বৌদ্ধ বসতি ও মন্দিরে হামলা-লুটপাট-অগ্নিসংযোগে ‘জামায়াতের ইন্ধন’

buddhist

কক্সবাজারের রামুতে বৌদ্ধ বসতিতে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসে একটি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের ইন্ধন এবং রোহিঙ্গাদের অংশগ্রহণ ছিল বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

তারা বলছেন, পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করতে মিয়ানমারের সাম্প্রতিক জাতিগত সংঘর্ষের ঘটনায় রোহিঙ্গাদের ক্ষোভকে কাজে লগিয়েছে একটি মহল। যারা হামলা চালিয়েছে, তাদের কণ্ঠে শোনা গেছে ‘নারায়ে তকবির’ শ্লোগান।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সামাজিক যোগাযোগ ওয়েবসাইট ফেইসবুকে কোরআন অবমাননা করে ছবি সংযুক্ত করার অভিযোগে শনিবার রাত ১০টার দিকে একটি ইসলামী দলের কয়েকজন নেতার নেতৃত্বে একটি সমাবেশ হয়। তাতে বক্তারা দাবি করেন, রামু উপজেলার বৌদ্ধ পাড়ার উত্তম বড়ুয়া নামের এক যুবকের ফেইসবুক একাউন্টে কোরআন অবমাননাকর ছবিটি পোস্ট করা হয়েছে।

সমাবেশের পর রাত ১১টা থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত বড়ুয়া পাড়া, মিঠাছড়ির বনবিহার ও চৌমুহনী-চেরাংঘাটা সড়কে বৌদ্ধ বসতিতে তাণ্ডব চলে। সাতটি বৌদ্ধ মন্দির, প্রায় ৩০টি বাড়ি ও দোকান পুড়িয়ে দেয়া হয়। হামলা, ভাংচুর ও লুটপাট চালানো হয় আরো শতাধিক বাড়ি ও দোকানে।

এ ঘটনার পর রোববার সকাল থেকে রামু সদরে অনির্দিষ্টকালের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করে জেলা প্রশাসন। গঠন করা হয়েছে তদন্ত কমিটি। নিউ ইয়র্কে অবস্থানরত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ।

হামলার পর গভীর রাত থেকে রোববার সারাদিনে বিভিন্ন এলাকায় বিপুল সংখ্যক পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি সদস্যদের উপস্থিতি এবং সেনা সদস্যদের টহল থাকলেও চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন রামু সদর উপজেলা এবং বিভিন্ন এলাকার বৌদ্ধ ও সংখ্যালঘু স¤প্রদায়ের বাসিন্দারা।

পরিস্থিতির অবনতি হবার জন্য তারা পুলিশ, র‌্যাবসহ প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের ‘অবহেলাকেই’ দায়ী করছেন।

ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর বলেছেন, সংঘবদ্ধভাবে এ হামলা চালানো হয়েছে। পেট্রোল, গান পাউডার দিয়ে ঘর-বাড়ি ও মন্দিরে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। হামলা পরিকল্পিত না হলে এটা সম্ভব হতো না।

রামু সদরের মেরংলোয়া পাড়ার সীমা রাজবন বিহার এর আবাসিক পরিচালক প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, মধ্যরাতে প্রথমে একদফা মিছিল এসে পাড়ার বিভিন্ন ঘরে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। টিনের সীমানা বেড়া ভেঙে ফেলে আতঙ্ক তৈরি করে।

“রাত আরো গভীর হলে চার থেকে পাঁচশ লোক নারায়ে তকবির শ্লোগান দিতে দিতে মিছিল করে পাড়ায় আসে এবং মন্দির জ্বালিয়ে দেয়।”

আগুন দেয়ার আগে হামলাকারীরা মন্দিরের দান বাক্স এবং দুটি স্বর্নের বৌদ্ধ মূর্তি লুট করে বলে প্রজ্ঞানন্দ জানান।

তিনি বলেন, হামলাকারীরা ওই পাড়ার অন্তত দশটি ঘর পুড়িয়ে দেয়।

এর আগে বৌদ্ধদের ওপর এমন ভয়াবহ নির্যাতন দেখেননি উল্লেখ এই ধর্মগুরু বলেন, “প্রশাসনের নির্লিপ্ততার কারণেই ঘটনা এতো বড় হয়েছে। পুলিশ ও র‌্যাব সদস্যরা আগে থেকেই উদ্যোগ নিলে এমন ঘটনা হয়তো ঘটতো না।

মন্দির পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক তরুণ বড়–য়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, হামলাকারীদের মধ্যে রামু এলাকার স্থানীয় কিছু লোক থাকলেও একটি বড় অংশ বাইরে থেকে আসা।

এমন ঘটনায় বিষ্ময় প্রকাশ করে তিনি বলেন, “মুসলমানদের সঙ্গে আমরা এতোদিন ধরে পাশাপাশি বসবাস করে আসছি। তারা আমাদের ওপর হামলা করতে পারেন তা আমাদের কল্পনারও বাইরে ছিল। এতো ছোট ঘটনার জন্য এতো বড় হামলা বিশ্বাস করা যায় না।”

একই ধরনের কথা শোনা গেল উত্তর মিঠাছড়ি, শ্রীকূলসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের মুখেও।

প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গা ও রাখাইন সম্প্রদায়ের সংঘর্ষের পর কক্সবাজারে দীর্ঘদিন ধরে অবস্থারত রেহিঙ্গাদের মধ্যে যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে, তাকে উস্কে দিয়ে ‘একটি মহল’ এ ঘটনা ঘটিয়েছে বলে মনে করেন তরুণ বড়–য়া।

তিনি বলেন, “পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করতে এ ঘটনার পেছেনে জামায়াতে ইসলামীর ইন্ধন থাকতে পারে।”

কক্সবাজারের ঝিলংজা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও ছাত্রদলে কক্সবাজার জেলা কমিটির দপ্তর সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন জিকু বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, ঝিলংজার বিভিন্ন সংখ্যালঘু পল্লী ঘিরে রাতে জামায়াতে ইসলামীর কর্মীদের জড়ো হওয়া খবর পেয়ে তিনি গিয়ে তাদের সরিয়ে দেন। পুলিশকেও তিনি বিষয়টি অবহিত করেন। কিন্তু এর কিছুক্ষণ পর তিনি হামলার খবর পান।

রামু উপেজলা পরিষদের চেয়ারম্যান সোহেল সারওয়ার কাজলের ধারণা, ‘রামুর বাইরে থেকে লোক এনে’ পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করতেই এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে।

পুলিশ-র‌্যাবসহ প্রশাসনের গাফিলতির কারণে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ পেয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “তারা ঘটনাস্থলে গেছে অনেক পরে। শুরুতে গেলে হয়তো অনেক বিপর্যয় এড়ানো যেত।”

তবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি কক্সবাজার জেলা পুলিশ সুপার সেলিম মো. জাহাঙ্গীর। তিনি বলেন, “বিষয়টি নিয়ে যে যার মতো করে বলছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ক্ষতিগ্রস্ত মন্দির ও বৌদ্ধ অধ্যুষিত এলাকায় পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা রয়েছে।”

হামলার খবর পেয়ে রোববার সকালেই রামুতে ছুটে আসেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দিন খান আলমগীর ও শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া। ক্ষতিগ্রস্ত মন্দির ও ঘরবাড়ি ঘুরে দেখে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, এসব স্থাপনা পুননির্মাণে সরকারের পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তা দেয়া হবে।

পুলিশসহ প্রশাসনের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ শুনে বিষয়টি তদন্ত করারও নির্দেশ দিয়েছেন মন্ত্রী।

এ ঘটনায় গঠিত চার সদস্যের তদন্ত কমিটিকে ১০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে বলে চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার সিরাজুল হক জানান।

বিকালে রামুর বৌদ্ধ অধ্যুষিত বিভিন্ন ঘুরে দেখা যায়, ঘর হারিয়ে চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে খোলা আকশের নিচে অবস্থান করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

শ্রীকূল বড়–য়া পাড়ায় শনিবার রাতে পুড়িয়ে দেয়া হয় চারটি মন্দির ও প্রায় ১৫টি বসতঘর। চারটি মন্দিরের মধ্যে দুটিই রাখাইনদের পরিচালিত।

বড়–য়া পাড়ার বাসিন্দা নিকাশ বড়ুয়া বলেন, “হঠাৎ করে কেন এমন হলো তা আমরা বুঝতে পারছি না। রাম-দা হাতুড়ি নিয়ে এসে তারা হামলা চালায়। কারা করেছে তাও আমরা জানি না।”

তবে হামলার সময় ‘নারায়ে তকবির’ ধ্বনি শুনেছেন বলে জানান তিনি।

অবশ্য হামলায় ইন্ধন দেয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কক্সবাজার জেলা জামায়াতের আমীর মো. শাহজাহান। তিনি বলেন, “জানমালের ক্ষতি করা, বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে আঘাত করা প্রতিবাদের ভাষা হতে পারে না। এটা ইসলামসম্মতও নয়। এ ধরনের কাজ জামায়াতে ইসলামী ঘৃণা করে।”

সরকার সব সবসময়ই বিরোধী দলের ওপর দোষ চাপানোর চেষ্টা করে- এমন অভিযোগ করে এই জামায়াত নেতা বলেন, “এই ঘটনার সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।”

তবে শাহজাহানও অভিযোগ করেন, যারা দেশকে ‘জঙ্গি রাষ্ট্র’ বানাতে চায়, তারাই হামলার পেছনে ইন্ধন যুগিয়েছে।

এ ঘটনায় হতবাক রামুর মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকজনও। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ওপর এ ধরনের হামলার কোনো যুক্তিই তারা খুঁজে পাচ্ছেন না।

রামু সদরের রিকশাচালক ছলিম উল্লাহ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “কি জন্য এমন হলো বুঝতে পারছি না। আমরা সবাই তো একত্রে থাকি।”

অন্যদিকে রোববার রাতে এক বিবৃতিতে বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া রামুর সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় সরকারের মদদ আছে বলে অভিযোগ করেন। তিনি ঘটনার নিরপেক্ষ ও উপযুক্ত তদন্ত করে জড়িত অপরাধী ও নেপথ্য উস্কানিদাতাদের খুঁজে বের করে কঠোর শাস্তি দাবি জানিয়েছেন।

হামলা-লুটপাট-অগ্নিসংযোগের পর চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় সতর্ক অবস্থায় রয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। রোববার সকাল থেকে রামুতে অনির্দিষ্টকালের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করেছে প্রশাসন। এসব এলাকায় বিপুল সংখ্যক পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবি সদস্যরা অবস্থান করছে।

তবে হামলা-লুটপাট-অগ্নিসংযোগের ঘটনাকে ‘জঘন্যতম কাজ’ উল্লেখ করে বাংলাদেশ বৌদ্ধ কৃস্টি প্রচার মহাসংঘনায়ক শ্রী মৎ শুদ্ধানন্দ মহাথের বলেন, “হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান-মুসলমানের মধ্যে যে সম্প্রীতি আছে তা নষ্ট করার জন্য ষড়যন্ত্র চলছে।”

ঘটনার তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি সম্প্রীতি ধরে রাখতে মুসলমান সম্প্রদায়ের সহযোগিতা কামনা এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

The Weeklydesh newspaper