে ৭২ ঘণ্টা, চাই কী ৮০ ঘণ্টা হরতাল দেবেন। যে হরতাল পালিত হয় না, সে হরতাল বার বার ডেকে জনগণের জীবনে বিড়ম্বনা ঘটাতে ‘দেশনেত্রীর’ দেশপ্রেমে বাধে না।
এ অবস্থায় সরকারের করণীয় কী? সরকার বিরোধী দলকে যথেষ্ট ছাড় দিয়েছে। আরও দিতে হয় দেবে। নির্বাচনকালীন সরকারের নেতৃত্ব অবশ্যই শেখ হাসিনার হাতে থাকবে এবং ঘোষিত সময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকারকে অনড় থাকতে হবে। তবে নির্বাচনের যে তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে, যেমন প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার দিন, ছাঁটাই বাছাইয়ের দিন, প্রত্যাহারের দিন ইত্যাদি তারিখগুলো একটু পিছিয়ে দেয়া যেতে পারে। ইতোমধ্যেই কোন কোন দল থেকে নির্বাচনে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার জন্য সময় খুবই কম দেয়া হয়েছে বলে আপত্তি উঠেছে। এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন নতুন করে সময় বাড়াতে পারে।
নির্বাচনকালীন সরকারকে আরও প্রতিনিধিত্বমূলক ও সর্বদলীয় করে তোলার জন্য শেখ হাসিনা সিপিবি ও বাসদ থেকেও তাঁর মন্ত্রিসভায় উপদেষ্টা নিয়োগ করতে পারেন। তাঁরা আওয়ামী লীগের সমালোচক হতে পারেন, কিন্তু বিএনপি ও জামায়াতের মিত্র নন। দেশে গণতন্ত্র বিপন্ন হতে পারে এ আশঙ্কার মুখে তাঁরা শেখ হাসিনার ডাকে সাড়া দিতেও পারেন। নইলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাঁরাও গুরুত্ব হারাবেন।
গণফোরামের ড. কামাল হোসেনের শেখ হাসিনার প্রতি একটি গভীর ব্যক্তিগত অসূয়াবোধ আছে। এই অসূয়াবোধ থেকে নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভাকে তিনি সহযোগিতা দিতে রাজি নাও হতে পারেন। কিন্তু তিনি নির্বাচন বর্জনের আন্দোলনে তাঁর দলকে বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে যুক্ত হতে দিয়ে শেষ বয়সে রাজনৈতিক হারিকিরি করবেন, তা আমার মনে হয় না। ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে নির্বাচনকালীন সরকারের একটা কথাবার্তার সম্পর্ক স্থাপন করা উচিত।
এমনকি বিকল্পধারার ড. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর সঙ্গেও। কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের কাদের সিদ্দিকী এখন হাসিনাবিরোধী যতই প্রলাপোক্তি করুন, প্রায় ‘দিল্লীকা লাড্ডুর’ প্রতি একটা লোভ আছে। বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকা-ের পর কাদের সিদ্দিকী পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নিয়ে এই দিল্লীকা লাড্ডুর স্বাদ যথেষ্ট আস্বাদন করেছেন। তিনি নাকি আবার দিল্লী যাচ্ছেন অথবা যাবেন। উদ্দেশ্য রাষ্ট্রপতি প্রণব বাবুর সঙ্গে সাক্ষাত করা। দেখা যাক, দিল্লী থেকে ফিরে এলে কাদের সিদ্দিকীর ভোল এবং বোলচাল দুই-ই পাল্টে যায় কিনা।
নির্বাচনী তফসিল ঘোষিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ‘দেশ অচল করে দেয়ার’ নামে বিএনপির এমন মরিয়া হয়ে সন্ত্রাসে নামার একটি বড় কারণ- দলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য এ ছাড়া তাদের সামনে আর দ্বিতীয় পথ নেই। বেগম খালেদা জিয়ার ঘনিষ্ঠ মহল থেকে জানতে পেরেছি, সন্ত্রাসে নামার জন্য তাঁর মনে একটি চাপ এবং একটি ভয় কাজ করছে। চাপটি হলো জামায়াতের। জামায়াত সিন্দবাদের দৈত্যের মতো বিএনপির কাঁধে সওয়ার আছে। পেছনে আছে পাকিস্তানের আইএসআইয়ের পৃষ্ঠপোষকতা। তারা বিএনপিকে কিছুতেই নির্বাচনে যেতে দিতে চায় না।
অন্যদিকে খালেদা জিয়ার মনে ভয়, তিনি নির্বাচনে না গিয়ে কেবল নিষ্ক্রিয় প্রতিবাদ জানালে তাঁর দলের নেতা ও কর্মীদের মনে হতাশা দেখা দেবে এবং নেতাদের মধ্য থেকেও একটা বড় অংশ নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য জোট বেঁধে দল ছাড়বে। বিএনপি ভেঙ্গে বিএনএফের মতো আরও দল-উপদল গজিয়ে উঠবে এবং তারা নির্বাচনে অংশ নেবে। তাতে বিএনপির নির্বাচন বর্জন সম্পূর্ণ অর্থহীন হয়ে যাবে। বেগম জিয়া নাকি এমনও খবর জানেন, তাঁর দলের একাধিক শীর্ষস্থানীয় নেতা দলের নিষেধাজ্ঞা ডিঙ্গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে যাবেন এবং জয়ী হলে দলে ফিরে আসতে দিলে ফিরবেন বলে নেত্রীকে আশ্বাস দিয়েছেন। এদের নির্বাচনে অংশ নেয়া থেকে বিরত রাখা এবং দলের কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা রাখার জন্যও বিএনপির এ্যাকশন প্রোগ্রামে যাওয়া দরকার এবং বিএনপি তা-ই করেছে।
এই এ্যাকশন প্রোগ্রাম সফল হবে না। জনমনের ভীতি ও সমর্থন এক কথা নয়। বিএনপি গত পাঁচ বছরের অধিকাংশ সময় জামায়াতের সঙ্গে মিলে আন্দোলনের নামে যা করেছে, তাতে জনমনে ভীতি তৈরি হয়েছে কিন্তু সমর্থন তৈরি হয়নি। এই সমর্থন তৈরি না হওয়াতেই বিএনপির শীর্ষনেতারা তাদের হরতাল-অবরোধের সময় রাস্তায় নামতে সাহস পান না এবং জামায়াত-শিবিরও চোরাগোপ্তা হামলা ছাড়া আর কোনপ্রকার বীরত্ব প্রদর্শনের মুরদ দেখাতে পারে না। ভারতে এক সময় নকশালপন্থী ও মাওবাদীরা বাংলাদেশের জামায়াতীদের চাইতে অনেক ভয়াবহ ও দীর্ঘকালীন সন্ত্রাস চালিয়েও সফল হতে পারেনি।
এ জন্যই মঙ্গলবার (২৬ নবেম্বর) থেকে আহুত বিএনপির ৪৮ ঘণ্টার অবরোধ আকস্মিকভাবে শুরু হয়ে এত তাড়াতাড়ি শিথিল হয়ে গেছে এবং পরবর্তী দুই দিন যে আরও শিথিল হবে, তাতে সন্দেহ নেই। সরকারকে এই সন্ত্রাস দমনে কঠোর ও আপোসহীন মনোভাব গ্রহণ করতে হবে। রাজনৈতিক দাবির ব্যাপারে বিএনপিকে তারা যতটা ছাড় দিতে পারেন, দেবেন। কিন্তু সন্ত্রাসের ব্যাপারে বিএনপি ও জামায়াত এই দুটি দলের সঙ্গেই কোন প্রকার আপোস নেই। সন্ত্রাসের সঙ্গে আপোস-নীতি দেশের এবং গণতন্ত্রের সর্বনাশ ঘটাবে।
আওয়ামী লীগের জন্য বিশেষ করে দেশের গণতান্ত্রিক শিবিরের জন্য একটি বড় সুখবর। আওয়ামী লীগকে যে কোনভাবে ক্ষমতা থেকে উৎখাতের জন্য দেশে-বিদেশে যে একটি চতুর্মুখী চক্রান্ত শুরু হয়েছিল, তা এখন বড় একটা হালে পানি পাচ্ছে না। আমেরিকায় ইউনূস-দেবপ্রিয় জুটির পরিকল্পিত অভিযান ব্যর্থ হয়েছে। নিউইয়র্ক টাইমস, ইকোনমিস্ট প্রভৃতি প্রভাবশালী পশ্চিমা পত্রিকাগুলোকে হাত করে এবং তাদের দ্বারা হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে সত্য-মিথ্যা প্রচার চালিয়েও ওবামা প্রশাসন বা আমেরিকার বৃহত্তর জনগণকে প্রভাবিত করা যায়নি। স্টেট ডিপার্টমেন্টের একটি কট্টর রক্ষণশীল অংশ ছাড়া বৃহত্তর অংশই চায় না, বাংলাদেশে তালেবানী বা আধা তালেবানী সরকার ক্ষমতায় আসুক। বাংলাদেশের ভেতরেও ইউনূস শিবিরের দুটো মুখপত্র প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার অতীতের আজাদ ও মর্নিং নিউজের মতো আদাজল খেয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে প্রচার অভিযানে নেমেছে। খুব একটা সুবিধা করতে পারছে না। কারণ, এদের ভূমিকা এখন দেশের সচেতন মানুষের কাছে এক্সপোজড।
শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের কাছে আমার একটাই অনুরোধ, রূপকথার রাক্ষসপুরীর মতো বিএনপি-জামায়াতরূপী রাক্ষসরা দল বেঁধে বর্তমান সরকারকে যতই ভয় দেখাক, তারা সফল হবে না। কিন্তু আওয়ামী লীগকে মনোবল অক্ষুণœ রেখে সাহসের সঙ্গে সামনে এগোতে হবে। নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নে টাকার খেলা যেন আর না হয়। সৎ ও যোগ্য প্রার্থীরা যেন মনোনয়ন পান। তৃণমূলের জনগণের ইচ্ছা ও পছন্দ যেন এই মনোনয়নে প্রতিফলিত হয়। নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা যেন কোন কারণেই প্রশ্নবিদ্ধ না হয়। শেখ হাসিনাকে প্রমাণ করতে হবে, তাঁর নেতৃত্বে গঠিত সর্বদলীয় অথবা বহুদলীয় একটি সরকার সম্পূর্ণ অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে আগ্রহী, আন্তরিক এবং সক্ষম। এটা জননেত্রী প্রমাণ করুন, দেখবেন এই সন্ত্রাসের দীর্ঘ কালো হাত ভেঙ্গে পড়বে এবং একটি গণতান্ত্রিক অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ টিকে থাকার জন্য এসেছে এবং টিকে থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

The Weeklydesh newspaper