‘ইনোসেন্স অব মুসলিমস’ এবং মুসলিম বিশ্বের প্রতিক্রিয়া

imtiaz


ড. ইমতিয়াজ আহমেদ
:

‘ইনোসেন্স অব মুসলিমস’।’ ছবিটার নামের মধ্যে ‘নিষ্পাপ’ শব্দটি থাকলেও আসলে এই একটি ছবিই গোটা মুসলিম বিশ্বে অস্থিরতা তৈরি করেছে। আরব দেশগুলোতে তো বটেই, মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ অন্যান্য দেশে এবং পশ্চিমের দেশগুলোর মুসলিম কমিউনিটির মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। কোনও এক অখ্যাত মার্কিন চলচ্চিত্র-নির্মাতার খুব কম বাজেটে বানানো একটি ছবির ট্রেইলর দেখেই মুসলিম বিশ্ব উত্তাল। চলমান এই ঘটনাবলীকে আমি নানা দিক থেকে দেখতে চাই।

প্রথমত, আরব-বিশ্বের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে এ ধরনের একটি চলচ্চিত্র নির্মাণকে কেন্দ্র করে অস্থিরতা তৈরি হলে দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ জটিলতা বাড়তে পারে। আমরা সবাই জানি, গত এক-দেড় বছরে আরব-বসন্তের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে একটি গণজাগরণ দেখা দিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় বেশ ক’টি দেশেই স্বৈরশাসকদের পতন হয়েছে। বিচারের মুখোমুখি হচ্ছেন স্বৈরশাসকরা। কেউ কেউ বিরুদ্ধ-পক্ষের হাতে খুন হয়েছেন। মিশর এবং তিউনিসিয়ায় নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। আমার কথা হল, বর্তমান পরিস্থিতিতে এই সম্ভাবনাগুলো বিনষ্ট হয়ে যাওয়ার একটা আশঙ্কা দেখা যাচ্ছে।

লক্ষ্যণীয় যে, আরব-বসন্তের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের দেশে দেশে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিবর্তন এসেছে মাত্র। যে শক্তিগুলো শাসন-শোষণ চালিয়ে গেছে তারা পুরোপরি বিনষ্ট হয়নি। স্বৈরশাসকদের আস্থাভাজন গোষ্ঠীগুলো নানাভাবে প্রতিশোধ নিতে চাইবে। এর পাশাপাশি নানা রকমের গোষ্ঠীগত, জাতিগত এবং ধর্মীয় বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে মতাদর্শগত দ্বন্দ্ব তো রয়ে গেছেই। তেলসমৃদ্ধ অনেক দেশে স্বার্থগত কারণে এ সব দ্বন্দ্বের রূপ আরও জটিল। আবার এই মধ্যপ্রাচ্যেই ইসরাইল নামের রাষ্ট্রটির অবস্থান। মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে এই দেশটির সম্পর্ক নিয়ে পুরো বিশ্বের রাজনীতির চালচিত্রেই নানা রকম টানাপড়েন দেখা যায়।

মোট কথা, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি এমনিতেই অস্থির। বছরখানেকের মধ্যে আরব-বসন্তের আগমনে এই জটিলতা বেড়েছে বহুগুণ। কিছু গোষ্ঠী কখনও-ই চাইবে না মধ্যপ্রাচ্যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হোক। তাহলে তাদের স্বার্থের হানি ঘটবে। এ জন্য সব দেশেই কিন্তু আরব-বসন্ত আসেনি। সৌদি আরবসহ আরব-বিশ্বের অনেক দেশে এখনও রাজতন্ত্রেরই অবসান হয়নি। সিরিয়ায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা নিয়ে রক্তগঙ্গা বয়ে যাচ্ছে। তবু আসাদ-সরকার পিছু হটেনি। এখন এরাও তো চাইবে না মিশর বা তিউনিসিয়ায় গণতন্ত্র আসুক। ওদিকে ইরানের সঙ্গে মিশরের সম্পর্ক নতুন করে প্রতিষ্ঠা হয়েছে। তাতেও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন নতুন সমীকরণ তৈরি হবে।

মিশরে নির্বাচনের মাধ্যমে মুসলিম ব্রাদারহুড নতুন সরকার গঠন করেছে। এই দলটিকে নিয়েও নানা সংশয় ছিল। পরে দেখা গেল সেগুলো খুব একটা সত্য হয়নি। এই দলটি বরং মিশরে গণতন্ত্রায়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে নানা পরিকল্পনা নিয়ে। এখন মিশরে গণতন্ত্র ফিরিয়ে এনে এই অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখার চ্যালেঞ্জ ওদের সামনে। সেখানে এখনও ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের পক্ষের গ্রুপটি সক্রিয় রয়েছে। ওদিকে লিবিয়াতে গাদ্দাফি-পক্ষের নানা তৎপরতা আরও অনেক দিন থাকবে।

এই অবস্থায় নকুলা নামের কোনও এক মিশরীয় কপ্টিক ক্রিস্টান নির্মাতা ‘ইনোসেন্স অব মুসলিমস’ নামের একটি ছবি তৈরি করলেন। পত্রপত্রিকা থেকে যতটুকু জেনেছি, ছবিটা তৈরি হয়েছে কয়েক মাস আগেই। নির্মাণের সময় খুব গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়েছে। এমনকী নির্মাণের সময় ছবিটির নাম যা ছিল তা বদলে ফেলা হয়েছে। ছবির অভিনেতাদের অনেকেই নির্মাতাদের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ এনেছেন। সেভাবে কোথাও এটি প্রদর্শিতও হয়নি। শুধু ইউটিউবে এর ভিডিওটি ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল।

এ সব কিছুই প্রমাণ করে এর পেছনে বড় কোনও পরিকল্পনা বা উদ্দেশ্য রয়েছে। কোনও একটি গ্রুপ মধ্যপ্রাচ্যে বা মুসলিম বিশ্বেই অস্থিরতা তৈরি করতে চাচ্ছে। সম্প্রতি মিশরের একটি টিভি চ্যানেলে ছবিটির আরবী ডাবিং করে প্রচার করার পরই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে মুসলিমরা। বিক্ষোভ প্রদর্শনের সঙ্গে সঙ্গে সংঘাত-সংঘর্ষ-হানাহানিও ছড়িয়ে পড়ছে। দিন-দিন বাড়ছে এটা। যে পক্ষটি বা পক্ষগুলো এই অস্থিরতাই চেয়েছিল তারা কিন্তু ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করবে। তারা দেখাতে পারবে যে, মধ্যপ্রাচ্যে আসলে কোনও পরিবর্তন আসেনি, তথাকথিত আরব-বসন্ত আরব-জীবনে গণতন্ত্রের সুবাতাস বইয়ে দিতে পারবে না। আরবরা এখনও আগের মতোই অসহিষ্ণু, সহিংসতাই তাদের ধর্ম ইত্যাদি ইত্যাদি।

প্রতিবাদ করা খুব স্বাভাবিক। কারণ, ছবিটির মাধ্যমে মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানা হয়েছে। তাই বলে একটা অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে আরও অন্যায় করা যাবে না। কোথাও কোথাও প্রতিবাদগুলো হচ্ছে হিংস্রভাবে। লিবিয়ায় এই ঘটনার জের ধরে মার্কিন কনসুলেট অফিসের কর্মকর্তা খুন হয়েছেন। আরও নানা জায়গায় সহিংস ঘটনার জেরে খুন হচ্ছেন অনেকে। সমস্যা হল, আরব বিশ্বের রাজনীতি, বিশ্ব-রাজনীতির নানা মেরুকরণ এ সব বুঝতে না পারলে প্রতিবাদের ধরনে সহিংসতা আসবে– এটাই স্বাভাবিক।

দ্বিতীয়ত, মার্কিন রাজনীতির অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপটটিও বিবেচনা করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রে এটা নির্বাচনের বছর। আর মাত্র দু’মাস পরই সেখানে প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচন। সেখানে ঐতিহ্যগতভাবে ডেমোক্রেট-রিপাবলিকানদের দ্বন্দ্ব রয়েছে। ডেমোক্রেট-দলীয় প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার অনেক পদক্ষেপই গত চার বছরে রক্ষণশীল রিপাবলিকানদের পছন্দ হয়নি। বিশেষ করে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে তাঁর সমর্থনের বিষয়টি রিপাবলিকানদের সমালোচনার শিকার হয়েছে। এমনিতে ওবামা নিজে মুসলিম পিতার পরিচয়ের কারণে মুসলিম বিশ্বের আস্থাভাজন হয়েছিলেন। মধ্যপ্রাচ্য বা মুসলিম বিশ্বের ব্যাপারে তাঁর মনোভাব অনেক ইতিবাচক বলেই সাধারণ মানুষের ধারণা। আগামী নির্বাচন ঘিরে ডেমোক্রেটদের ক্যাম্পেইন থেকে বোঝা যাচ্ছে, ওবামার দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচিত হওয়া প্রায় নিশ্চিত। এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণশীলরা নির্বাচনে পরাজয় ঠেকাতে নানা কৌশল নিতেই পারে।

‘ইনোসেন্স অব মুসলিমস’ ছবিটি নিয়ে মার্কিন সরকার বিব্রত হয়েছে এটা বোঝাই যাচ্ছে। কারণ প্রেসিডেন্ট ওবামা এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন দুজনেই বলেছেন, এ ধরনের ছবি নির্মাণের বিষয়টি ‘অসমর্থনযোগ্য।’ তাঁদের দ্রুত প্রতিক্রিয়া এবং চলচ্চিত্র-নির্মাতাকে গ্রেফতার করার ঘটনায় বোঝা যাচ্ছে, তাঁরা নির্বাচনের মাত্র দু’মাস আগে কোনও ধরনের ঝুঁকি নিতে চান না। এমনিতেই গোটা মুসলিম বিশ্বে মার্কিন-বিরোধী একটি সেন্টিমেন্ট খুব শক্তিশালীভাবেই আছে। ৯/১১র টুইন-টাওয়ার ট্র্যাজিডির পর মার্কিন-মুল্লুকে মুসলিমদের নানাভাবে হয়রানি করা বা ইরাক-যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এটা আরও তীব্র হয়েছে। এখন একটি বিতর্কিত চলচ্চিত্রের জন্য বিভিন্ন দেশে মার্কিন কনসুলেট অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে থাকলে, এমনকি মার্কিন নাগরিকরাও নানা জায়গায় বিপদের মুখোমুখি হলে, বর্তমান ওবামা সরকারকেই তো এ জন্য দেশে সমালোচনার মুখোমুখি হতে হবে। বিশেষ করে যেখানে বিরোধী-পক্ষ নানাভাবে সক্রিয় রয়েছে।

এখন কথা হচ্ছে যে, একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের পেছনে কারণ যা-ই থাকুক, সেটি নির্মিত হয়ে গেছে। এ নিয়ে দেশে-দেশে বিক্ষোভ করতে গিয়ে সংঘাত-সংঘর্ষের দিকে চলে গেলে ওই বিতর্কিত ছবির বক্তব্যকেই তো সত্য প্রমাণিত করা হবে। ওই ছবিতে মুসলিমদের হিংস্র এবং খুনী হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে বলে মুসলমানরা প্রতিবাদ করছেন। কিন্তু এ জন্য যদি তারা সহিংসতাই দেখান তাহলে ছবির বক্তব্যকে প্রোটেস্ট করার সুযোগ থাকছে না। তাই আমার বক্তব্য হল, মুসলমানদের অবশ্যই এটা পরিহার করে এ ধরনের ছবি নির্মাণের উদ্দেশ্যকে বানচাল করতে হবে। মুসলমানরা বলেন, ইসলাম শান্তির ধর্ম। তাহলে সেই ধর্মেল অনুসারীরা কখনও-ই অশান্তি চাইবেন না। তাছাড়া একটি বিদ্বেষমূলক চলচ্চিত্র বা একটি কার্টুন বা একটি বই কখনও-ই একটি ধর্মকে অবমাননা করতে পারে না। ধর্ম অনেক শক্তিশালী একটি বিষয়। বিশেষ করে যে ধর্মের অনুসারীরা গোটা বিশ্বেই ছড়িয়ে আছেন এবং সংখ্যায় তারা একশ’ কোটিরও বেশি। কাজেই একটি ছবি বা কার্টুন নিয়ে খুব বেশি স্পর্শকাতর হওয়ার কোনও প্রয়োজন নেই।

মার্কিন প্রশাসন আশা করা যায় এ ব্যাপারে কার্যকর কিছু উদ্যোগ নেবেন। মার্কিন সংবিধানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সংজ্ঞা অনেক ব্যাপক। তবে কোনও জাতি বা গোষ্ঠীর ব্যাপারে ঘৃণা ছড়াতে পারে, এমন কিছুর ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়াও তাদের আইনে সম্ভব। যেহেতু মিশরীয় বংশোদ্ভূত ওই নির্মাতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে তাই মনে হচ্ছে বর্তমান সরকার সে দিকেই যাচ্ছেন।

ওদিকে চারদিকে দ্রুত বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়ছে বলে মুসলিম বিশ্বও জরুরি ভিত্তিতে একটি উদ্যোগ নিতে পারে। শীর্ষ দেশগুলোর নেতারা এ নিয়ে আলোচনায় বসতে পারেন। কেউ-ই নিশ্চয়ই চাইবেন না যে, অন্য দেশের তৃতীয় গ্রেডের একটি বিদ্বেষমূলক ছবি তৈরির অপপ্রয়াসকে ঘিরে নিজ দেশে অস্থিরতা তৈরি হোক। যত শিগগির এটা হবে ততই সবার জন্য ভালো।

ড. ইমতিয়াজ আহমেদ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল রিলেশন্স বিভাগের শিক্ষক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

The Weeklydesh newspaper