সংবাদ বিশ্লেষণ: অর্থমন্ত্রীর বিভ্রান্তিকর কথামালা

a

শ্রদ্ধেয় আবুল মাল আবদুল মুহিত শুধু সরকারের অর্থমন্ত্রী নন, আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে দেশের একজন প্রাজ্ঞ ও বিদগ্ধজনও বটে। তবে সর্বসাধারণের কাছে এখন তাঁর প্রধান খ্যাতি-পরিচিতি অর্থমন্ত্রী হিসেবেই।
তাঁর পূর্বসূরিদের মতো অর্থমন্ত্রী হিসেবে আবুল মাল আবদুল মুহিতের বক্তব্য-বিবৃতিও দেশবাসীর কাছে সরকারের মৌলিক নীতি-নির্দেশনার সমার্থক। তাই সে কথাগুলো তাদের কাছে সামান্য হলেও আলাদা কিছু।
কিন্তু গত শনিবার ‘বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্ট (বিল্ড)’-এর বর্ষপূর্তির অনুষ্ঠানে দেওয়া তাঁর কিছু বক্তব্য এর ব্যতিক্রম। তাঁর ওই বক্তব্য জনমনে অনেক বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছে, যা দেশ, সরকার এবং তাঁর নিজের ভাবমূর্তির জন্যও ইতিবাচক নয়।
ওই অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কোম্পানি বাপেক্সকে বলেছেন একটি অকার্যকর সংস্থা। তারা নয় বছরে মাত্র ছয়টি খননকাজ করেছে। বলেছেন, বাপেক্স একটা ‘স্টুপিড’। অর্থমন্ত্রীর এ বক্তব্য ব্যাপক বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে। কারণ, দেশের সবাই এখন জানে যে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে বাপেক্স অত্যন্ত কার্যকর সংস্থায় পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে, বর্তমান সরকারের আমলে বাপেক্সের সাফল্য ঈর্ষা করার মতো।
অর্থমন্ত্রী যেসব তথ্যের ভিত্তিতে বাপেক্সকে অকার্যকর ও স্টুপিড বলেছেন, তার একটিও সঠিক নয়। অর্থমন্ত্রীর সদয় অবগতির জন্য বাপেক্সের কিছু অর্জন উল্লেখ করছি। শুধু বর্তমান সরকারের আমলে বাপেক্স ১৪টি গ্যাসকূপের সংস্কার (ওয়ার্কওভার) করেছে। একেকটি ওয়ার্কওভার একেকটি নতুন কূপ খননের চেয়ে তেমন কম বা আলাদা কিছু নয়। এ সময়ে বাপেক্স নতুন কূপ খনন সম্পন্ন করেছে পাঁচটি। আরও দুটি নতুন কূপ খননের কাজ চলমান আছে। ওয়ার্কওভার ও নতুন কূপ খননের মাধ্যমে বর্তমান সরকারের আমলে বাপেক্স গ্যাসের উৎপাদন বাড়িয়েছে দৈনিক ২৮ কোটি (২৮০ মিলিয়ন) ঘনফুট।
এ সময়ে দেশ-বিদেশে বাপেক্সের সবচেয়ে আলোচিত সাফল্য ত্রিমাত্রিক ভূকম্পন জরিপের মাধ্যমে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান। স্বল্পতম সময়ে, সীমিত ব্যয়ে ছয়টি গ্যাসক্ষেত্রে পরিচালিত এ জরিপের চারটি ক্ষেত্রের ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। তাতে ক্ষেত্রগুলোতে গ্যাসের জ্ঞাত মজুদ বেড়েছে প্রায় তিন ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ)। একই সময়ে বাপেক্স প্রায় এক হাজার ৩০০ লাইন কিলোমিটার এলাকায় দ্বিমাত্রিক ভূকম্পন জরিপ চালিয়েছে।
বাপেক্স এখন পর্যন্ত ছয়টি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করেছে। এর মধ্যে চারটি থেকে গ্যাস তোলা হচ্ছে। দুটি থেকে আগামী জানুয়ারির মধ্যে গ্যাস তোলা শুরু হবে। আরও একটি ক্ষেত্র সুনেত্র আবিষ্কারের জন্য বর্তমানে অনুসন্ধান কূপ খনন করা হচ্ছে। বাপেক্সের জরিপে চিহ্নিত মৌলভীবাজার গ্যাসক্ষেত্র বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। বাপেক্স আগামী পাঁচ বছরের উন্নয়ন কর্মসূচি চূড়ান্ত করে তা বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছে।
বিল্ডের অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আগামী নয় মাসের মধ্যে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। কিন্তু অধিকাংশ ব্যবসায়ীই জানেন যে তা সম্ভব নয়। নয় মাস তো সামান্য, ১৮ মাসেও সম্ভব নয়। সংশ্লিষ্ট অনেকে বলেন, ২৭ কিংবা ৩৬ মাসে করতে পারলেও ভালো।
সংশ্লিষ্ট সব পক্ষই জানে যে এলএনজি আমদানির প্রকল্পটি কয়েক মাস আগে থেকে একটি ‘মৃত প্রকল্প’। প্রায় তিন বছর চেষ্টা করেও সরকার প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পর্যায়ে আনতে পারেনি। এ প্রকল্পের অংশগুলোর (মহেশখালীতে টার্মিনাল স্থাপন, মহেশখালী থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত পাইপলাইন স্থাপন এবং বিদেশ থেকে এলএনজি আনা) একটিও দু-এক মাসের মধ্যে শুরু করার পর্যায়ে নেই। আর শুরু করার পর সব অংশ সমন্বয় করে দুই বছরের আগে প্রকল্প চালু করা অসম্ভব।
তবে এখন সরকার ভাবছে, প্রচলিত দরপত্র প্রক্রিয়া ছাড়াই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের যেকোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য যে বিশেষ আইন তারা প্রণয়ন করেছে (বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন ২০১০) তার আওতায় এলএনজি প্রকল্প বাস্তবায়ন করবেন। কিন্তু তা-ও নয় মাস বা ১৮ মাসে সম্ভব হবে না। আজও যদি কোনো কোম্পানিকে ডেকে কাজটির জন্য কার্যাদেশ দিয়ে দেওয়া হয়, তা হলেও নয়।
অর্থমন্ত্রী আবাসিক গ্রাহকদের গ্যাস না দেওয়ার ব্যক্তিগত অভিমতও ওই অনুষ্ঠানে ব্যক্ত করেছেন। সরকারও এ নীতি নিয়েই চলেছে। অর্থমন্ত্রী নিশ্চয়ই ভুলে যাননি যে ২০১০ সালের জাতীয় বাজেট ঘোষণার সময়ই তিনি আবাসিক গ্রাহকদের জন্য বিকল্প জ্বালানি হিসেবে এলপি গ্যাস সহজলভ্য করার একটি পথনকশা দিয়েছিলেন। এখন পর্যন্ত তার কিছুই বাস্তবায়িত হয়নি। যদিও সরকার নতুন গ্যাস-সংযোগ বন্ধ রেখেছে। কিন্তু মানুষ বিকল্প না পেয়ে যেকোনোভাবে গ্যাস-সংযোগ নিচ্ছে। ফলে সৃষ্টি হয়েছে এক বিরাট দুর্নীতির ক্ষেত্র।
এসব বিষয় নিয়ে জনগণকে প্রকৃত ঘটনা জানানো উচিত। বিভ্রান্তি সৃষ্টি কারও জন্য কখনো সুফল বয়ে আনতে পারে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

The Weeklydesh newspaper