খালেদার ভারতপন্থা!

mm

বেগম খালেদা জিয়াকে দেখে সত্যিই ভাল লাগল। চীন তিনি জয় করে এসেছেন, এখন যাচ্ছেন ভারত জয় করতে–এ কথা যখন ঘোষণা করলেন, তখন মুখে ভুবন ভোলানো হাসি। যতদিন তিনি মৌতাতে থাকবেন, ততদিন অন্তত দেশে শান্তি থাকবে। এটি যদি এক বছর কনটিনিউ করে তা’হলে অন্তত সরকার এক বছর নিজের কাজকর্ম গুছিয়ে করতে পারবে।

খালেদা জিয়ার চীন ও ভারত সফর বিএনপি-জামায়াত জোটকে অত্যন্ত আনন্দিত করে তুলেছে। জামায়াতের নেতারা ভাবছেন, মাটি কামড়ে যদি এক বছর পড়ে থাকা যায়, তা হলেই হলো। ক্ষমতায় গেলে কোথায় যাবে যুদ্ধাপরাধ মামলা আর নির্বাচন কমিশনের হুমকি। বিএনপি নেতারা না হলেও খালেদা জিয়া ভাবছেন, তার সুপুত্ররা ফিরে আসবে এবং দেশে যাতে আওয়ামী লীগ করার মতো কেউ না থাকে সে ব্যবস্থা তিনি করবেন।

বাংলাদেশকে ঘিরে রেখেছে ভারত। নানামুখী চাপ সৃষ্টি করে সরকারের পতন ত্বরান্বিত করতে পারে ভারত। এ সব তত্ত্ব হয়ত অনেকাংশে ঠিক। কিন্তু এটিই সব নয়। নির্বাচন করবে বিভিন্ন দল। মানুষ ঠিক করবে কোন্ দলকে ভোট দেবে। তারাই প্রধান নিয়ামক।

চীনের কথা বলি। চীন ১৯৭১ সালে বাংলাদেশকে সমর্থন করেনি। ১৯৭৫ সালের পর করেছে। সে জন্য বিএনপির ধারণা চীন বিএনপির অকৃত্রিম বন্ধু। চীন কখনও কারও অকৃত্রিম বন্ধু হয়নি। বন্ধুত্বের দাম এক সময় দিত সোভিয়েত ইউনিয়ন। পুঁজিবাদী চীন সব রাষ্ট্রেই সমান মনোযোগ দেবে। চীন সুপার পাওয়ার। বাংলাদেশের কৌশলগত মূল্য আছে তার কাছে। তবে চীন উৎসাহী বিনিয়োগে। বেগম জিয়ার মতো অনেক দেশের সরকারী নেতা, বিরোধীদলীয় নেতা চীনে যাচ্ছে হরদম।

চীন বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে ভাবিত নয়। চীন জানে, যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক চীনের সঙ্গে তার সম্পর্ক অটুট থাকবে, যেমন থাকে আমেরিকার সঙ্গে। বেগম জিয়া একেবারে বোধহীন রাজনীতিবিদ, তা তো নয়। তিনি অনুধাবন করেছেন ২০১৪ সালের নির্বাচনে তাঁকে যেভাবেই হোক ক্ষমতায় যেতে হবে, সেটি গণতান্ত্রিক-অগণতান্ত্রিক যে পথেই হোক না কেন। না হলে আরও পাঁচ বছর তাঁকে অপেক্ষা করতে হবে। তখন তাঁর বয়স হয়ে যাবে সত্তরের অনেক বেশি। বাংলাদেশে কেউ রিটায়ার করে না। তিনিও করবেন না। তবে বয়স একটা ফ্যাক্টর তো বটে। তাঁর সুপুত্ররাও পাঁচ বছর দেশে আসতে পারবে না। কিন্তু তার চেয়ে বড় কথা মওদুদ আহমদ বা মির্জা ফখরুল তো এতদিন অপেক্ষা করবেন না। তাঁরা নতুন দল গড়বেন বা দল বদল করবেন। তাঁদের পথ অনুসরণ করবেন অনেকে। ২০১৯-এর নির্বাচনেও তা’হলে জেতার চান্স নেই। তাঁর একমাত্র রাজনৈতিক আদর্শ আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করা ও পাকিস্তানের পক্ষে থাকা। তাঁর বিশ্বস্ততা আসলে পাকিস্তানবাদের প্রতি। বেগম জিয়ার ধারণা ভারত অনুকূলে না থাকলে নির্বাচনে বোধহয় জেতা যাবে না। বাংলাদেশের নির্বাচনে ভারতের আগ্রহ বেশি। সুতরাং ভারতকে সন্তুষ্ট করতে তিনি মরিয়া। বেগম জিয়ার ভারত ত্যাগের আগে ভুবন মোহিনী হাসি ও ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে হাস্যমুখর আলোচনা রবীন্দ্রনাথের একটি গান বার বার মনে করিয়ে দেয়। ‘আমার সকল নিয়ে বসে আছি সর্বনাশের আশায়…।’

ক্ষমতায় যে-ই থাকুক তাতে ভারতের কিছু যায় আসে না। ভারত তার নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক স্বার্থ অক্ষুন্ন ও অটুট রাখতে চায়। সুতরাং সব ডিম এক ঝুড়িতে রাখা ঠিক হবে না। সব দল ভারতের বন্ধু। সব দল ভারতের শত্রু।

সুতরাং, আওয়ামী লীগ প্রীতি যা কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোট দেখিয়েছে তা গ্রহণযোগ্য নয়। ভারতের কংগ্রেসের এখন নড়বড়ে অবস্থা। সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও সব সময় ঝুঁকির মুখে আছে কংগ্রেস। সে জন্য সাউথ ব্লকের এ তত্ত্বনীতি নির্ধারকরা হয়ত গ্রহণ করেছেন বা করতে বাধ্য করেছেন। কারণ এই নীতির পেছনে একটা রাজনৈতিক শক্তিও আছে কিন্তু বলে রাখা ভাল, এর বিপক্ষের দলও কম শক্তিশালী নয়।

এবার মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা নিতে যাঁরা এসেছিলেন, তাঁদের অনেকের সঙ্গে আলাপ হয়েছে। ভারত যে খালেদাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে তাতে তাঁরা মহাবিরক্ত। তাঁদের যুক্তি সোজাসাপটা, শেখ হাসিনা খোলা মনে কোন তাস আঁচলে না ঢেকে কথা বলেছেন। প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং প্রতিশ্রুতি রেখেছেন। ভারতকে তার প্রতিশ্রুত রাখতে হবে। যেসব নীতিনির্ধারক এরশাদ-খালেদাকে আমন্ত্রণ জানানোর কৌশল নিতে বলছেন তাঁরা ভ্রান্ত। কারণ তারা ইতিহাস জানে না। তাঁরা এসব ভ্রান্ত মতের বিরোধিতা করবেন দেশে গিয়ে। তাঁরা আরও জানিয়েছেন, সাউথ ব্লকের এসব মাতব্বরিতে ভারত সীমান্তের ছয়টি রাজ্য খুবই অসন্তুষ্ট। তাদের নীতিনির্ধারকরা নাকি জানিয়েছেন শেখ হাসিনার সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হলে তাদের মাশুল দিতে হবে এবং এ মাশুল তারা একা নয় কেন্দ্রকেও দিতে হবে।

তাঁদের অনেকে বলেছেন, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তাঁদের পরিচয় ১৯৭১ থেকে। সেই মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত যে ক’বার তাঁদের সঙ্গে দেখা হয়েছে জিয়ার, একবারও তিনি ভারতের পক্ষে একটি কথাও বলেননি। খালেদা তাঁর স্ত্রী। ৩৫ বছর ধরে যে নীতি পালন করে এসেছে বিএনপি তা হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই বাদ দিয়ে দেবে তা কখনও হয়? তাঁদের মতে, বিএনপির এটি সাময়িক কৌশল। কারণ খালেদা যদি আন্তরিকও হন তাঁর সমর্থকরা তা মানতে রাজি হবে কেন? তারা ভালবাসে পাকিস্তানবাদকে। যদি তা ত্যাগই করতে হয় তা’হলে আওয়ামী লীগ করলে দোষ কী? খালেদা জিয়া শুধু চান ভারত সরকার তাঁকে নিয়ে একটু মাতামাতি করুক, তা’হলে বাংলাদেশে জনমনে এ গুজব দৃঢ়ভাবে শেকড় ছড়াবে যে, ভারত বিএনপিকে সমর্থন করছে তা’হলে বিএনপিই ক্ষমতায় আসবে। সুতরাং হিসাবটা কিন্তু এত সহজ বলে মনে হচ্ছে না। মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে দেখা করার আগে বেগম জিয়ার নামে একটি প্রবন্ধ ছাপা হয়েছে, যেখানে তিনি ভারতপ্রীতির কথা উল্লেখ করেছেন। চীন-ভারত সফরের তারিখ দু’সপ্তাহের মধ্যেই রেখেছেন। যাতে এর ইতিবাচক খবর অভিঘাত হানে। মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে দেখা হওয়া মাত্র বলেছেন বাংলাদেশের মাটি ভারতীয় বিছিন্নতাবাদীদের ব্যবহার করতে দেয়া হবে না।

খালেদা জিয়া ক্ষমতায় থাকতে সব সময় বলেছেন, বাংলাদেশে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের কোন ঘাঁটি নেই। এখন তাঁর কথা শুনে মনে হচ্ছে, আগে ছিল এখন আর হতে দেবেন না। কিন্তু সত্যটা হচ্ছে, বেগম জিয়ার কথামতো যদি বিছিন্নতাবাদীদের ঘাঁটি না থাকে তা’হলে শেখ হাসিনা কাদের বহিষ্কার করলেন? কেন ভারত ও আমেরিকা শেখ হাসিনাকে সমর্থন জানাল? শেখ হাসিনা বিছিন্নতাবাদীদের শক্তি বিনষ্ট করে দিয়েছেন। খালেদার আশ্বাসে এখন কিছুই আসে যায় না। ভারত কি ভুলে গেছে। হাসিনা যখন বিছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছিলেন, তখন খালেদা জিয়া জোরাল ভাষায় প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছিলেন, ওরা বিছিন্নতাবাদী নয়। ওরা দেশপ্রেমিক। হাসিনা ভারতীয় দেশপ্রেমিকদের হেনস্থা করছেন। এ প্রসঙ্গে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ইঙ্গিত করে বলেছিলেন, উলফা বা অন্যদের যুদ্ধও এক ধরনের মুক্তিযুদ্ধ।

বিএনপি-জামায়াত জোটের পাঁচ বছর ছিল বাংলাদেশের জন্য নরকতুল্য। আওয়ামী লীগ ও সংখ্যালঘুদের ওপর প্রচ- অত্যাচার শুরু হয়। সংখ্যালঘুদের অনেকে দেশ ত্যাগ করতে থাকেন। অন্যদিকে, সরকার দেশের অভ্যন্তরে উগ্রবাদী জঙ্গী সংগঠনগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া শুরু করে।

উলফার ঘাঁটি তৈরি হয় বাংলাদেশে, যা পরবর্তীতে প্রমাণিত হয়েছে। মিয়ানমারের আরাকান থেকে উগ্রবাদীরা বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিতে থাকে। এ সময় দশ ট্রাক অস্ত্র হঠাৎ ধরা পড়ে। অনুমান করা হচ্ছিল এগুলো ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের জন্য আনা হয়েছে, যা পরে প্রমাণিত হয়েছে। তখন তদন্ত অসমাপ্ত রাখা হয়। আইএসআই সক্রিয় হয়ে ওঠে। শেখ হাসিনার ওপর গ্রেনেড হামলা হয়, তাঁকে কয়েকবার হত্যার চেষ্টা হয়। আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাকে হত্যা করা হয়। জেলে নেয়া হয় অনেককে। উগ্র জঙ্গীবাদীরা বিভিন্ন জায়গায় হামলা শুরু করে। সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন চরম আকার ধারণ করে।

২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সামরিক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। দুর্নীতির দায়ে তারা উভয় দলের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করতে থাকে এবং এক পর্যায়ে বেগম জিয়া ও শেখ হাসিনাকেও গ্রেফতার করলে জনমত সামরিক সরকারের বিপক্ষে চলে যায়। এ পরিস্থিতিতে ভারত নতুন বাঙালী রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশে প্রেরণ করে। বাংলাদেশের সেনাপ্রধান ভারত সফরে যান। তাঁকে পরম অভ্যর্থনা জানানো হয়। বাংলাদেশ সরকার ঘোষণা করে ভারত সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চায়। একজন বাঙালী (প্রণব মুখার্জী) পররাষ্ট্রমন্ত্রী হন, যার সঙ্গে শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠতা সবার জানা। সবাই আশা করতে থাকে পরিস্থিতি পাল্টে যাবে এবং এর পরই বাংলাদেশের পরিস্থিতি পাল্টে যেতে থাকে। দুই নেত্রীকে মুক্তি দেয়া হয় এবং সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা দেয়া হয়। ভারতীয় মন্ত্রীদের কয়েকজন ঢাকায় আগমন করেন বিভিন্ন উপলক্ষে এবং এ ঘোষণা দিতে তাঁরা দ্বিধা করেননি, তাঁরা বাংলাদেশে একটি অসাম্প্রদায়িক সরকার আশা করেন। ভারতীয় রাষ্ট্রদূতের বিভিন্ন কর্মকা- ও বক্তব্যে অনুমিত হয় যে, তাঁরা তত্ত্বাবধায়ক সামরিক সরকার অথবা বিএনপি-জামায়াত সরকার পছন্দ করবে না। ইতোমধ্যে কংগ্রেসের নেতৃত্বে ভারতে সরকার গঠিত হয়। কোয়ালিশন হলেও কংগ্রেসই প্রধান হয়ে ওঠে, ড. মনমোহন সিং পুনর্বার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। জনমনে এই ধারণা হয় যে, আওয়ামী লীগ নির্বাচনে জিতবে। প্রথমত দেশের অভ্যন্তরীণ অবস্থা গত সাত বছরে এমন নরকতুল্য হয়ে উঠেছিল যে, মানুষজন আশা করছিল আওয়ামী লীগ সরকার এ থেকে তাদের মুক্তি দেবে। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী মেনিফেস্টোতে পরিষ্কার ঘোষণা করা হয়েছিল, নির্বাচনে জিতলে তারা ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানি, ট্রানজিট এবং ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী সমস্যাসহ দ্বিপাক্ষিক সমস্যাগুলোর সমাধান করবে। ফলে জনগণের মনে আরেকটি ধারণা জন্মে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসবে এবং সেনাবাহিনী ‘নিরপেক্ষ’ থাকবে। দেখা যায়, ২০০৯ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভ করে। তিন দশক পর আবার বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ এবং কোয়ালিশন হলেও ভারতে কংগ্রেস প্রবলভাবে ক্ষমতাসীন হয়। দু’পক্ষই ঘোষণা করে দ্বিপাক্ষিক সব সমস্যার তারা সমাধান করবে। এবং ক্ষমতায় আসার পরই শেখ হাসিনা সে উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এবং ভারত সাড়া দেয়। ২০১০ সালের জানুয়ারিতে শেখ হাসিনা ভারত সফর করেন। ভারত-বাংলাদেশ ৫০টি অনুচ্ছেদের এক যৌথ বিবৃতি দেয়, যাতে বলা হয় গত তিন দশকের জমে থাকা সব সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করা হবে ও কয়েকটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। ১৯৭৫ সালের পর আবার ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের নতুন দিক উন্মোচিত হয়।

এ ইতিহাস বিবৃত করলাম এ কারণে যে, এত তাড়াতাড়ি ভারত নিশ্চয় এসব ভুলে যায়নি। মাত্র দশ মাস আগে খালেদা জিয়া বিবিসিকে এক সাক্ষাতকারে বলেন, “বর্তমান সরকার দেশের যা কিছু আছে সবই তলে তলে ভারতের হাতে তুলে দিচ্ছে। সরকার দেশের ও দেশের মানুষের পক্ষে কথা বলছে না। সরকার অন্য দেশের হয়ে কাজ করছে। কাজেই বর্তমান সরকার যতদিন ক্ষমতায় থাকবে ততই দেশের ক্ষতি হবে। দেশের সর্বনাশ হবে।” [জনকণ্ঠ, ১২.১২.১১]

কুষ্টিয়ার জনসভায় তিনি বলেন, “এ সরকার ভারতীয়দের সরকার। তাদের কথামতো দেশ পরিচালনা করছে। সীমান্তে প্রতিনিয়ত মানুষ হত্যা করে। বিএসএফ এ দেশের জায়গা-জমি দখল করে কিন্তু এ সরকার প্রতিবাদ করে না।” [ওই ২৭.১১.১১]

এ বছর ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি সুস্পষ্টভাবে দুটি বিষয় তুলে ধরেছেন-
১. “স্বাধীনতার পর তারা ভারতের সঙ্গে ২৫ বছরের গোলামি চুক্তি করেছিল। তখন পুরোপুরি এ চুক্তি বাস্তবায়ন করতে পারেনি। তাই এখন ক্ষমতায় এসে এ চুক্তি বাস্তবায়ন করছে।”
২. “তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা না দিলে ভারতের সঙ্গে ট্রানজিট, করিডরসহ সব ধরনের ব্যবসাবাণিজ্য বন্ধ করে দেয়ার আহ্বান জানান।” [ওই ২৮.২.১২]
পল্টনের এক সমাবেশে এর আগে বলেছিলেন বাংলাদেশের বুকের ভেতর দিয়ে ট্রানজিটের কোন গাড়ি চলতে দেয়া হবে না, হবে না। বাংলাদেশকে পুরোপুরি ভারতের অঙ্গরাজ্যে পরিণত করেছে এই সরকার। প্রধানমন্ত্রী ভারতে গিয়ে দেশ বন্ধক দিয়ে এসেছেন।” [ইত্তেফাক ৮.১১.১০]
আরও আগে ১৯৯৬ সালে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরে সাভারে দেযা বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন এখন থেকে মসজিদে মসজিদে উলুধ্বনি হবে। অর্থাৎ ভারত জোর করে সব মুসলমানকে হিন্দু বানাবে। ১৯৯৬ সালের পর পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি হলে বলেছিলেন, ফেনী থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম পর্যন্ত সব ভারতের অধীনে চলে যাবে। ১৯৪৭ সালের পর এত কদর্য ভাষায় এমন সাম্প্রদায়িক উক্তি আর কোন রাজনৈতিক নেতা করেননি। এটি তার মনের কথা। এ জন্যই জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির এত মহব্বত।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, জিয়াউর রহমানের সময় থেকেই বিএনপি চরম ভারত ও হিন্দুবিদ্বেষী। এবং এ ধারাবাহিকতা খালেদার ভারত সফরে যাওয়ার আগে পর্যন্ত ছিল বিদ্যমান।

খালেদাকে কোন আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে কি না তা আমরা জানি না। তাদের সঙ্গে মূল কী কথাবার্তা হয়েছে তাও খালেদা বা মনমোহন সিং ছাড়া কেউ জানবেন না। এখন যেসব লেখালেখি হবে তার সবই অনুমাননির্ভর। যেহেতু ক্ষমতায় যাওয়ার প্রশ্ন সেহেতু ভারতের জিজ্ঞাসা থাকতে পারে। সংবিধান অনুযায়ী খালেদা নির্বাচনে যাবেন কি না? না গেলে ক্ষমতায় যাবেন কিভাবে? ক্ষমতায় না গেলে যা দেবেন বলছেন তা দেবেন কিভাবে? আন্দোলন করে তিনি ক্ষমতা হাতে পাবেন কি না? এ প্রশ্নের উত্তর তিনি কী দিয়েছেন তা জানা যাবে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করলে।

সংখ্যালঘুদের প্রশ্নে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি কী? এ বিষয়ও ভারত জানতে চাইতে পারে। এবং এক্ষেত্রে খালেদা পটভূমি তৈরি করে গেছেন। বিএনপি-জামায়াত রামুতে বৌদ্ধদের ওপর হামলা করে তাদের সব মন্দির ধ্বংস করেছে। খুব ভেবেচিন্তেই কাজটি করা হয়েছে। কারণ খালেদা জানেন, পাকিস্তানীমনা হিসেবে তাঁকে এই প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে। এখন তিনি তুরন্ত বলবেন, আওয়ামী লীগ আমলেও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়। আওয়ামী লীগের লোকেরাই আগে মিছিল করেছে।

তবে সবচেয়ে কঠিন যে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে তাহলো উগ্র মৌলবাদ যা তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় জামায়াত ছড়িয়েছিল তার কী হবে? এবং যুদ্ধাপরাধের বিচার চলবে কি না? দুটি প্রশ্নের উত্তরই আপাতত হ্যাঁ হবে। কিন্তু আমরা জানি, ক্ষমতায় গেলে এ দুটি প্রশ্নের উত্তর হবে– না। কারণ খালেদা জিয়া নিজের ও পুত্রদের আখের গোছানোর জন্য পাঁচ বছর সময় চান। কয়েক দিন আগেও তিনি যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। বাংলাদেশে বিএনপি এখন যুদ্ধাপরাধ সমর্থনকারী দল হিসেবে পরিচিত। মৌলবাদীদের প্রশ্ন এখনও তিনি কিছু বলেননি।

একজন প্রৌঢ়ার মিনতিতে একজন প্রৌঢ়ের মন গলবেই, কূটনীতি এমন সোজা নয়। তবে আওয়ামী নীতি গ্রহণ করে তিনি মনমোহন সিংয়ের সমবেদনা হয়ত কুড়াতে পারবেন। আমরা ভুলে যাচ্ছি যে, জেনারেল এরশাদকেও ভারত আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। তুরন্ত তিনি ছুটে গেছেন দিল্লীতে। দিল্লীর ক্ষমতা তিনিও জানেন। দিল্লীওলারা এও জানে সুযোগ পেলেই এরশাদ খালেদাকে সমর্থন জানাবেন।

আসলে কূটনীতির সাফল্য নির্ভর করে দেশের ওজনের ওপর। আমাদের নেতারা ক্ষমতায় গেলে ভাবেন, দেশের ওজনটা বোধহয় খুব বেশি। আর তাদের ওজন তো দেশের থেকেও বেশি। আসলে ওজন অত বেশি নয়। তাই বড় দেশের ডিক্টাট আমাদের মেনে চলতে হয়, হবে। ওজনদার হলে অবস্থার পরিবর্তন হবে।

বন্ধু বদলানো যায়, প্রতিবেশী তো বদলানো যাবে না। তাই আওয়ামী লীগ ভারতের প্রতি সহনশীল বন্ধুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছে। ভারতের নতুন তাত্ত্বিকরা বিএনপিকে যতই ভারত বন্ধু বলে মনে করুক আমরা তো জানি, কয়লা ধুলে ময়লা যায় না। আর এও জানি ভারত প্রায় ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতি রাখতে ব্যর্থ হয়। ভারত শুধু বঙ্গবন্ধুর সময় এবং শেখ হাসিনার সময় কিছু প্রতিশ্রুতি পালন করেছে। ইন্দিরা সব প্রতিশ্রুতি রেখে ছিলেন। কিন্তু উপমহাদেশের পরবর্তী রাজনীতিবিদরা তো ইন্দিরা ও বঙ্গবন্ধুকে ছাড়িয়ে যেতে পারেননি। আবার আমেরিকা, চীন এমনকি পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও ভারত প্রতিশ্রুতি রাখবে। তাদের তারা ভয় করে। সেক্ষেত্রে তাদের পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের অবস্থা বাংলাদেশের মতো।

সুতরাং ভারত হাসিনাকেও চাপে রাখার জন্য খালেদার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক শুধু বজায় নয়, তাকে সাহায্যও করতে পারে। তাতে আওয়ামী লীগের খুব একটা ক্ষতি হবে না। খালেদা, নিজামী এবং বিএনপি-জামায়াত কী জিনিস তা আমরা হাড়ে হাড়ে জানি। সে জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতও আমরা। কারণ আওয়ামী লীগের ভুলের মাসুল আমাদের দিতে হবে নেতাদের নয়, তারা কখনও দেয়নি, প্রয়োজনে তারা দেশত্যাগ করবে [আ. লীগ নিযুক্ত অধিকাংশ উপদেষ্টা ক্রাইসিসে প্রবাসে সময় কাটিয়েছেন, নেতা-মন্ত্রীদের অনেকেও] অথবা সংস্কারবাদী হবেন। কিন্তু আমরা জানি খালেদা জিয়া ক্ষমতায় আসামাত্র কমপক্ষে কুড়ি লাখ দেশত্যাগ করতে বাধ্য হবে। মিয়ানমার থেকে পশ্চিমবঙ্গ পর্যন্ত ভারতের ‘দেশপ্রেমিকদের’ ব্যবহার করতে দেয়া হবে। কার্যত আইএসআইয়ের নির্দেশে প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র নীতি কার্যকর হবে। পাকিস্তানবাদ আরও দৃঢ় হবে। ‘হাম হ্যায় পাকিস্তানী’ এ সঙ্গীতই হয়ত জাতীয় সঙ্গীত হবে [জাতীয় সঙ্গীত বদলাবার প্রস্তাব বিএনপির নেতারা দিয়েছিল] ভারতে গিয়েও বিএনপি জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক বলেছে। সে জন্যই বলেছিলাম কয়লা ধুলেই ময়লা যায় না। যে ভারত ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুকে স্বীকার করেছে স্বাধীনতার আহ্বায়ক হিসেবে সে ভারতে গিয়ে যদি বিএনপি নেতারা সরাসরি মিথ্যা বলে এখন, তাহলে ভবিষ্যতে? সুতরাং ভারত যদি তার সীমানায় দুই প্রান্তে দুটি পাকিস্তান নিয়ে থাকতে চায় তাতে আমাদের অসুবিধা কী?

মুনতাসীর মামুন:অধ্যাপক, লেখক ও গবেষক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

The Weeklydesh newspaper