টাঙ্গাইল-৩ উপনির্বাচন: আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে খান পরিবারের লড়াই

e

টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) আসনের উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে লড়াইয়ে নেমেছে এখানকার আওয়ামী রাজনীতির কথিত একক নিয়ন্ত্রক খান পরিবার। ১৮ নভেম্বর এখানে ভোট গ্রহণ।
এলাকাবাসীর ধারণা, মাঠ দখলের লড়াইয়ে এখনো এগিয়ে আছেন খান পরিবারের সদস্য আমানুর রহমান খান (রানা)। সরকারি দল আওয়ামী লীগ-মনোনীত প্রার্থী শহিদুল ইসলাম (লেবু) অবশ্য এ কথা মানতে নারাজ। তাঁর মতে, পেশিশক্তি ও অবৈধ টাকার জোরে খান পরিবার মাঠ দখল করে রেখেছে। তবে আমানুর রহমানের অভিযোগ, শহিদুল ইসলামের পক্ষে প্রশাসনের পক্ষপাতমূলক আচরণের কারণে তাঁর কর্মী-সমর্থকেরা বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন।
নির্বাচনে মহাজোটের অন্যতম শরিক জাতীয় পার্টির প্রার্থী সৈয়দ আবু ইউসুফ আবদুল্লাহ (তুহিন) মনে করছেন, আওয়ামী লীগের পরস্পরবিরোধী দুই প্রার্থীর মাঠ দখলের লড়াই তাঁর বিজয়ের পথ সুগম করবে। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ পর পর দুই দিন প্রচারণা চালিয়ে গেছেন তাঁর পক্ষে।
খান পরিবারের একাধিপত্য: আমানুরের চাচা শামসুর রহমান খান (শাহজাহান) বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে রাজনীতিতে এসেছিলেন। সত্তরের ঐতিহাসিক নির্বাচনে প্রথমবারের মতো তিনি এই এলাকা থেকে সাংসদ হয়েছিলেন। ১৯৭৩ ও ’৮৬ সালেও তিনি নির্বাচিত হন। পরে ’৯১, ’৯৬ ও ২০০১ সালে নির্বাচন করে তাঁরই চাচাতো ভাই বিএনপির সাবেক সাংসদ ও মন্ত্রী লুৎফর রহমান খানের (আজাদ) কাছে পরাজিত হন। সর্বশেষ ২০০৮ সালে শামসুর রহমান খানের পরিবর্তে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয় বিশিষ্ট হূদেরাগ বিশেষজ্ঞ মতিউর রহমানকে। মতিউর এক লাখ ৪০ হাজার ৬৮২ ভোট পেয়ে সাংসদ নির্বাচিত হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী লুৎফর রহমান পেয়েছিলেন ৮৩ হাজার ৭৬ ভোট।
চাচা শামসুর রহমান খান মনোনয়নবঞ্চিত হওয়ার পর থেকে আমানুর এ আসন থেকে মনোনয়ন পেতে কাজ করে আসছিলেন। গত ১৩ সেপ্টেম্বর সাংসদ মতিউর মারা গেলে আসনটি শূন্য হয়। খান পরিবার আশা করেছিল, উপনির্বাচনে আমানুরের মনোনয়ন কেউ ঠেকাতে পারবে না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমানুরকে মনোনয়ন না দিয়ে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ মনোনয়ন দেয় প্রয়াত সাংসদ মতিউরের একান্ত স্নেহভাজন শহিদুল ইসলামকে। বিষয়টি মেনে নিতে পারেনি খান পরিবার।
এই পরিবারের বড় ছেলে আমিনুর রহমান খান (বাপ্পি) খুন হয়েছেন রাজনীতির কারণে, ২০০৩ সালের নভেম্বরে। তাঁদের দাবি, কাদের সিদ্দিকী যখন আওয়ামী রাজনীতি ছেড়ে নতুন দল কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ গঠন করেন, তখন খান পরিবারের ছেলেরাই সিদ্দিকী পরিবারের বিপরীতে আওয়ামী লীগের অস্তিত্ব রক্ষায় মুখ্য ভূমিকা রেখেছিলেন। অবশ্য বিনিময়ে পেয়েছেনও অনেক। তাঁদেরই এক ছেলে শহিদুর রহমান খান (মুক্তি) আওয়ামী লীগের সমর্থন নিয়ে টাঙ্গাইল পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। অবশ্য দল ক্ষমতায় আসার আগে থাকতেই শহিদুর টাঙ্গাইল শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নেন। আমানুরও হয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ট্রাক মালিক সমিতির সভাপতি হন আমানুর রহমান। মিনিবাস মালিক সমিতির সভাপতি হন তাঁদের আরেক ভাই জাহিদুর রহমান খান (কাঁকন)। এ ছাড়া জাহিদুর জেলা চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি ও জেলা ব্যবসায়ী ঐক্যজোটের সভাপতি।
তাঁদের বাবা খান পরিবারের কর্ণধার সোনালী ব্যাংকের সাবেক উপমহাব্যবস্থাপক আতাউর রহমান খান চাকরিজীবন শেষে জেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সদস্য হন। শিল্পকলা একাডেমী, ক্রীড়া সংস্থা, রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, শ্রমিক ফেডারেশনসহ বিভিন্ন সামাজিক-পেশাজীবী-শ্রমজীবী সংগঠনের নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় আছেন এই পরিবারের সদস্য অথবা তাঁদের মনোনীত ব্যক্তিরা। বলা হয়, এভাবেই সমগ্র টাঙ্গাইল জেলায় পরিবারটি একাধিপতি হয়ে উঠেছে।
অবশ্য খান পরিবারের কনিষ্ঠ সন্তান সানিয়াত খান (বাপ্পা) পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে মন্তব্য করেন। তাঁর মতে, দলীয় নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ করে বিভিন্ন সংস্থায় প্রতিনিধি করা হয়েছে। এসব দায়িত্বে কোনো ‘মাজাভাঙা’ নেতাকে পাঠানো হলে তিনি তো আর জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণ করতে পারবেন না। সানিয়াত জানান, তিনি নিজে জেলা ক্রীড়া সংস্থার সহসাধারণ সম্পাদক। এ দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা তাঁর আছে।
প্রশ্নবিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রার্থী: ঘাটাইল উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধেও রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। বিশেষ করে কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা), কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা), টেস্ট রিলিফসহ (টিআর) বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ দিতে কমিশন আদায়ের ব্যাপক অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে। সাংসদ মতিউর ঢাকায় থাকতেন বলে এসব ছিল শহিদুলের এখতিয়ারে। এ কারণে বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব তৈরি হয়। তাঁরা বিভিন্ন সময় দলের জেলা ও কেন্দ্রকে শহিদুল ইসলামের দুর্নীতি সম্পর্কে অবহিত করেছিলেন বলে জানান।
আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী আমানুর রহমান খানের সমর্থকদের একজন লোকেরপাড়া ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি মোহাম্মদ জাকারিয়া খান আক্ষেপ করে বলেন, ‘আসলে দলের মধ্যেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। দলে যদি গণতন্ত্র থাকত, তাহলে দলীয় প্রার্থী মনোনয়নে আমাদের ভূমিকাই প্রধান হতো। আর আমাদের মতো তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সমর্থন নেওয়া হলে কোনোভাবেই শহিদুলের মতো লোক মনোনয়ন পেতেন না।’
শহিদুল তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোকে আমানুরের কর্মী-সমর্থকদের ‘বানানো বুলি’ বলে আখ্যায়িত করেন। তাঁর মতে, আওয়ামী লীগের উন্নয়নের রাজনীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য এসব অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
গ্রেপ্তার ও বহিরাগত আতঙ্ক: আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী আমানুর রহমান খানের অভিযোগ, প্রায় প্রতি রাতে তাঁর কর্মী-সমর্থকদের হয়রানি করছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। এরই মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে সাতজনকে। অনেকের বাড়িতে পুলিশ তল্লাশি চালিয়েছে। সর্বশেষ গত শনিবার রাতে লোকেরপাড়া ইউনিয়নে আমানুরের নির্বাচনী অফিসে র্যা ব-পুলিশ হামলা চালায় বলে অভিযোগ করেন তিনি। শনিবার রাত ১১টায় লোকেরপাড়ায় গিয়ে আমানুরের সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক দেখা গেল। তাঁদের একজন আবদুল লতিফ লুঙ্গি তুলে দেখালেন মারধরের চিহ্ন।
জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কামাল হোসেন আমানুরের নির্বাচনী অফিসে হামলার অভিযোগ মিথ্যা বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহিনা আক্তারের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘিত হচ্ছে কি না, তা দেখতে বের হলে ওই এলাকার লোকজন রাস্তার মোড়ে ভিড় করে আদালতের কাজে বিঘ্ন সৃষ্টি করছিল। তাদের ছত্রভঙ্গ করতে গিয়ে মৃদু লাঠিপেটা করে পুলিশ।
আওয়ামী লীগের প্রার্থী শহিদুল উল্টো আমানুরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেন, আনারসের (আমানুরের প্রতীক) পক্ষে প্রতি রাতে বরিহরাগতরা অস্ত্র নিয়ে আনাগোনা করছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

The Weeklydesh newspaper