শেখ হাসিনার নামে জমি কিনে পাশের মার্কেট দখল!

p alo

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামে একখণ্ড জমি কিনে তার পাশে প্রায় ৭০ লাখ টাকা দামের একটি মার্কেট দখল করেছেন শ্রমিক লীগের এক নেতা। এরপর সেখানে ‘কুতুবদিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়’ লেখা একটি সাইনবোর্ড তুলে দিয়েছেন।
এই নেতার নাম মনোয়ার ইসলাম ওরফে মুকুল (৪৫)। কক্সবাজারের সাগরদ্বীপ কুতুবদিয়া উপজেলা শ্রমিক লীগের সভাপতি তিনি। তাঁর বিরুদ্ধে মার্কেট দখলের অভিযোগ এনে তা উদ্ধারের জন্য গত সোমবার প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা এবং সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের কাছে আবেদন করেছেন মনজুর আলম (৪৫)।
মার্কেট-মালিক মনজুরের বাড়ি কুতুবদিয়ার বড়ঘোপ ছিন্নিখাইয়াপাড়ায়। সন্ত্রাসীদের ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকিতে কয়েক দিন ধরে তিনি কক্সবাজার শহরে অবস্থান করছেন। সাহায্য চাইছেন জেলা আওয়ামী লীগের নেতাদের। কিন্তু এগিয়ে আসছেন না কেউ।
শেখ হাসিনার নামে কুয়া নিবন্ধন: অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২ সেপ্টেম্বর কুতুবদিয়া সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ে উপজেলা পরিষদ গেটসংলগ্ন শূন্য দশমিক ০১২১ একর নাল (চাষাবাদ হওয়া জমি) ও খাই (কুয়া) শ্রেণীর জমি শেখ হাসিনার নামে নিবন্ধন করা হয়। দলিল নম্বর: ৭৫৫। দলিলে জমি ও টাকার পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছে, বড়ঘোপ মৌজার শূন্য দশমিক ০০৫৭ একর নাল জমি পাঁচ হাজার টাকা, শূন্য দশমিক ০০৩৬ একর বাড়ি এক লাখ ৯৩ হাজার টাকা ও শূন্য দশমিক ০০২৮ একর খাই (কুয়া) বাবদ দুই হাজার টাকাসহ মোট দুই লাখ টাকায় জমিটি কেনা হয়েছে বড়ঘোপ গ্রামের ছালামত উল্লাহর ছেলে আবদুল কাদিরের কাছ থেকে। দলিল গ্রহীতা হিসেবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনার নাম লেখা আছে। গ্রহীতার ছবির ঘরে শেখ হাসিনার ছবি থাকার কথা থাকলেও তা নেই।
নিবন্ধনের সত্যতা নিশ্চিত করে কুতুবদিয়া সাব-রেজিস্ট্রার এস এ রেজাউল করিম বলেন, ‘আদালত, সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নামে জমি কেনা হলে গ্রহীতার ছবি দরকার পড়ে না। জমিটি আওয়ামী লীগের কার্যালয় করার কথা বলে কেনা হয়েছে। এই কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি প্রযোজ্য হয়নি।’
প্রধানমন্ত্রী বরাবর পাঠানো চিঠিতে মনজুর আলম উল্লেখ করেন, ২১ সেপ্টেম্বর সকাল নয়টার দিকে শ্রমিক লীগের নেতা মনোয়ার দলবল নিয়ে আট শতক জমির ওপর পাঁচটি দোকান নিয়ে তৈরি তাঁর ৭০ লাখ টাকা দামের মার্কেট দখল করেন। একই সঙ্গে দেয়াল তুলে দোকানে ঢোকার পথ বন্ধ করে দেন। এরপর কুতুবদিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয় লেখা একটি সাইনবোর্ড তুলে দেন। এই ঘটনার প্রতিকার চাইতে গেলে মনোয়ার ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁর পেছনে সন্ত্রাসী লেলিয়ে দেন। ফলে তিনি কুতুবদিয়া ছাড়তে বাধ্য হন।
মনজুর আলম প্রথম আলোকে বলেন, মনোয়ার মার্কেটের উত্তর পাশে প্রায় এক শতকের একটি পরিত্যক্ত নাল ও কুয়া জমি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামে কিনেছেন। যাতে তিনি আশপাশের মূল্যবান জমি দখল করতে পারেন।
মনজুর আরও বলেন, আওয়ামী লীগের কার্যালয় করার জন্য জমি চাইলে আমি এমনিতেই দিয়ে দিতাম। আমার জমি দখল করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিতর্কিত করা হয়েছে।
আওয়ামী লীগের নেতারা অসহায়: মার্কেট দখলের ব্যাপারে জানতে চাইলে কুতুবদিয়া আওয়ামী লীগের সভাপতি ছৈয়দ আহমদ কুতুবী বলেন, মাত্র এক শতক জমিতে আওয়ামী লীগের কার্যালয় করা সম্ভব নয়। কার্যালয় নির্মাণের জন্য শেখ হাসিনার নামে জমি কেনার ব্যাপারে দলে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। মনোয়ারের একক সিদ্ধান্তে ওই জমি কেনা হয়েছে।
মার্কেট দখল প্রসঙ্গে ছৈয়দ আহমদ বলেন, পাঁচ বছর আগে দুবাই প্রবাসী মনজুর আলম ৫০-৬০ লাখ টাকা খরচ করে আট শতক জমির ওপর মার্কেটটি তৈরি করেন। এখন দলীয় কার্যালয়ের নামে সেটি দখল করায় সরকার ও দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। জমি কেনা ও মার্কেট দখলের সঙ্গে আওয়ামী লীগের কেউ জড়িত নন।
উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. নুরুচ্ছফা বলেন, ‘মার্কেট দখলের সময় আমি চট্টগ্রামে চিকিৎসাধীন ছিলাম। শুনেছি মনোয়ার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামে একখণ্ড জমি কিনেছেন। এ ব্যাপারে আমাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করেননি।’
মনোয়ারের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ: জেলা শ্রমিক লীগের সভাপতি হাবিবুর রহমান বলেন, মনোয়ারের বিরুদ্ধে সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকার নানা অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
মনোয়ারের বক্তব্য: কুতুবদিয়া শ্রমিক লীগের সভাপতি মনোয়ার আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘কুতুবদিয়ায় দলের কোনো কার্যালয় নেই। তাই নিজের টাকায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামে এক শতক জমি কিনেছি। যা করেছি সব দলের জন্য। ছোট করে হলেও দলীয় কার্যালয় তৈরি করব।’
জমি কেনার আগে কারও সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন কি না—জানতে চাইলে মনোয়ার অভিযোগ করেন, ‘আওয়ামী লীগের নেতারা টাকার বিনিময়ে বিক্রি হন। জেলা নেতাদের অবস্থা আরও খারাপ। তাঁরা ভালো পরামর্শ দেন না।’
কার্যালয় তৈরির আগে মার্কেট দখল প্রসঙ্গে মনোয়ার বলেন, ‘মনজুর অন্যের খতিয়ানভুক্ত জমিতে মার্কেট তৈরি করেছেন। তাঁর মার্কেটের কারণে আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে যাতায়াতের জন্য কোনো রাস্তা থাকবে না। তাই দলের কর্মীরা দেয়াল তুলে মার্কেটটি ঘিরে রাখেন। এরপর মনজুর নিজেই দোকানপাট বন্ধ করে চলে গেছেন। তাঁকে ভয়ভীতি বা হুমকি দেওয়া হয়নি।’
যোগাযোগ করলে কুতুবদিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল হাশেম বলেন, ‘মার্কেট দখলের ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কেউ কোনো অভিযোগ নিয়ে থানায় আসেননি।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

The Weeklydesh newspaper