সোনালী ব্যাংকে যত অপকর্ম হয়েছে রাতের বেলায়

hallmark

সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা (সাবেক ঢাকা শেরাটন হোটেল) শাখায় সব বড় অপকর্ম হয়েছে সন্ধ্যার পর। গুটি কয়েক কর্মকর্তা রাতে হলমার্ক গ্রুপের অর্থ জালিয়াতির সব পথ বাতলে দেন। সোনালী ব্যাংকের একজন সাবেক উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) এবং রূপসী বাংলা শাখার একজন সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হলমার্ক গ্রুপের হয়ে কাগজপত্র তৈরি করতেন বলে অনুসন্ধানে তথ্য মিলেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট শীর্ষ পর্যায়ে কথা বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে, হলমার্ক জালিয়াতির দুই হাজার ৬৬৮ কোটি টাকার ৭০-৮০ শতাংশ স্বীকৃত বিল তৈরি হয়েছে রাতেই। রূপসী বাংলা শাখা এ সময় খোলা থাকত রাত নয়-দশটা পর্যন্ত। এ সময় ব্যাংকের গুটি কয়েক কর্মকর্তা উপস্থিত থাকতেন।
যোগাযোগ করা হলে সোনালী ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রদীপ কুমার দত্ত প্রথম আলোকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে তিনি গত শনিবার ব্যাংকের ব্যবস্থাপকদের একটি সম্মেলনে বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমি শাখানিয়ন্ত্রকদের বলেছি, অফিসে বসে না থেকে মাঝেমধ্যে হঠাৎরাতের বেলা একেক শাখাতে আকস্মিক পরিদর্শনে যাবেন। দেখবেন শাখাতে কাজ হচ্ছে না অকাম হচ্ছে।’
কেবল রূপসী বাংলা শাখা নয়, সোনালী ব্যাংকে কয়েক বছর ধরে নারায়ণগঞ্জ করপোরেট শাখা, ঢাকার রমনা শাখা এবং এ দফায় গুলশান শাখাসহ যেসব শাখায় বিভিন্ন সময় বড় অনিয়ম হয়েছে, সব ক্ষেত্রেই রাতে এসব কর্মকাণ্ড হয়েছে। ঋণপত্র বা স্থানীয় ঋণপত্র দিয়ে পণ্য কেনাবেচা করার নামে স্বীকৃত বিল জালিয়াতির মাধ্যমেই প্রধানত ব্যাংক থেকে অর্থ বের করে নেওয়া হয়। এই ঋণ ছিল মূলত অল্প সময়ের অর্থায়ন, অর্থাৎ৯০ থেকে ১৮০ দিনের মধ্যে, যা ব্যাংকে ফেরত আসার কথা ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এগুলো পাঁচ বা দশ বছর, এমনকি তার চেয়ে বেশি সময়ের জন্য মেয়াদি ঋণে পরিণত হয়। যেমন, হলমার্ক তাদের জালিয়াতির অর্থ এখন ৩০ বছরে পরিশোধের জন্য মেয়াদি ঋণে পরিণত করতে আবেদন করেছে।
সাবেক দুই কর্মকর্তা: সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের ড্রিলিং রুমে (বৈদেশিক বিনিময়-সংক্রান্ত) সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) ছিলেন আবদুল গফুর ভূঁইয়া। পরে তিনি ঢাকার বঙ্গবন্ধু এভিনিউ শাখার দায়িত্ব এবং পরবর্তী সময়ে খুলনায় থাকাকালে ডিজিএম হন। বৈদেশিক বিনিময়-সংক্রান্ত এবং এলসি খোলার কাজে তাঁর বিশেষ দক্ষতা রয়েছে। তিনি ড্রিলিং রুমে থাকাকালে ৮৪ কোটি টাকার একটি ঘাপলা হয়।
এই কর্মকর্তা হলমার্কের পক্ষে বিভিন্ন কাগজপত্র তৈরি করে দেন বলে অনুসন্ধানে তথ্য মেলে। যোগাযোগ করা হলে আবদুল গফুর তাঁর সংশ্লিষ্টতার কথা অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, ২০১০ সালে অবসর নেওয়ার পর যৌথ উদ্যোগের একটি কোম্পানিতে পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন তিনি। আর ড্রিলিং রুমের ঘাপলাটি তাঁর আমলে হয়নি বরং তাঁকে ঘাপলার পর তা উদ্ঘাটনের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
অন্যদিকে ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পরও রূপসী বাংলা শাখার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ওয়াহেদুজ্জামান একই শাখায় নিয়মিত কাজ করেছেন বলে নিশ্চিত হওয়া যায়। ডিজিএম এ কে এম আজিজুর রহমান তাঁকে চাকরির সুযোগ করে দেন শাখাতে। সোনালী ব্যাংকের তত্কালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হুমায়ুন কবীর তাঁকে প্রতিদিন ৫০০ টাকা হারে বেতনের ব্যবস্থা করেন, আবার পরে তা বাড়িয়ে দিনে এক হাজার টাকা করা হয়। জানা যায়, ওয়াহেদুজ্জামান তাতে রাজি হননি। তিনি বরং হলমার্ক ও টিএন ব্রাদার্সের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা করে প্রতি মাসে এক লাখ টাকা আয় করতেন।
যোগাযোগ করা হলে ওয়াহেদুজ্জামান দাবি করেন, ডিজিএম আজিজুর রহমান তাঁকে কোনো মাসে ১৫ হাজার, আবার কোনো মাসে ২০ হাজার টাকা করে দিতেন। তিনি ব্যাংকের বৈদেশিক ঋণপত্রের কাজগুলো দেখতেন। তবে তিনি কোনো কাগজে সই করতেন না।
অর্থ উত্তোলনের তথ্য নেই: হলমার্ক রূপসী বাংলা শাখা থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ বের করে নিলেও কীভাবে অর্থগুলো উত্তোলন হয়, সেই সূত্রগুলো (লিংক) এখনো খুঁজে দেখেনি বাংলাদেশ ব্যাংক। এমনকি হলমার্কের নামে-বেনামে কত প্রতিষ্ঠান রয়েছে, তা-ও এখনো বাংলাদেশ ব্যাংক আবিষ্কার করতে পারেনি। এসব কাজে তেমন আগ্রহও দেখা যাচ্ছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনকাজে একদা যুক্ত ছিলেন এমন একজন কর্মকর্তা মনে করেন, অর্থ চলাচলের গতিবিধি ব্যাপকভাবে অনুসন্ধান করা হলে কারা এর প্রকৃত সুবিধাভোগী, তা বের হতে পারে। কেননা, কোটি কোটি টাকা নগদে তোলা সম্ভব নয়। উপরন্তু অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে থাকলে তারও একটা ইঙ্গিত মিলতে পারে অর্থ চলাচলের গতির মধ্যেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

The Weeklydesh newspaper