সংসদ যেখানে অকার্যকর

parliament

যে বিশেষ পরিপ্রেক্ষিতে লেনিন পার্লামেন্টকে ‘শুয়োরের খোয়ার’ বলেছিলেন, কেউই অস্বীকার করতে পারবেন না, তেমন পরিপ্রেক্ষিত প্রায়ই ফিরে ফিরে আসে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে। লেনিন যে পরিপ্রেক্ষিত থেকে কথাগুলো বলেছিলেন, সে পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় না নিয়ে বিশেষণটি নিয়ে বাংলাদেশে বহু কূটচাল হয়েছে; কিন্তু তিক্ত শোনালেও বিশেষণটি যে ক্ষেত্রবিশেষে কত সত্য সেটি টের পাওয়া যায় আমাদের জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সরকারি ও বিরোধী উভয় দলের সদস্যরা উপস্থিত থাকলে।

বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ কার্যকর নয় বলে আমরা প্রায়ই ক্রুদ্ধ হই, উদ্বিগ্ন হই। কিন্তু আমাদের সংসদ সদস্যরা বড়ই সৃজনশীল, সংসদ কার্যকর হতে না হতেই তারা তাদের সৃজনশীলতা দিয়ে যে সংসদীয় ভাষা নির্মাণ করতে থাকেন, তা শুনে মনে হয়, এর চেয়ে সংসদ অকার্যকর থাকা অনেক ভালো!

আমাদের রাজনীতিকরা সংসদীয় এ পরিভাষাগুলো প্রয়োগের জন্য একটি সংসদীয় ব্যাকরণও তৈরি করেছেন, বলা চলে। সংক্ষেপে বলতে গেলে সে ব্যাকরণ অনুযায়ী, নির্বাচনের মাধ্যমে (আরও সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের মাধ্যমে) একটি জাতীয় সংসদ গঠিত হবে, সংসদ নির্বাচনে যারা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবেন তারা সরকার গঠন করবেন। এরপর সরকার গঠনকারী দলের সংসদ সদস্যরা সংসদকে রাজনীতি ও গণতন্ত্রচর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করার বাণী দিতে থাকবেন।

অন্যদিকে, যারা সরকার গঠনে ব্যর্থ হবেন, তারা প্রথমদিকে কয়েকটি অধিবেশনে ঘন ঘন ওয়াকআউট করতে থাকবেন এবং এরই এক পর্যায়ে তারা তাদের ‘আন্দোলনের অংশ’ হিসেবে সংসদ বর্জন করতে থাকবেন, যতদিন পর্যন্ত না তাদের সংসদ সদস্যপদ বাতিলের হুমকি দেখা না দেয়। সরকারি দলের সংসদ সদস্যরাও পারতপক্ষে সংসদ অধিবেশনে যোগ না দেওয়ার কিংবা দেরিতে হাজির হওয়ার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাবেন, যার ফলে সংসদে কোরাম সঙ্কট দেখা দেবে; তবে প্রধানমন্ত্রী সংসদে উপস্থিত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিতেই এরা তাদের আনুগত্য প্রমাণের জন্য সংসদে হাজির হবেন, সারাদিন পার্লামেন্টের আসনে বসে থেকেও তারা আর ক্লান্ত হবেন না। তারা ফ্লোর নিয়েই প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠবেন, কেননা তিনিই আমাদের ‘মালিকে সংসদ’।

সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের মধ্যে ব্যক্তি ও শ্রেণিস্বার্থ নির্দিষ্ট কয়েকটি বিষয় ছাড়া জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়েই ঐক্য থাকবে না এবং তেমন কোনো ঐক্য-অনুরাগ কিংবা প্রচেষ্টা ওই সদস্যের অযোগ্যতা ও পাপ বলে গণ্য করা হবে। তবে সরকারি, কি বেসরকারি উভয় জাতের সংসদ সদস্যরাই বেতনগ্রহণের ক্ষেত্রে ঐক্যবদ্ধ থাকবেন, টেলিফোন বিল তুলে ফেলার কাজে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেবেন, শুল্কমুক্ত গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে কর্তব্যপরায়ণ আচরণ করবেন; কিন্তু জাতীয় সংসদে আলোচনা ও সংলাপের মাধ্যমে বিভিন্ন জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট আইন প্রণয়নের লক্ষ্যে তাদের কার্যকর কোনো তৎপরতাই আমাদের চোখে পড়বে না।

গত ৪২ বছরের নানা চড়াইউৎরাইয়ের মধ্য দিয়ে আমাদের নিরলস সংসদ সদস্যরা শেষ পর্যন্ত আমাদের এ রকম একটি সংসদীয় ব্যাকরণ উপহার দিতে সক্ষম হয়েছেন।

প্রশ্ন হল, ‘এই সংসদীয় ব্যাকরণ দিয়া আমরা কী করিব?’ এ সংসদীয় ব্যাকরণ অনুযায়ী গত তিন জুন জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে বিএনপি যোগ দিয়েছে; কেননা তা না হলে তাদের সদস্যদের পদ হারাতে হত। যতটা না বাজেট অধিবেশনে ভূমিকা রাখতে, তারও বেশি সদস্যপদ বাঁচিয়ে রাখার উদ্দেশ্যতাড়িত এ সংসদযাত্রার ফল এটাই যে, তারা হয় উদ্দেশ্যহীন আলোচনায়, না হয় উদ্দেশ্যহীন ওয়াকআউটে ব্যস্ত আছেন। এর শেষ পরিণতি হিসেবে তারা যে আবার সংসদবর্জনের পথই বেছে নেবেন, তা লেখাই বাহুল্য।

এক কথায় বলতে গেলে, তাদের সংসদীয় ব্যাকরণে সংসদবর্জন একটি সংস্কৃতি হয়ে উঠেছে। আর এ সংস্কৃতির ভয়াবহতা থেকে জনগণকে বাঁচাতে এখন সুশীল শক্তির পক্ষ থেকে সুপরামর্শ আসছে যে, সংসদবর্জন ঠেকানোর লক্ষ্যে আইন করা হোক! আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সংসদীয় ব্যাকরণ সুশীলদের সুপরামর্শ দেওয়ার যে সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে তা তারা হাতছাড়া করবেন কেন!

এভাবে ‘গণতান্ত্রিক’ উপায়েই মানুষকে গণতন্ত্র থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যান্ত্রিকভাবে আইন নির্মাণ, প্রয়োগ ও চাপিয়ে দেওয়া বা মেনে নেওয়ার পথে মানুষকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে এবং গড়পড়তাভাবে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে এ ধারণা যে, একনায়কতান্ত্রিক সরকারই সর্বোত্তম, কেননা তারা ‘ডাণ্ডা মেরে ঠাণ্ডা’ করে রাখতে পারে, একটি শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা তৈরি করে ‘উন্নয়ন’ ঘটাতে পারে।

গণতন্ত্র সম্পর্কে অহরহ বলা হয় যে, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের অভিমতও ভুল হতে পারে। যদিও বাংলাদেশের কিংবা পৃথিবীর অন্য কোনো রাষ্ট্র পরিচালনায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের চিন্তার প্রতিফলন কীভাবে ঘটে, কীভাবে ঘটতে পারে এ সমালোচকদের তা নিয়ে খুব একটা মাথাব্যথা নেই। সংসদে যারা যাচ্ছেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে গেলেও তারা আসলে প্রতিনিধিত্ব করছেন শ্রেণির। সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রতিনিধিত্ব তারা করছেন না। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ, মেহনতি মানুষ, শ্রেণিবিন্যাসের নিম্নবর্গে পড়ে থাকা মানুষদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক চিন্তা ও সংগ্রামের প্রতিফলনও তাই ঘটছে না সংসদে।

যেমন, এ বাজেটেও কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রাখা হচ্ছে এবং এ নিয়ে দু দলের কোনো সদস্যই উচ্চকিত নন। কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়ার পরও কেউ সাদা করে না– সরকার বা মন্ত্রীদের সেটা জানা আছে। কিন্তু তারপরও তেমন সুযোগ প্রতিবারই রাখা হয় এবং প্রতিবারই সুযোগটা দেওয়া হয় কোনো বিশেষ খাতে তেমন টাকা বিনিয়োগ করার জন্য। যেমন, এবার ভূমিক্রয় ও গৃহায়ণসংক্রান্ত খাতে কালো টাকা বিনিয়োগ করার সুযোগ রাখা হয়েছে। যদিও এ সুযোগ যারা রেখেছেন তারা জানেন এ সুযোগের ফলে জমিজমা ও গৃহের দাম দ্রুত বেড়ে যাবে এবং দাম বাড়ার সে খেসারত সাধারণ মানুষকেই দিতে হবে।

জনগণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জাতীয় সংসদ গড়ে তুলেছে, অথচ সে সংসদও এভাবে ক্রমশ জনগণ থেকে দূরবর্তী একটি শ্রেণি হয়ে উঠছে, যেমন এখন রাষ্ট্রও একটি কেন্দ্রীভূত শ্রেণিতে পরিণত হয়েছে। গণতন্ত্রের সংজ্ঞা বাস্তবে দাঁড়িয়েছে এটাই যে, সেটি এমন একটি ব্যবস্থা যেটি জনগণের সামনে বিভিন্ন স্থানীয় কাঠামোসহ জাতীয় সংসদের নির্বাচনে নির্দিষ্টসংখ্যক রাজনৈতিক দুর্বত্তের নির্বাচনে অংশগ্রহণের পথ খুলে দেয় এবং অন্যসব পথ বন্ধ করে দেয়। এমন একটি সংজ্ঞা নিয়ে যে গণতন্ত্র বিকশিত হতে থাকে, তার সঙ্গে একনায়কতান্ত্রিকতার কোনো পার্থক্য থাকে না এবং বাংলাদেশেও মূলত চলছে সংসদীয় একনায়কত্ব।

আমাদের রাজনীতিকরা, ছাত্রআন্দোলনকারীরা বারবার ঐক্যবদ্ধভাবে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছেন; কিন্তু নিজেদের মধ্যে যে পারষ্পরিক আস্থাহীনতা রয়েছে তা দূর করার জন্য বেছে নিয়েছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের তত্ত্ব। গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু হয়েছে পারস্পরিক আস্থাহীনতার মধ্য দিয়ে এবং আজকের এ পরিস্থিতি সে আস্থাহীনতারই ফসল।

আশি ও নব্বইয়ের দশকে নিশ্চয়ই তেমন আস্থাহীনতার পরিপ্রেক্ষিত ছিল। তা ছিল এত গভীর যে যুগপৎ এক দশক সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন করেও নির্বাচনি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্ভর করতে হয়েছিল তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার উপরে। রাজপথের আন্দোলনে অভিন্ন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম করা সহজ ছিল, কিন্তু নির্বাচনের প্রশ্ন আসায় রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে ক্ষমতার প্রশ্ন বড় হয়ে ওঠে, ক্ষমতার লড়াইও বড় হয়ে দেখা দেয় এবং তাই অবিশ্বাসও বড় হয়ে ওঠে।

অবিশ্বাসের ওই খাদ থেকে রাজনৈতিক দলগুলো উঠে আসতে পারে না। সামরিক আমলাতন্ত্রের সঙ্গে বেসামরিক আমলাতন্ত্রের দ্বন্দ্ব, ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সঙ্গে এনজিওর দ্বন্দ্ব, কর্পোরেট শক্তির সঙ্গে এনজিওর দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে আমলাতান্ত্রিক সুশীলতন্ত্রের দ্বন্দ্ব– বাংলাদেশের রাজনীতি ও সমাজ এ রকম বিভিন্ন দ্বন্দ্ব-সংঘাতের মধ্য দিয়ে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে জাতীয় সংসদ জনগণের হয়ে বিরুদ্ধপক্ষকে চ্যালেঞ্জ করার শক্তি হারিয়েছে এবং নিজেদের মধ্যকার দ্বন্দ্বপ্রকাশের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। ফলে সংসদবর্জনকে সংস্কৃতি হিসেবে গ্রহণ ও বিকশিত করাও তাদের পক্ষে সহজ হয়েছে।

আমরা জানি না, বিএনপি আরও কতদিন জাতীয় সংসদে থাকবে। কিংবা সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা, যাদের সরকারি দলের বলেই অনন্যোপায় হয়ে সংসদে থাকতে হয়, তারা তাদের শাসনামলের স্তুতি বাদ দিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে জনকেন্দ্রিক ইস্যু ও আইন নিয়ে কথা বলবেন কি না– তাও জানা নেই আমাদের। জাতীয় সংসদের অধিবেশন চলার সময় মিনিটপ্রতি ব্যয় নাকি ৭৮ হাজার টাকা! এ টাকা অর্থবহভাবে ব্যয় করা হচ্ছে কি না, সেটি নিশ্চয়ই দেখতে চাই আমরা। আমাদের সংসদ সদস্যরা অনুপস্থিত থেকে বেতন তো নিচ্ছেনই, উপস্থিত থেকেও সময় নষ্ট করছেন এবং অনর্থক ব্যয়ের তালিকায় যুক্ত করছেন হাজার হাজার টাকা– যার দায় তাদের কাঁধেই পড়া উচিত। যদিও সবাই জানেন, সে দায় তারা নিতে নারাজ।

আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপি, সংসদে যে-ই সংখ্যাগরিষ্ঠ হোক না কেন, এ সুনির্দিষ্ট অনিয়মের ব্যাকরণ অনুযায়ী চলছেন তারা এবং তার জন্য জবাবদিহিতা করতেও রাজি নন। কিন্তু এ অনিয়ম পুঁজি করে সুশীল নাগরিকরা কর্পোরেটতন্ত্রের পক্ষে দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক শক্তির ক্ষমতা খর্ব করতে পারবেন, এ রকম ভাবাও ঠিক হবে না। দু দলের সংসদ সদস্যরা নির্বাচিত হওয়ার পর জাতীয় সংসদ কেন্দ্র করে জনগণের আকাঙ্ক্ষাবহির্ভূত যে গণতন্ত্রহীনতার বলয় গড়ে তুলেছেন তা থেকে মুক্ত হতে, অন্যদিকে সুশীল নাগরিকদের রাজনীতিবহির্ভূত দেশপ্রেমিক তৃতীয় শক্তির দুঃস্বপ্ন থেকে দূরে থাকতে আমাদের প্রয়োজন সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের অংশগ্রহণ ও অনুশীলনের পরিসর বাড়ানো। সংসদ কীভাবে অর্থবহ হবে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলক হয়ে উঠবে, সে সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক দলগুলোকেই নিতে হবে।

যে বিশেষ পরিপ্রেক্ষিতে লেনিন পার্লামেন্টকে ‘শুয়োরের খোয়ার’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন, সে রকম পরিপ্রেক্ষিত যেন এখানে দেখা না দেয় সে জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে নতুন করে ভাবতে হবে। সার্বভৌম জাতীয় সংসদ যেন জনগণের সার্বভৌমত্বই প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তা যেন বিভিন্ন শীর্ষ শ্রেণির বা শ্রেণিঅভ্যন্তরের বিভিন্ন গোষ্ঠীর ক্ষমতার ভারসাম্য সৃষ্টির উপাঙ্গ না হয়ে ওঠে সে ব্যাপারে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত মনোযোগী হওয়া।

ইমতিয়ার শামীম : লেখক, সাংবাদিক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

The Weeklydesh newspaper