সংঘাতের আশঙ্কা নিয়ে নতুন বছরে

a


বাংলাদেশের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরেই একটি সংঘাতময় পরিবেশে চলছে। এটা কারও কাছেই কাম্য হতে পারে না। এর ফলে দেশে নানা রকম উচ্ছৃঙ্খলা দেখা দিচ্ছে। দেশের জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারও লঙ্ঘিত হচ্ছে। আমাদের এমন একটি পরিবেশ দরকার যেখানে রাজনৈতিক দলগুলো একে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে, পরস্পরের মতামতকে শ্রদ্ধা করবে বা সহ্য করবে। এমন একটি পরিবেশ যদি না থাকে তাহলে সেখানে গণতন্ত্রের ভিত সুদৃঢ় হতে পারে না। দুর্ভাগ্যবশত আমরা এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যে রয়েছি যেখানে এর কোনোটাই নেই। ফলে সামগ্রিকভাবে এ সংস্কৃতি যেকোনো জাতির জন্য লজ্জাজনক ও হতাশাব্যঞ্জক।

রাজনীতিবিদরা একে অন্যের বিরুদ্ধে যেভাবে কথা বলেন বা অন্যদের বিরুদ্ধেও বলেন এটা কোনো সংস্কৃতিবান মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। এ অপসস্কৃতির আবহে সংঘর্ষের রাজনীতি আরও বেড়ে চলেছে। রাজনীতিতে সংঘর্ষ বাড়ার আরেকটি কারণ তৈরি হয় নির্বাচন এগিয়ে এলে। তখন হালুয়া-রুটির ভাগ নিয়ে দলগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হতে থাকে।

২০১২ সালে আমাদের এই রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যে কোনো অগ্রগতি দেখিনি। মূলত গত নির্বাচনের পর থেকেই রাজনৈতিক ময়দানে একটা অস্থিরতা চলছিল। রাজনৈতিক দলগুলোর পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস-সন্দেহ এখন আরও বেড়ে গেছে। বিশেষ করে বর্তমান সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করার পর দলগুলোর মধ্যে সমস্যা তীব্র হয়েছে। এক কথায় বলা যায়, ২০১২ সালে আমাদের রাজনীতির কোনো পুরনো সমস্যার সমাধান তো হয়নি বরং নতুন নতুন সমস্যা তৈরি হয়েছে।

আমরা নতুন বছরে প্রবেশ করেছি। সাধারণ মানুষের মধ্যেও খুব একটি উদ্বেগের বিষয় এই নির্বাচনী বছর। বর্তমান সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করেছেন। এ অবস্থায় প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে কিনা সে ব্যাপারে গুরুতর সন্দেহ দেখা দিয়েছে।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসেছিলেন তরুণ ভোটারদের ম্যান্ডেট পেয়ে। যুদ্ধাপরাধের বিচারের ইস্যুটি তখন জনগণের সামনে ছিল। সরকার আশা করছেন এবারও তারা যুদ্ধাপরাধের বিচারের প্রশ্নে ভোটারদের বিশেষত তরুণদের আকৃষ্ট করতে পারবেন। কারণ দেশের জনগণ যুদ্ধাপরাধের বিচার চান। বিচারকাজ এখনও চলছে। এটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হোক এটা সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা। বর্তমান সরকার মনে করছেন, বিচারকাজটি নির্বাচনের আগে শেষ করতে পারলে এটা তাদের জন্য বড় একটি অর্জন হবে।

ওদিকে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত রাজনৈতিক দল বা এর নেতাদের অনুগামীরা বিচার বানচাল করা বা রুখে দেওয়ার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছে। এর ফলে দেশের রাজনীতি সামগ্রিকভাবে সংঘাতমুখর হয়ে উঠছে। এ বছর, মানে ২০১৩ সালে তাই রাজনৈতিক সংঘাত ও হানাহানি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ আশঙ্কার কারণ, আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয় বলেই। রাজনৈতিক দলগুলো বেশ কয়েকবার এরকম হানাহানি বা সংঘাতমুখর অবস্থায় সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে। ১৯৯৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চালু হয়েছিল কোনো সমঝোতার ভিত্তিতে নয়- আন্দোলনের মাধ্যমে। একইভাবে ২০০৬ সালে সংঘাত-সংঘর্ষে উত্তাল ছিল রাজপথ, বিপন্ন হয়েছিল জনগণের জীবন।

আমাদের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একমাত্র সমঝোতা হয়েছিল জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনের সময়। তখন দলগুলো একসঙ্গে আন্দোলন করে এরশাদ সরকারের পতনে ভূমিকা রেখেছে। ১৯৯০ সালে এরশাদের পতনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে গণতন্ত্রের পথে অভিযাত্রা শুরু হয়। কিন্তু এরপর, গত তেইশ বছরে আমাদের গণতান্ত্রিক দলগুলো কখনও একমত হতে পারেনি বা কোনো আন্দোলনও সংঘাত ছাড়া সমঝোতায় পৌঁছায়নি।

বরাবরের মতো এবারও তাদের মধ্যে সমঝোতা হওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। তবু সুখের বিষয় যে, সরকারের দিক থেকে আলোচনায় বা সংলাপে বসার ব্যাপারে আগ্রহের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু দু’দলের মধ্যেকার সংলাপ বা আলোচনার ব্যাপারে অতীতের অভিজ্ঞতা ফলপ্রসূ নয়। এর আগে বিএনপি মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়া ও আওয়ামী লীগের মহাসচিব আবদুল জলিলের মধ্যে সংলাপ হয়েছে দীর্ঘদিন। আমরা তখন আশা করেছিলাম যে, এভাবে উদ্ভূত রাজনৈতিক সংকটের সমাধান হবে। সেটা কিন্তু হয়নি। ফলে রাজনীতি আবার সেই সংঘাতের মধ্যেই চলে গিয়েছিল।

বর্তমান পরিস্থিতিতেও এমনই হওয়ার কথা। কারণ দু’দলের মধ্যে সংলাপের কথা বলা হলেও বাস্তবে দুটো দলই দু’মেরুতে অবস্থান করছে। এখন কীভাবে এরা এক বিন্দুতে পৌঁছুবে এটা একটা প্রশ্ন বটে। কোন দল নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থানের প্রশ্নে কতটা ছাড় দেবে সেটা দেখার বিষয়।

তবে এরা যদি রাজনৈতিক প্রশ্নে আপোষ করতে না পারে তাহলে দেশ আবার সেই সংঘাত-সংঘর্ষের দিকে চলে যাবে। হরতাল-বিক্ষোভের পরিণতিতে দরিদ্র মানুষের দুর্ভোগ বাড়বে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হবে। আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। আর নিরীহ-ক্ষমতাহীন মানুষ দুর্বৃত্তায়নের শিকার হবেন।

তাই ২০১৩ সালে আমরা প্রবেশ করছি খুবই উদ্বেগের সঙ্গে। রাজনৈতিক দলগুলো যদি বিষযটি না বোঝেন তাহলে সমস্যা। তাদের মধ্যে শুভবুদ্ধির উদয় হোক এটাই আমরা চাইব। কারণ মনে রাখতে হবে যে, আমাদের দেশের সমস্যা শাসনতান্ত্রিক বা আইনগত নয়, সম্পূর্ণ রাজনৈতিক। এটা তৈরি করেছে দলগুলো। তাই তাদেরই সমাধান বের করতে হবে।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়ে থাকে যে, বর্তমান অবস্থায় কোনোমতেই সুপ্রিম কোর্ট প্রদত্ত রায় উপেক্ষা করে কোনো ধরনের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন করা সম্ভব নয়। এ প্রেক্ষিতে কোনোরকম উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে নয়- দেশের এই সংকটের কথা ভেবেই- আমি সমাধানের পথনির্দেশ করে চারটি সম্ভাব্য উপায়ের কথা বলেছিলাম। এ প্রসঙ্গে উপায়গুলো একটু ব্যাখ্যা করছি।

আমার প্রথম প্রস্তাবটি ছিল, সংবিধান সংশোধন না করেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। বর্তমান সংসদের সদস্যদের নিয়েই সে সরকার গঠিত হবে। তবে শর্ত থাকবে যে, আওয়ামী লীগ থেকে প্রধানমন্ত্রীসহ যে পাঁচজনকে মন্ত্রী নির্বাচন করা হবে তাদের বেছে নেবে বিরোধী দল । আর বিরোধী দলের পাঁচজনকে বেছে নেবেন সরকারি দলের সদস্যরা। আমি মনে করি, বর্তমান সংসদে অবশ্যই এমন ব্যক্তিত্ব রয়েছেন যারা সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কাজে অবদান রাখতে পারেন। তবে তাদের দু’দলের কাছেই গ্রহণযোগ্যতা থাকতে হবে। তাই এক দলের লোকেরা অন্যদের বেছে নিলে এ সরকার সবার কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাবে। এটা এমন একটি উপায় যেটি সংবিধানের মধ্যে থেকেই করা সম্ভব। এজন্য কোনো আইনও বদলাতে হবে না। শুধু দু’দলের অনানুষ্ঠানিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই এটা করা সম্ভব।

আমি দ্বিতীয় যে উপায়টির কথা বলেছি তা হল, তত্ত্বাবধায়ক সরকার হবে একটি নির্বাচিত সরকার। এজন্য আমার ফর্মূলা হল, সংবিধানে একটি বিধান করা হবে যে, নির্বাচন পরিচালনার জন্য তিন মাসের জন্য একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার থাকবে। সে সরকারে দশজন সদস্য থাকবেন। এরা নির্বাচিত হবেন সংসদ কর্তৃক। এজন্য বিরোধী দল দশজন নিরপেক্ষ ব্যক্তিকে এবং সরকারি দল আরও দশজনকে মনোনীত করবে। নিরপেক্ষতার সংজ্ঞা আদালত নির্ধারণ করবে। আর নির্বাচন কমিশন এটা যাচাই-বাছাই করবে। এরপর সংসদ প্রতি দলের মনোনীত দশজনের মধ্য থেকে পাঁচজনকে নির্বাচন করবে। নির্বাচন কমিশনই এ নির্বাচন পরিচালনা করবেন। এটা করা হলে আদালতে যে শর্ত দিয়েছে তা সম্পূর্ণভাবে পালন করে সংবিধান অনুসারে নির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা সম্ভব।

তৃতীয় ব্যবস্থাটি হল, বিএনপি যেটি বলছে যে, আদালতের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা তুলে দেওয়া হয়নি, বলা হয়েছে যে, আগামী দুটো নির্বাচনও এ ব্যবস্থার অধীনে করা সম্ভব- সেটি নিয়ে ভাবা। এ সম্পর্কে খসড়া চূড়ান্ত করে সংবিধান অনুসরণ করে রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের মতামত নিয়ে যদি সংবিধান চূড়ান্ত করা হয়, তাহলেও কোনো আইনগত প্রশ্ন থাকবে না। সুতরাং সেক্ষেত্রে দু’পক্ষ পরস্পরের সঙ্গে আলোচনা করে খসড়া চূড়ান্ত করে এ সম্পর্কে সুপ্রিম কোর্টের মতামত নিতে পারে।

আমি চতুর্থ যে প্রস্তাবের কথা বলেছি তা হল, এ তিন পথের কোনোটির মাধ্যমে সমাধান না হলে এর সমাধানের জন্য রাজপথ বেছে নেয়া ঠিক হবে না। এক্ষেত্রে যেটা সভ্য রীতি তা হল, এ ধরনের বড় প্রশ্নে মতৈক্য না হলে গণভোটে যেতে হবে। এখন কথা হচ্ছে কোন প্রস্তাবটি গণভোটে যাবে। যেহেতু বিএনপি এ নিয়ে আন্দোলন করছে তাই তারা এ বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব চূড়ান্ত করবে। সে প্রস্তাব গণভোটে যাবে। জনগণ যদি গণভোটের মাধ্যমে প্রস্তাবের পক্ষে রায় দেয় তবে সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধনী এনে তা কার্যকর করা সরকারের দায়িত্ব হবে।

আমি মনে করি, এ্ চার ফর্মুলাই যথেষ্ট নয়। সংশ্লিষ্ট ও অভিজ্ঞরা আরও কিছু উপায় নিযে কথা বলতে পারেন। আমার কথা ছিল একটিই, আজ যে বিষয় নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংঘাত ও ঝগড়া চলছে তা দূর করা। আর এজন্য বিদ্যমান আইনের মধ্যে থেকেই সংকট থেকে উত্তরণের পথ বের করা।

আমার মনে হয়েছে, আমার এসব ফর্মূলার মতো আরও অন্যান্য ফর্মূলার মাধ্যমে সবা্র কাছে গ্রহণযোগ্য সমাধান সম্ভব। তবে এটা আমি মানতে রাজি নই যে, আইন ও সংবিধান অনুসারে কিছু করা সম্ভব নয়। আইন ও সংবিধান মানুষের জন্য, মানুষ আইন ও সংবিধানের জন্য নয়। তাই আইন ও সংবিধান কোনো সমস্যা নয়। সমস্যা রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা। এটা থাকলে সমাধান সহজ হয়ে যাবে। আর দলগুলো যদি কোন ফর্মূলায় হালুয়া-রুটির ভাগ বেশি পাওয়া যাবে তা নিয়ে ভাবেন তাহলে সংকটের সমাধান হবে না।

আমি কোনো রাজনৈতিক অভিলাষ বা মতলব ছিল বলেই যে এসব বলি তা নয়। আমি বাংলাদেশের সুশাসন নিয়ে অনেক গবেষণা করেছি, এ নিয়ে আমার বই এবং নিবন্ধ আছে- তাই আমি আমার গবেষণালব্ধ জ্ঞান বা ধারণা থেকে এসব বলছি। এখন কথা হল, রাজনৈতিক দলগুলো আমার এসব ফর্মূলা বা পরামর্শ গ্রহণ করতে চাইলে করতে পারে আবার না-ও পারে। তারা চাইলে আরও অন্য কোনো উপায় নিযে ভাবতে পারে। তবে আমি একটি বিষয় সবসময় স্পষ্ট করতে চাই যে, ব্যক্তি হিসেবে আমার কোনো ধরনের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই, অভিলাষ নেই।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আমি কখনও-ই জড়িত ছিলাম না। কোনো পদের জন্য আমি লালায়িত নই। ভবিষ্যতের কোনো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সঙ্গেও আমি কখনও জড়িত হব না। তাই আমার ব্যক্তিগত কোনো লাভ-লোকসানের হিসেব এখানে নেই। বাংলাদেশের রাজনীতিতে আমার যে কোনো অবদান নেই এ নিয়েও আমার মনে কোনো দুঃখ নেই। আমি বরং মনে করি, রাজনীতিবিদরা এ সমস্যা তৈরি করেছেন। তাই এটা তাদেরই দায়িত্ব ও কর্তব্য যে তারা নিজেরা এর সমাধান করবেন।

আমাদের মনে রাখতে হবে যে, গণতন্ত্র শুধু একটি নির্বাচন নয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে হলে মূল্যবোধ থাকতে হবে, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা থাকতে হবে। তাহলেই সব ধরনের রাজনৈতিক সংকট মোকাবেলা করা সম্ভব।

আকবর আলি খান: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং ২০০৬ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

The Weeklydesh newspaper