মুক্তিযোদ্ধার বাঁচার লড়াই

d

দেশমাতৃকার জন্য যাঁরা যুদ্ধে নেমেছিলেন তাঁদের অনেকেই আজ লড়ছেন দুবেলা দুমুঠো খাবারের জন্য। দেশ স্বাধীন করার জন্য অস্ত্রহাতে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার চান্দেরকান্দী গ্রামের সামসুল হক দারু মিয়া। শত্রুর মোকাবিলা করে ছিনিয়ে এনেছেন স্বাধীনতা। বিজয়ের ৪১ বছরে অনেক এগিয়েছে দেশ ও দেশের মানুষ। কিন্তু থমকে আছে মুক্তিযোদ্ধা দারু মিয়ার জীবন। দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত হলেও হারাননি মনোবল। তিনি স্বপ্ন দেখেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ একদিন সুখী-সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াবে।

রায়পুরা সদর থেকে চান্দেরকান্দী সড়ক ধরে এগোলে সড়কের পাশেই পড়ে চান্দেরকান্দী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয়ের সামনে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধা দারু মিয়ার বাড়ির হদিস জানতে চাইলে স্থানীয় লোকজন বাড়িটি দেখিয়ে দেয়। বাড়িতে কেউ আছেন কি না জানতে চাইলে বেরিয়ে আসেন পঞ্চাশোর্ধ্ব এক নারী। তিনি দারু মিয়ার স্ত্রী দিললুবা ফজিলা। দারু মিয়া কোথায় জানতে চাইলে ফজিলা বলেন, ‘উনি বন্দের (মাঠের) ক্ষেতে কাজ করছেন।’ দারু মিয়ার সঙ্গে কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করলে ফজিলা বলেন ‘আরেকজনের ক্ষেতে কামলাগিরি করে। চাইলেই কি ইচ্ছামতো আওন যায়? আপনি বহেন, দেহি বলে আনতারি (আনতে পারি) কি না।’ এই বলে স্বামীকে ডাকতে বেরিয়ে পড়েন ফজিলা।
সড়ক ঘেঁষে একটি ভাঙা টিনের ঘর। দরজা-জানালাও ভাঙা। ঘরের ভেতর একটি চৌকি। কিছুক্ষণ পর এলেন ষাটোর্ধ্ব শীর্ণকায় দারু মিয়া। কথায় কথায় জানালেন, তিন মেয়ে ও এক ছেলের জনক তিনি। সঙ্গে আছে বড় ভাইয়ের অনাথ ছেলে মনিরুজ্জামান সেলিম। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর গোলায় আহত হয়েছিলেন দারু মিয়া। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সেনাবাহিনীতে সৈনিক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। ১৯৮০ সালে মেডিক্যাল পেনশনে আসেন। এর পরই আর্থিক সংকটে পড়েন তিনি। অর্থাভাবে সন্তানদের পড়াশোনা করাতে পারেননি। একমাত্র ছেলে হুমায়ুন কবির টাকার অভাবে এসএসসি পরীক্ষা দিতে পারেননি। এখন তিনি রিকশা চালান।
দারু মিয়া জানান, নিজের জমি নেই। তাই বোনের জমিতে একটি ঘর বেঁধে দিন কাটাচ্ছেন। অনেক চেষ্টা করেছেন একটি সরকারি অফিসে চাকরি নেওয়ার জন্য। কিন্তু কেউ চাকরি দেয়নি। ছেলের আয় দিয়ে সংসার চলে না। তাই বৃদ্ধ বয়সেও দিনমজুরি করতে হয় দারু মিয়াকে। কখনো কখনো রাজমিস্ত্রির জোগালি হিসেবেও কাজ করেন। স্ত্রী ফজিলাও অন্যের বাড়িতে কাজ করেন।
ছেলে হুমায়ুন কবির বলেন, ‘বাবা মুক্তিযুদ্ধের গল্প কয়, আর চোখ দিয়া পানি ফালায়। যুদ্ধ করার সময় পাকিস্তানি বাহিনীর গোলায় আহত হইয়্যাও যুদ্ধাহত ভাতা পায় না। এই ভাতা করাতে নাকি টেহা খরচ করতে হইবো। দেশ স্বাধীন করার জন্য যুদ্ধে গিয়া আহত হইয়া যদি ভাতা পাইতে ঘুষ দিতে হয়, এর চেয়ে দুঃখের কী হইতে পারে?’
মুক্তিযোদ্ধা দারু মিয়া বলেন, ‘নিজের লাইগ্যা না, পোলা-মাইয়্যার কষ্ট দেইখ্যা আমার দুঃখ লাগে। আমি এমন এক বাবা যে টেহার লাইগ্যা পোলা-মাইয়্যাগো লেহাপড়া শিখাইতে পারি নাই, দুই মুঠো খাওনের লাইগ্যা ছোড থাকত্যেই আরেক লোকের ঘানি টানতে হইছে। এইডা আমার ব্যর্থতা। পোলাডা অন্যের রিকশা ভাড়ায় চালায়। তারে যদি একটা ইজি বাইক কিইন্যা দিইয়্যা মরতে পারতাম তাইলে শান্তি পাইতাম।’ তিনি বলেন, ‘আগে বিজয় দিবসে জাতীয় প্যারেডে অংশ নিতাম। এহন উপজেলার প্যারেডে অংশ নিই। মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে এইডাই বড় পাওয়া।’
১৯৭১ সালে দারু মিয়া ছিলেন সিরাজনগর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র। ২৭ মার্চ মায়ের নতুন শাড়ি ও নাকের ফুল চুরি করে বাজারে বিক্রি করে দেন। শাড়িটি ১১ টাকা আর সোনার নাকফুলটি ৩৫ টাকায় বিক্রি করে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন দারু মিয়া। তিনি ভারতের লেবুছড়ায় ট্রেনিং শেষে রায়পুরার মণিপুরার গ্রুপ কমান্ডার গোপাল চন্দ্র সাহার নেতৃত্বে যুদ্ধে অংশ নেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে শত্রু বাহিনীর ছোড়া গোলায় তিনি আহত হন। ওই যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল প্রতিরোধের মুখে পাকিস্তানি বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়। এ ছাড়া তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও নরসিংদীর একাধিক যুদ্ধে অংশ নেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

The Weeklydesh newspaper