ইস্টার্ন মল্লিকা শপিং কমপ্লেক্স: আড়াই কোটি টাকার কর ফাঁকি দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা

em

আট বছর আগে চালু হলেও এক টাকাও হোল্ডিং ট্যাক্স (কর) দেননি রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডের ইস্টার্ন মল্লিকা শপিং কমপ্লেক্স বিপণিবিতানের ৯০০ দোকান মালিক। ঢাকা সিটি করপোরেশন (ডিসিসি) এই দীর্ঘ সময়েও বিপণিবিতানটির হোল্ডিং ট্যাক্স নির্ধারণ করেনি।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ডিসিসির কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে বিপণিবিতানের ব্যবসায়ীরা এ পর্যন্ত প্রায় আড়াই কোটি টাকার কর ফাঁকি দিয়েছেন। কর্মকর্তারা হোল্ডিং ট্যাক্স ধার্য না করে এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র চাপা রেখে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অবৈধ আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে ডিসিসি দক্ষিণের রাজস্ব বিভাগের উপ-কর কর্মকর্তা আনিসুর রহমান ও মো. আবু মুসা খানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। রাজধানীর ড. কুদরাত-এ-খুদা সড়কে অবস্থিত প্রায় দুই লাখ ৪৩ হাজার বর্গফুটের ১০ তলা ওই বিপণিবিতান চালু হয় ২০০৫ সালে।
সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন নথি চালাচালির পর কর নির্ধারণ করার পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেও চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে তা আটকে আছে।
আট বছর পর টনক: গত মাসের প্রথম সপ্তাহে ডিসিসির দক্ষিণের প্রশাসক জিল্লার রহমান ওই বিপণিবিতানে ঝটিকা পরিদর্শনে যান। সেখানে তিনি ব্যবসায়ী ও দোকানমালিক সমিতির নেতাদের সঙ্গে আলাপ করে ঘটনার সত্যতা জানতে পারেন। পরে ডিসিসির বৈঠকে দায়ী কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে তাঁদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। একই সঙ্গে অনাদায়ী কর আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়।
গত ৯ সেপ্টেম্বর অন্য কর্মকর্তাদেরও কৈফিয়ত তলব করে ডিসিসি। কর্মকর্তাদের অফিস নোটিশে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের গাফিলতি, অবহেলা ও অসততার কারণে বিপণিবিতানটির হোল্ডিং ট্যাক্স ধার্য ও আদায় না থাকায় করপোরেশন প্রায় আড়াই কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জিল্লার রহমান বলেন, ‘কী কারণে কর্মকর্তারা কর আদায় করেননি, তা খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে। ওই সময়ে যাঁরা দায়িত্বে ছিলেন তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে।’
তদন্ত কমিটি: সিটি করপোরেশন ঘটনার তদন্তে ডিসিসি দক্ষিণের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মনিরুজ্জামানের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করে। কমিটি ২০০৫ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ওই কর অঞ্চলের দায়িত্বরত কর কর্মকর্তা, রাজস্ব কর্মকর্তা, বিপণিবিতানের দোকান মালিক সমিতির সভাপতিসহ নয়জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করে সম্প্রতি ডিসিসির দক্ষিণের প্রশাসক জিল্লার রহমানের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়, সে সময় ওই কর অঞ্চলে দায়িত্বরত সব কর্মকর্তাই নিজেরা দায়ী নন বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁরা বলেছেন, বদলি হয়ে যাওয়ার কারণে দায়িত্ব বদল হয়েছে, সে কারণে তাঁরা দায়ী নন।
সে সময় ওই অঞ্চলে দায়িত্বরত কর্মকর্তা (বর্তমানে উপপ্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা) ইউসুফ আলী সরদার জানান, তিনি ২০০৭ সালে কর কর্মকর্তা হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেন। তিনি সে সময় দায়িত্বরত উপপ্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা শহীদুল্লাহর কাছে বিপণিবিতানের হোল্ডিং ট্যাক্স ধার্য করার প্রস্তাব দেন। শহীদুল্লাহ প্রস্তাবটি অনুমোদন না করে প্রতি বর্গফুটের ওপর ৩০ টাকা কর নির্ধারণের মৌখিক নির্দেশ দেন। সে অনুযায়ী ২০০৭ সালের ২৬ এপ্রিল প্রস্তাবটি পেশের জন্য সংশ্লিষ্ট উপ-কর কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে তাঁকে সেখান থেকে উপপ্রধান রাজস্ব কর্মকর্তার অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়।
সাবেক তিন উপ-কর কর্মকর্তার একজন দেওয়ান আলীম তদন্ত কমিটিকে বলেন, তিনি নির্দোষ। ফাইলটি তাঁর কাছে দেওয়া হয়নি। অন্যজন জুনায়েদ আমিন জানান, তৎকালীন উপ-কর কর্মকর্তার মাধ্যমে ওই প্রস্তাব শহীদুল্লাহর কাছে পাঠানো হয়। এরপর তিনি বদলি হয়ে যাওয়ায় ফাইলটি উপ-কর কর্মকর্তা আনিছুর রহমানকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। আনিছুর রহমান তদন্ত কমিটিকে বলেন, তিনি বেশ কয়েকবার দোকান মালিক সমিতির কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন। কিন্তু সমিতির অসহযোগিতার কারণে কর ধার্য করতে পারেননি। পরে তিনি বদলি হয়ে যান।
ওই অঞ্চলের কর কর্মকর্তা সাইদুর রহমান জানান, সংশ্লিষ্ট উপ-কর কর্মকর্তা ইস্টার্ন মল্লিকা শপিং কমপ্লেক্সের বিষয়টি তাঁর নজরে আনেননি। রাজস্ব সুপারভাইজার আবু মুসা বলেন, এ বিষয়ে তাঁর গাফিলতি ছিল না। তিনি উপ-কর কর্মকর্তাকে বিষয়টি অনেকবার বলেছেন।
বর্তমানে (২০১২ সাল) ওই অঞ্চলে দায়িত্বরত উপ-কর কর্মকর্তা শাহ আলম তদন্ত কমিটিকে জানান, তিনি দোকান মালিক সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছেন। শিগগির কমপ্লেক্সটিকে করের আওতায় আনবেন।
তদন্ত কমিটির সুপারিশ: তদন্ত কমিটির সুপারিশে হোল্ডিং ট্যাক্স আদায়ে অবহেলার জন্য উপ-কর কর্মকর্তা আনিছুর রহমান, রাজস্ব সুপারভাইজার আবু মুসা ও কর কর্মকর্তা সাইদুর রহমানকে দায়ী করা হয়েছে। কর কর্মকর্তা হিসেবে সাইদুর রহমানও দায় এড়াতে পারেন না বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এঁদের সবার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে এবং বিভিন্ন সময়ে বিপণিবিতান এলাকায় দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের চূড়ান্ত সতর্কপত্র দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। এ ছাড়া প্রয়োজনে যৌক্তিক সময় দিয়ে বিপণিবিতান বন্ধ করে দোকান মালিকদের সব কর পরিশোধের জন্যও সুপারিশ করেছে কমিটি।
জানতে চাইলে ইস্টার্ন মল্লিকা শপিং কমপ্লেক্সের সাধারণ সম্পাদক বদরুল হোসেন মোল্লা প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের কোনো দোষ নেই। আমরা ২০১২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি করের বিষয়ে চিঠি পেয়েছি এবং চিঠি মোতাবেক কাগজপত্র জমা দিয়েছি।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

The Weeklydesh newspaper