জামায়াত: মডারেট না চরমপন্থী

jamat


জামায়াতের নিবন্ধন বাতিলের রায় একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। নিবন্ধন বাতিলের মাধ্যমে দলটির রাজনীতি নিষিদ্ধের পথে বাংলাদেশ একধাপ এগিয়ে রইল।

রায়টি সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত কয়েকজন বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞের কাছে তাদের অভিমত জানতে চেয়েছিলাম। কিন্তু কেউই সুনির্দিষ্ট কোনো উত্তর দিতে চাইলেন না। সবার উত্তরের সরমর্ম হচ্ছে, “আমরা অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছি।”

অর্থাৎ উনারা বুঝতে চাচ্ছেন বাতাসের গতি। তারপর উনাদের মতামত জানাবেন।

এই বিষেশজ্ঞদের কার্যক্রম, বক্তব্য ও লেখনি থেকে বোঝা যায় যে তারা জামায়াতকে নিয়ে যত না উদ্বিগ্ন তার চেয়ে অনেক বেশি আওয়ামী লীগ ও আল কায়েদা নিয়ে। গণহত্যার সঙ্গে জামায়াতের সংশ্লিষ্টতা, সন্ত্রাস, মৌলবাদী রাজনীতি নিয়ে এদের সে রকম কোনো নিবন্ধ অথবা গবেষণা নেই। এদের গবেষণার মূল বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশে ইসলামিক র‌্যাডিক্যালিজমের উত্থান।

কিন্তু প্রকৃত কারণ হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক প্রণোদনা। যুক্তরাষ্ট্রে আলোচ্য বিষয় হিসেবে ইসলামিক র‌্যাডিক্যালিজম জামায়াতি ইস্যুর চেয়ে অনেক বেশি আকর্ষণীয়। এ নিয়ে আলোচনা করা, প্রবন্ধ ও নিবন্ধ লেখার অনেক আউটলেট ও আর্থিক সুবিধা আছে। যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রে জামায়াতবিরোধী অবস্থানের তেমন কোনো রাজনৈতিক মূল্য নেই এবং একই কারণে জামায়াত-সম্পর্কিত সভা ও সেমিনারে অংশগ্রহণের সুযোগও সীমিত– সেহেতু এ বিষেশজ্ঞদের মধ্যে জামায়াতের মৌলবাদী রাজনীতি নিয়ে ততটা মাথাব্যথা নেই যতটা আছে ইসলামিক র‌্যাডিক্যালিজম নিয়ে!

বাংলাদেশি বিষেশজ্ঞরা আরেকটি কারণে জামায়াত সম্পর্কে তেমন উচ্চবাচ্য করছেন না; আর সেটি হচ্ছে চৈনিকপন্থী রাজনীতির সঙ্গে তাদের অতীত সংশ্লিষ্টতা। আদর্শিক কারণে তারা ও তাদের অনেক নেতা সেই ষাটের দশক থেকেই ভারতে ও রাশিয়ায়। যে জন্য আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ, বাঙালি জাতীয়তাবাদী শ্লোগান ‘জয় বাংলা’ ও শেখ মুজিবর রহমানের নামের আগে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি তারা কখনও মেনে নিতে পারেননি। তারা এখনও মনেপ্রাণে বিএনপিকে আওয়ামী লীগের চেয়ে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক দল মনে করেন।

এই বিষেশজ্ঞরা মনেপ্রাণে ধর্মনিরপেক্ষ হলেও আদর্শিক কারণে জামায়াত-বিরোধিতা করে আওয়ামী লীগকে কোনো রাজনৈতিক সুবিধা দিতে নারাজ। তারা মনে করেন সরাসরি জামায়াত-বিরোধিতা মানে হচ্ছে আওয়ামী লীগকে শক্তিশালী করা। কোনো কারণে যদিও-বা তারা জামায়াত-বিরোধী কোনো সভাতে অংশ নেন, নিরপেক্ষতার ভেক ধরে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের মধ্যে অতীতের আঁতাতের বিষয়টি তুলে ধরে জামায়াত ইস্যুতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে একসারিতে নিয়ে আসার চেষ্টা করেন। তাতে করে সাপও মরে, লাঠিও ভাঙে না।

কেন জামায়াত নিষিদ্ধ জরুরি

যুক্তরাষ্ট্রের মতে, জামায়াতে ইসলামী একটি মডারেট ইসলামিক দল। বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত জামায়াতে ইসলামীকে এ স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। কিন্তু জামায়াতকে ‘মডারেট’ ইসলামিক দল নামে তকমা দেওয়া হলেও আদতে দলটি চরমপন্থী। দলটির তাত্ত্বিক ভিত্তি হচ্ছে ‘মওদুদীবাদ’। মওদুদী জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা। তিনি হচ্ছেন প্রথম ইসলামিক চিন্তাবিদ যিনি সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের আহ্বান জানিয়েছিলেন।

১৯৫৩ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের লাহোরে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের উপর হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। হত্যাযজ্ঞে উসকানি দেওয়ার দায়ে এক মিলিটারি ট্রাইব্যুনালে জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা মওদুদীকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়। এ রায়ের পর ১২ মে পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যামবেসি থেকে স্টেট ডিপার্টমেন্টে পাঠানো এক তারবার্তায় মওদুদীকে ‘most dangerous man in Pak’ বলে উল্লেখ করা হয়।

১৯৭১ সালে এ দল বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করে পশ্চিম পাকিস্তানি সেনাদের গণহত্যা, নারীধর্ষণ, লুটপাটসহ সব ধরনের ধ্বংসাত্মক তৎপরতার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিল।

প্রশ্ন হচ্ছে, মানবতাবিরোধী অপরাধে সম্পৃক্ত থাকার জন্য ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে যদি নাৎসি ও ফ্যাসিবাদীদের রাজনৈতিক অধিকার না থাকে, তবে বাংলাদেশে গণহত্যায় সম্পৃক্ত থাকার জন্য জামায়াতে ইসলামী কেন নিষিদ্ধ হতে পারবে না?

জামায়াত কেন গণতান্ত্রিক দল নয়

যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট মনে করে যে জামায়াত যেহেতু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা মেনে নিয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রায় ৫ ভাগের মতো ভোট পেয়েছে, সেহেতু একে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা ঠিক হবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের এ অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞরাও ইনিয়ে-বিনিয়ে বলার চেষ্টা করেন যে, কোনো ব্যক্তি ও দলের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করার সমঅধিকার আছে। যেহেতু ধর্মভিত্তিক রাজনীতি বাংলাদেশে নিষিদ্ধ নয়, সেহেতু জামায়াতেরও রাজনীতি করার অধিকার থাকতে পারে।

তারা আরও মনে করেন, জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার ফলে হিতে বিপরীত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাতে এ দলের ক্যাডাররা অন্যান্য ডানপন্থী দলে যোগ দিয়ে আরও চরমপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়বে। আর তখন দেশে অস্থিতিশীলতা বাড়বে।

বস্তুতপক্ষে, জামায়াতে ইসলামী গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করলেও তাত্ত্বিকভাবে গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না। যেমন, মুওদুদীবাদ মানব-রচিত সব ধরনের মতবাদ, যেমন গণতন্ত্র, পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রকে প্রত্যাখান করে। মওদুদীবাদের এ তাত্ত্বিক ভিত্তি জামায়াতের প্রয়াত আমীর আব্বাস আলী খানের এক লেখাতেও প্রকাশ পেয়েছিল।

আরেকটি লেখায় সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে, কোনো ব্যক্তিকে জামায়াতের রাজনীতিতে অংশগ্রহণের পূর্বশর্ত হিসেবে দলের মূলনীতিতে বিশ্বাসী হতে হবে। অর্থাৎ কোনো হিন্দু অথবা খ্রিস্টান যদি জামায়াতের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করতে চায় তবে তাকে প্রথমে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হতে হবে।

তার মানে জামাতীয় রাষ্ট্রে অমুসলিমের সরকারপ্রধান হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। জামায়াতের এ তত্ত্ব বৈষম্যমূলক ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পরিপন্থী।

যেহেতু সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের জামায়াতী চেষ্টা ১৯৭১ সালে ব্যর্থ হয়েছে, বর্তমানে এ দলের মূল লক্ষ্য হচ্ছে মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুডের মতো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ব্যবহার করে ক্ষমতায় গিয়ে দেশকে শরিয়াভিত্তিক একটি ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত করা।

একটি চরমপন্থী মতাদর্শের দলকে এভাবে নিজেদের রূপ লুকিয়ে রাজনীতি করতে দেওয়ার পরিণতি তো ভালো হবে না।

লেখক: এবিএম নাসির

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

The Weeklydesh newspaper