পদ্মা সেতু প্রকল্প নিয়ে ভুল ব্যাখ্যা দিয়েছে সরকার!

wb

পদ্মা সেতু প্রকল্প নিয়ে বিশ্বব্যাংকের অবস্থানের ব্যাপারে সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা ভুল ব্যাখ্যা দিয়েছেন। গতকাল মঙ্গলবার নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিবৃতির মাধ্যমে বিশ্বব্যাংক এ কথা জানিয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের বিবৃতিটি নিচে তুলে ধরা হলো:
বাংলাদেশের পদ্মা সেতু প্রকল্পের ব্যাপারে বিশ্বব্যাংক নিচের বিবৃতিটি দিচ্ছে:
সংবাদমাধ্যমে পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের ব্যাপারে বিশ্বব্যাংকের অবস্থান নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে যেসব প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, এতে এসব কর্মকর্তা ভুল ব্যাখ্যা দিয়েছেন। আমরা বিষয়টি পরিষ্কার করতে নিচের ব্যাখ্যার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি:
পদ্মা সেতুর অর্থায়নের বিষয়টির সঙ্গে জড়িত বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতিসংক্রান্ত বিশ্বাসযোগ্য তথ্যপ্রমাণ একাধিকবার সরকারের কাছে তুলে ধরেছে ব্যাংকটি। কিন্তু এ ব্যাপারে সরকারের তরফ থেকে আশানুরূপ সাড়া না পেয়ে বিশ্বব্যাংক এই প্রকল্পে ১২০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি বাতিল করে।
গত ২০ সেপ্টেম্বর সরকার নিচের বিষয়গুলোতে সম্মত হয়:
তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত যেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে তাদের ছুটিতে রাখা।
তদন্ত পরিচালনার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নেতৃত্বে একটি বিশেষ তদন্ত ও আইনি দল নিয়োগ দেওয়া।
তদন্তের সব তথ্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বৈদেশিক প্যানেলকে দেওয়া, যাঁরা প্রকল্পে সরকারের বিনিয়োগের স্বচ্ছতার ব্যাপারে বিশ্বব্যাংক ও সহ-অর্থায়নকারীদের পরামর্শ দেবেন।
এরপর বাংলাদেশ সরকার পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থায়নের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে বিশ্বব্যাংককে অনুরোধ জানায়।
বাংলাদেশে, বিশেষ করে পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির ব্যাপারে বিশ্বব্যাংকের উদ্বেগ এখনো আছে। এ কারণে আমরা এটি স্পষ্ট করেছি যে পদ্মা সেতু প্রকল্পে নতুন করে অর্থায়নের ক্ষেত্রে সবকিছু ঢেলে সাজাতে হবে, যাতে প্রকল্পের ক্রয়-সংক্রান্ত প্রক্রিয়ার ব্যাপারে বিশ্বব্যাংক ও সহ-অর্থায়নকারীরা আরও ভালোভাবে জানতে পারে।
কেবলমাত্র এসব বিষয়ের সন্তোষজনক বাস্তবায়ন এবং আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ প্যানেলের ইতিবাচক প্রতিবেদনের পরই বিশ্বব্যাংক এ প্রকল্পে অর্থায়নের ব্যাপারে অগ্রসর হবে।
বাংলাদেশের মানুষ একটি নির্ভেজাল সেতু চায়। আমাদের যদি সামনে এগোতে হয়, তাহলে বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের ওপর আমরা জোর দেব। যেকোনো প্রকল্পের বাস্তবায়ন এমনভাবে করতে হবে, যেখানে স্বচ্ছতা ও পর্যবেক্ষণ জোরদার করার বিষয়টি নিশ্চিত হবে।

গত ২০ সেপ্টেম্বর পদ্মা সেতু নিয়ে বিশ্বব্যাংক নিচের বিবৃতি দেয়
বিশ্বব্যাংক ২০১২ সালের ২৯ জুন পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পে ১২০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি বাতিলের ঘোষণা দেয়। বিশ্বব্যাংকের তদন্ত শাখা এর আগে এই প্রকল্পে আমাদের অর্থায়ন-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দুর্নীতির বিশ্বাসযোগ্য তথ্যাদির কথা বাংলাদেশ সরকারকে জানিয়েছিল। এই প্রকল্পের সঙ্গে বিশ্বব্যাংককে যুক্ত রাখতে বাংলাদেশ সরকারকে কয়েকটি শর্ত পূরণ করতে বলা হয়, এগুলো পূরণে সরকার ব্যর্থ হয়। এসব শর্তের মধ্যে ছিল—দুর্নীতির অভিযোগ ওঠা সরকারি কর্মকর্তাদের তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ছুটিতে পাঠানো, তদন্ত পরিচালনা করতে বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশনের নেতৃত্বে একটি বিশেষ তদন্ত দল গঠন, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিশেষজ্ঞ প্যানেলকে তদন্তের যাবতীয় বিষয়ে জানানোর ব্যাপারে সম্মত হওয়া এবং বিশ্বব্যাংক ও সহযোগী বিনিয়োগকারীদের প্রকল্পের খুঁটিনাটি পর্যবেক্ষণের সুযোগ দিতে সম্মত হওয়া।
আমাদের ঋণচুক্তি বাতিলের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকার এই চার শর্ত পূরণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে। বিশ্বব্যাংক যেসব দুর্নীতি চিহ্নিত করে তথ্যাদি দিয়েছে, সরকার এখন সেগুলোর ওপর গুরুত্বারোপ করতে শুরু করেছে। বিশ্বব্যাংক অনুধাবন করতে পারছে যে এই প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যেসব সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতিতে জড়িত থাকার অভিযোগ করা হয়েছিল, তাদের তদন্তকাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ছুটিতে পাঠানো হয়েছে এবং এ ঘটনার একটি পরিপূর্ণ ও নিরপেক্ষ তদন্তকাজ চলছে।
এসব শর্ত পূরণ করে বাংলাদেশ সরকার পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পে অর্থায়নের বিষয়টি পুনরায় বিবেচনার জন্য বিশ্বব্যাংককে অনুরোধ জানায়। নতুন করে ঋণচুক্তির ব্যাপারে সরকার পূর্বশর্ত হিসেবে কয়েকটি পদক্ষেপ নিতে সম্মত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—সেতু নির্মাণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নতুন করে ক্রয় নীতিমালা করা, যার মধ্যে জোরালো নজরদারি থাকবে; সেতুর নির্মাণকাজ হবে নির্ভেজাল এবং এতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে; সেতুর বিষয়ে তদন্তের বিষয় হবে পুরোপুরি নিরপেক্ষ, সরকারের তদন্তকাজ পর্যালোচনা করতে একটি স্বাধীন বৈদেশিক প্যানেলকে অনুমতি দিতে হবে, যারা বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের কাছে তাদের পর্যালোচনা প্রতিবেদন দেবে।
বিশ্বব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সহায়তায় বাংলাদেশ সরকারের সম্মত হওয়া শর্তগুলোর সন্তোষজনক বাস্তবায়নের ভিত্তিতে বিশ্বব্যাংক পদ্মা বহুমুখী সেতুতে পুনরায় অর্থায়নের ব্যাপারে সম্মত হয়েছে।
পদ্মা সেতু প্রকল্পে কোনো ধরনের দুর্নীতির আলামত দেখা যায় কি না, বিশ্বব্যাংক তার তদারকি অব্যাহত রাখবে এবং যেকোনো ধরনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে আমরা দৃঢ় সংকল্প। বাংলাদেশের জনগণ যারা সরকারি অর্থের স্বচ্ছ ব্যবহার, প্রকল্পের যথাযথ বাস্তবায়ন ও উন্নত মানের সেতু দেখতে চায়, পদ্মা সেতু নির্মিত হলে তারা বিশেষভাবে লাভবান হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

The Weeklydesh newspaper