আর কত স্বচ্ছ হলে তাকে স্বচ্ছ বলব?

w

একাত্তরে ওরা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে নিরীহ, নিরস্ত্র বাঙালিদের হত্যা করেছে। আমাদের সেরা বুদ্ধিজীবীদের বাড়ি বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে হাত-পা বেঁধে নির্মম নির্যাতন করে মেরেছে। গণহত্যায় তাদের কোনো লুকোচুরি ছিল না। প্রকাশ্যে বুক ফুলিয়ে, মাইকে ঘোষণা দিয়ে তারা মানুষ হত্যা করেছে। হাত-চোখ বেঁধে খাদের কিনারে নিয়ে সারি বেঁধে দাঁড় করিয়ে গুলি করে শত শত মানুষ মেরে তারা পৈশাচিক উল্লাসে মেতে উঠেছে। তাদের এই গণহত্যা এতই স্বচ্ছ ছিল যে এ নিয়ে কারও কোনো দ্বিধা-দ্বন্দ্ব নেই। সবাই জানে, সবাই বোঝে। কে কাকে মেরেছিল, কীভাবে মেরেছিল, কেন মেরেছিল—সবাই সব জানে। সবকিছু চোখের সামনে ঘটেছে। তাই একাত্তরের গণহত্যা নিয়ে কারও কোনো সন্দেহ থাকার কথা নয়।
শুধু একদল লোক, তারা সংখ্যায় খুব কম, কিন্তু গলায় জোর আছে; তারা বলছে, ওদের বিচার হতে হবে খুব স্বচ্ছ। আরে বাবা, যে গণহত্যা ছিল পানির মতো স্বচ্ছ, তার বিচার কি অস্বচ্ছভাবে করা সম্ভব? গণহত্যাকারী কাউকে কি ইচ্ছা করলেই কেউ সাধু বলে রায় দিতে পারবে? দেশের মানুষ কি সব কানা? তারা কি দেখেনি একাত্তরে কী হয়েছে, কারা কী করেছে? যে দেশের প্রায় প্রতিটি পরিবারে অন্তত এক-দুজন শহীদ, সে দেশে কি গণহত্যা নিয়ে বিচার অস্বচ্ছভাবে হতে পারে?
কিন্তু তাও একদল লোক দুই-এক দিন পর পর চেঁচামেচি শুরু করে। বলে, গেল গেল, সব গেল, বিচার অস্বচ্ছ হয়ে গেল। মুক্তিযুদ্ধকালের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যানের পদ থেকে বিচারপতি নিজামুল হক পদত্যাগ করলে ওরা সমস্বরে বলতে শুরু করে যে পুরো বিচার কার্যক্রমই নাকি ভন্ডুল হয়ে গেছে। তাই তাদের দাবি, বিচার প্রথম থেকে শুরু করতে হবে। এরা কী ভাবে? এক বিচার শুরু হতেই লেগেছে ৪০ বছর। তারপর আবার নানা ছুতায় বিচার বিলম্বিত করতে দেওয়া হবে?
আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩-এর ৬(৬) ধারায় বলা আছে, শুধু ট্রাইব্যুনালের সদস্যদের পরিবর্তন বা সে অবস্থায় কোনো সদস্যের কোনো বৈঠকে অনুপস্থিতির কারণে কোনো সাক্ষীর সাক্ষ্য আবার শুনানি করতে ট্রাইব্যুনাল বাধ্য নন এবং প্রদত্ত সাক্ষ্যের ভিত্তিতে কার্যক্রম গ্রহণ করতে পারেন। প্রথম থেকে শুরু করার কথা কোথাও নেই। তাহলে ওই অদ্ভুত দাবি ওরা করছে কিসের ভিত্তিতে?
ট্রাইব্যুনাল শুরুর সময় ওরা অনেক বিষয়ে আপত্তি তুলেছিল। বলেছিল আপিলের সুযোগ নেই, তাই আন্তর্জাতিক মানের বিচার পাওয়া যাবে না। তাদের দাবি মেনে নিয়ে আপিলের বিধান করা হলো। এরপর দাবি উঠল, সাক্ষীদের সুরক্ষার বিধান নেই। সেটাও করা হলো। আলোচ্য ৬(৬) ধারার ব্যাপারে কিন্তু ওরা কখনো কোনো আপত্তি করেনি। কখনো তো ওদের কেউ বলেনি যে বিচারপতি পদত্যাগ করলে বিচার প্রথম থেকে শুরু করার বিধান রাখতে হবে, না হলে বিচার শুদ্ধ হবে না! কেন বলেনি? কারণ, সে রকম দাবি হাস্যকর। সব বিচারের ক্ষেত্রেই বলা আছে, বিচারকের বদলি বা পরিবর্তনের কারণে কোনো বিচার থেমে থাকবে না, যেখানে স্থগিত, সেখান থেকেই শুরু। এটা সর্বজনীন বিধি।
এখন বিভিন্ন ছুতায় ওরা বিচার বাধাগ্রস্ত করতে চায়। আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩-এর ১১(৩) ধারায় দ্রুত শুনানি করার কথা পরিষ্কার বলা হয়েছে। অযৌক্তিকভাবে বিচার বিলম্বিত করার চেষ্টা বন্ধের ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও বলা হয়েছে। একাত্তরের গণহত্যাকারীদের দোসররা কোনো বিধিই মানতে চায় না। শুধু চায় বিচার বিলম্বিত করতে। এটা আইনের বিরুদ্ধে একটি অপচেষ্টা।
মনে পড়ে একাত্তরের সেই রণাঙ্গনের দিনগুলোর কথা। ডিসেম্বরের শুরুতেই এটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দিন শেষ। আমাদের ক্যাম্প ছিল পশ্চিম দিনাজপুরের পাটনে। সীমান্তের কোলঘেঁষে। প্রতিদিন আমাদের মুক্তিবাহিনী, গেরিলা বাহিনী ও মিত্রবাহিনী এগিয়ে যাচ্ছে। দখলদার পাকিস্তানি বাহিনী পিছু হটছে। এটা ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহের কথা। ন্যাপ-সিপিবি-ছাত্র ইউনিয়নের বিশেষ গেরিলা বাহিনীর একটি ক্যাম্প পরিচালনার দায়িত্বে ছিলাম আমি। ১৫ ডিসেম্বর কলকাতা হেডকোয়ার্টার্স থেকে খবর এল, ক্যাম্প গুটিয়ে যেন সবাই দেশের ভেতর ঢুকে পড়ি। পাটন গ্রামে সেদিন বিজয়ের উৎসব। আমাদের তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের কয়েকজন প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ঢুকে গেছে, অপারেশনের জন্য। যারা তখনো গেরিলা প্রশিক্ষণে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তারা অস্ত্রবিহীন অবস্থায়ই সীমান্ত অতিক্রম করে দেশে ঢুকে পড়ল। তখন সীমান্তের ভেতর অন্তত ১৫ মাইল পর্যন্ত স্বাধীন, মুক্তাঞ্চল। ষোলোই ডিসেম্বরের আগেই দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ স্বাধীন হয়ে গেছে।
আমাদের বিশেষ গেরিলা বাহিনীর মূল নেতাদের সঙ্গে আমি যখন আগরতলা সীমান্ত দিয়ে কুমিল্লায় ঢুকি, তখন একদিকে আমাদের চোখ-মুখে আনন্দ, আরেক দিকে উদ্বেগ, সংশয়। আমাদের বাসার ভাইবোনেরা সবাই বেঁচে আছে তো? মা? ক্রমে ক্রমে জানতে পারি, আমাদের আত্মীয়স্বজন, পরিচিতজনদের অনেককে আলবদর বাহিনী কারফিউর মধ্যে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে হত্যা করেছে। হত্যা করেছে অনেক বুদ্ধিজীবীকে।
ঢাকায় ফেরার পথে পথে দেখেছি হত্যা আর ধ্বংসলীলা। বিজয়কে আনন্দ-উচ্ছ্বাসে বরণ করার মতো মনের অবস্থা কারোরই ছিল না। স্বজনহারা মানুষ কার কাছে সান্ত্বনা চাইবে? সে সময় আমার মনে একটা কথাই বাজছিল। একটা অবিশ্বাস্য হিসাব। যখন মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার জন্য ২৭ মার্চ আমরা একদল তরুণ ঢাকা ছেড়ে আগরতলার পথে রওনা দিয়েছিলাম, তখন বাংলাদেশে (পূর্ব বাংলা) ছিল সাড়ে সাত কোটি বাঙালি। আর মাত্র নয় মাস পর যখন স্বাধীন দেশে বিজয়ীর বেশে ঢুকছি, তখন দেশে আছে মাত্র ছয় কোটি লোক! বাকি দেড় কোটির মধ্যে প্রায় এক কোটি প্রাণে বাঁচার জন্য প্রতিবেশী দেশ ভারতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছে। ৩০ লাখ বাঙালি শহীদ। তাঁদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। আরও ২০-২৫ লাখ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গেছে। অগণিত মানুষ অভুক্ত থেকে, অসুখে-বিসুখে, আশ্রয়চ্যুত হয়ে প্রাণ দিয়েছে। নির্যাতিত হয়েছেন দুই লাখ মা-বোন। মাত্র নয় মাসে দেড় কোটি মানুষ নেই। শরণার্থীরা ছিল। কিন্তু তারা ছিল জীবন্মৃত।
একটা জাতিকে নিশ্চিহ্ন করার অশুভ ষড়যন্ত্রে একাত্তরে যারা মেতে উঠেছিল, নির্বিচারে গণহত্যা চালিয়েছিল, তারা আজ বিচারের কাঠগড়ায়। একসময় ওরা ভেবেছিল, তাদের আবার কিসের বিচার। ওরা সব ধরাছোঁয়ার বাইরে নিজেদের স্থাপন করে একধরনের আত্মতৃপ্তিতে ভুগছিল। কিন্তু আজ তারা বিচারের সম্মুখীন। এখন তাদের দোসররা বলছে, বিচার স্বচ্ছ হতে হবে। আসলে তাদের বিবেচনায়, বিচার করতে চাওয়াটাই অস্বচ্ছ ব্যাপার! তারা ভাবে, মেরেছি তো মেরেছি, আবার বিচার কিসের! এরা সাক্ষীকে মোবাইলে হুমকি দেয়, বিচারকদের প্রাণনাশের হুমকি দেয়। তারপর আবার বলে, বিচার স্বচ্ছ হতে হবে!
এবার ষোলোই ডিসেম্বর সারা দেশে মানুষের ঢল নামে। পুরো দেশ বিজয়োৎসবে মেতে ওঠে। উৎসব শুরু হয়ে যায় ১৫ ডিসেম্বর মধ্যরাত থেকেই। প্রথম আলোর দিরাই (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি জানিয়েছেন, শনিবার রাত সাড়ে ১১টায় পৌষের কনকনে শীত ও ঘন কুয়াশার মধ্যে হাজারো নারী-পুরুষের ঢল নামে তাঁদের শহীদ মিনারে। বরাবরের মতো রাজিয়া বেগম ফুল দিতে এসেছেন স্মৃতিসৌধে। তিনি বলেন, ‘আরও কতবার রাইতকালা ফুল দিছি। ইবারের লাখান অত মানুষ কোনো দিন দেখছি না। দিন দিন মানুষ বুঝতাছইন।’ দিন দিন মানুষ বুঝছে। কী বুঝছে? বুঝছে যে একদল মানুষ বিচার বাধাগ্রস্ত করতে উঠেপড়ে লেগেছে। তাই এবারের বিজয় দিবসে মানুষের ঢল আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।
ঢাকায় দেখেছি, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত রাজপথে মানুষ আর মানুষ। শহীদ মিনার, বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠ, টিএসসি, কার্জন হল থেকে শুরু করে সারা ঢাকা শহর। যেখানে গেছি, সেখানেই তরুণদের ভিড়। এসেছে পরিবারের সবাই। মতিঝিল-দিলকুশা এলাকায় বসে গেছে অঘোষিত বিজয় মেলা। মা-বাবা, ছেলেমেয়ে, সবাই এসেছেন বিজয়ের আনন্দ ভাগ করে নিতে। তাঁদের সবার মুখে এক কথা—যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হোক, দ্রুত হোক। আগেও এ কথা সবাই বলেছে, কিন্তু এবার সরবে, সোচ্চার হয়েছে সবাই।
কেন এবার এত বেশি মানুষ বিজয়ের উৎসবে সক্রিয় অংশ নিয়েছে? এ ব্যাপারে আমার মনে পড়ে, ১৯৬৯ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির পূর্বক্ষণের কথা। সামরিক স্বৈরাচার আইয়ুবের বিদায়ঘণ্টা বেজে গেছে। কিন্তু তাও সে মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ওরা ঢাকায় কারফিউ দিল। একুশের প্রভাতফেরি করতে দেবে না। ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ ঘোষণা দিল, ২০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে মশাল মিছিল বের হবে। নাগরিকদের প্রতি আমরা আহ্বান জানালাম, প্রত্যেকে যেন একটা করে মশাল নিজেরা বানিয়ে হাতে করে নিয়ে আসেন। আমরা কারফিউ মানব না, ঘোষণা দিলাম। এবং সেই সন্ধ্যার আগেই ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে দলে দলে মানুষ মশাল হাতে আসতে শুরু করল। ভেসে গেল কারফিউ। অবশ্য অবস্থা টের পেয়ে সন্ধ্যার আগেই সরকার কারফিউ তুলে নেওয়ার ঘোষণা দেয়। উনসত্তরের একুশের পূর্বক্ষণের সন্ধ্যার সেই মশাল মিছিল ছিল স্মরণকালের সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে উদ্দীপ্ত মিছিল।
বাধা দিলে বাঙালি গর্জে ওঠে, এটা বাঙালির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আজ যদি কেউ স্বচ্ছতার নামে, নিরপেক্ষতার নামে যুদ্ধাপরাধের বিচার বাধাগ্রস্ত করতে চায়, বাঙালি গর্জে উঠবে। এবারের ষোলোই ডিসেম্বর বিজয়োৎসবে রাজপথে মানুষের ঢল তারই ইঙ্গিত দিয়ে গেল।
আব্দুল কাইয়ুম: সাংবাদিক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

The Weeklydesh newspaper