চলে গেলেন প্রবীণ সাংবাদিক আতাউস সামাদ

Ataus-Samad


ঢাকা:
 প্রবীণ সাংবাদিক আতাউস সামাদ (৭৫) মারা গেছেন (ইন্নালিল্লাহি…রাজিউন)। রাজধানীর অ্যাপোলো হাসপাতালের পোস্ট অপারেটিভ কক্ষে লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। বুধবার রাত ৮টার দিকে তিনি শেষ নিঃস্বাস ত্যাগ করেন বলে হাসপাতাল সূত্র জানায়।

হাসপাতালে রয়েছেন সাংবাদিক কাদের গনি চৌধুরী। তিনি বলেন, আতাউস সামাদের মৃত্যুর বিষয়টি তারাও জেনেছেন। চিকিৎসকরা তার সন্তান ও আত্মীয় স্বজনদের ডেকে পাঠিয়েছেন কিছুক্ষণের মধ্যেই আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত্যুর কথা জানানো হতে পারে।

গত রোববার সাংবাদিক আতাউস সামাদের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে অ্যাপেলো হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতাল সূত্র জানায়, সংকটাপন্ন অবস্থায় থাকা আতাউস সামাদকে বুধবার ১০ ব্যাগ রক্ত দেওয়া হয়।

মঙ্গলবার দীর্ঘ সময় ধরে অস্ত্রোপচার করে তার বাঁ পা হাঁটু থেকে কেটে বাদ দেওয়া হয়।

দৈনিক আমার দেশের উপদেষ্টা সম্পাদক আতাউস সামাদ দীর্ঘ সময় বিবিসি’র বাংলাদেশ সংবাদদাতা ছিলেন। বেসরকারি টেলিভিশন এনটিভি’র প্রধান নির্বাহীর দায়িত্বও পালন করেন তিনি। এছাড়া দীর্ঘ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের খণ্ডকালীন শিক্ষক ছিলেন।

১৯৩৭ সালের ১৬ নভেম্বর ময়মনসিংহ জেলায় তিনি জন্মগ্রহণ করেন।

অবক্ষয়ী কালের কবলে দেশ : আতাউস সামাদ

মাত্র চল্লিশ বছরের মধ্যে কত যে বদলে গেল বাংলাদেশ! একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বরে পাকিস্তানি দখলদাররা যখন আত্মসমর্পণ করল, তখন কি শুধুই ভেবেছি যে, তাদের চরম নৃশংসতার হাত থেকে এবার রেহাই পেলাম? পাকিস্তানি বর্বর সৈন্যরা বাংলাদেশে যেভাবে নারী-পুরুষ, শিশু-তরুণ-বৃদ্ধ-বৃদ্ধা বাছ-বিচার না করে গণহত্যা চালিয়েছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের নয়টি মাস, বিশ্বের ইতিহাসে সেরকম জঘন্য দৃষ্টান্ত খুব কমই আছে। তাই তাদের হাত থেকে সাড়ে সাত কোটি লোক মুক্ত হয়ে নতুন করে জীবন ফেরত পাওয়া যেমন ছিল এক ঐতিহাসিক ও বিরল ঘটনা, তেমনি তা ছিল যুগপত্ভাবে বাঁধনহারা আনন্দ ও গভীর স্বস্তির বিষয়। কিন্তু সেদিন নিরেট অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এসে আমরা কি কেবলই আলোর জোয়ারে গা ভাসিয়েছিলাম?

না, তা নয়। আমরা সেদিন স্বপ্নও দেখেছিলাম। আমরা অবশ্যই মনে করেছিলাম যে, সেনাদের গুলি এবং অপশাসকের পদলেহী গুণ্ডাপাণ্ডাদের পেশিশক্তি দিয়ে বাংলাদেশ শাসিত হবে না আর কোনোদিন। বাংলাদেশ চলবে সভ্যতার পথ ধরে। এদেশে সবার বাঁচার সমান অধিকার থাকবে, প্রাণের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা থাকবে। আরও থাকবে চিন্তার স্বাধীনতা এবং খোলামেলাভাবে মনের ভাব প্রকাশ করার অধিকার। তৈরি হবে মত ও যুক্তি বিনিময় করার অবাধ ও সুষ্ঠু পরিবেশ। সর্বোপরি দেশের যা সম্পদ আছে, তা সব নাগরিকের উপকারের জন্য সমানভাবে কাজে লাগিয়ে এমন এক অর্থনীতির বুনিয়াদ তৈরি করা হবে, যে অর্থনীতিতে সবার জন্য দু’মুঠো ভাতের ব্যবস্থা থাকবেই, পরিশ্রম করতে পারলে উপার্জন নিশ্চিত হবেই এবং প্রতিটি নাগরিকের জন্য নিজ নিজ ভাগ্যোন্নয়নের সমান সুযোগ থাকবে। দেশে মানুষে মানুষে জন্মগত, শ্রেণীগত, জাতিসত্তাগত এবং ধর্মবিশ্বাসজনিত ভেদাভেদ থাকবে না।

এক্ষেত্রে আমাদের খুব পরিষ্কারভাবে জানা ছিল যে, পাকিস্তানিরা বাংলার মানুষকে শোষণ করে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে, সরকারি চাকরি থেকে বঞ্চিত করে সামাজিক ক্ষেত্রে এবং সব সুযোগ কুক্ষিগত করে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে যে বিশাল বৈষম্যের সৃষ্টি করেছিল, বাঙালিরা তা দূর করার দাবি তোলায় এবং তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফা সনদ ঘোষণার ফলে সেই দাবি এক অভাবনীয় শক্তিশালী গণ-আন্দোলনের রূপ নেয়ার ফলেই শেষ পর্যন্ত আমাদের ওপর এক অন্যায্য ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ নিপতিত করা হয়েছিল। তাই স্বাধীনতা ও মুক্তি অর্জনের দিনে আমরা ভেবেছি যে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও গোষ্ঠীগত বৈষম্য থাকবে না। আমরা মনে করেছিলাম, দারিদ্র্য রাতারাতি দূর না করা গেলেও দরিদ্রতার ক্ষতচিহ্নগুলো একে একে মুছে ফেলা হবে দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে ও নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে। আমরা ভেবেছিলাম, ধর্মের নামে আর বিভেদ সৃষ্টি হবে না।

আমরা মনে করেছিলাম, শহরের ‘মানুষ’ আর গ্রামের ‘লোক’ হিসেবে আলাদাভাবে কাউকে বিবেচনা করা হবে না। সবাই বাংলাদেশী হিসেবে একই মর্যাদা পাবেন। এই কথাটা বেশি করে ভেবেছিলাম এজন্য যে, মুক্তিযুদ্ধে বাংলার পল্লীবাসীরা বিশাল অবদান রেখেছিলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে সংখ্যায় বেশি ছিলেন গ্রামের যুবকরা। হানাদার পাকিস্তানি ও তাদের বাংলাভাষী দোসরেরা শহরে যেমন বাড়ি বাড়ি হানা দিয়ে তাদের চোখে সন্দেহভাজন পাক-বিরোধীদের এবং নগর-গেরিলাদের ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করেছে, তেমনি গ্রামে তারা অসংখ্য বাড়িঘর ও বহু হাটবাজার পুড়িয়ে দিয়েছে এবং গণহত্যা চালিয়েছে। কাজেই মুক্তিযুদ্ধ যেহেতু দেশের সবাইকে এক কাতারে নিয়ে এসেছিল স্বাধীনতা অর্জনের পর বাংলাদেশে নগর ও পল্লীর মধ্যে বৈষম্য থাকবে না বা শহুরে তথা ‘নাগরিক’ এবং ‘গেঁয়ো’—এরকম শ্রেণীবিভেদ থাকবে না এটা তো স্বতঃসিদ্ধ হওয়ার কথা।

কিন্তু অতীব পরিতাপের বিষয় যে, মুক্তিযুদ্ধের সময় এবং তারও আগে স্বাধীনতা সংগ্রামের পটভূমি রচিত হওয়ার সময় আমরা এরকম যেসব সুন্দর স্বপ্ন দেখেছিলাম, সেগুলো বাস্তবে রূপান্তরিত হয়নি। আমরা তার বদলে পেয়েছি প্রথমে এক নায়কতন্ত্র ও একদলীয় শাসন, তারপর সেনাশাসন এবং অবশেষে প্রতিশ্রুতিভঙ্গকারীদের অপশাসন থেকে অসহনীয় দুঃশাসনে ক্রমাবতরণ। এখন গণতন্ত্রের নামে চলছে স্বেচ্ছাচার। একদিক থেকে যদিও আমাদের সৌভাগ্য যে, আমরা এখনও একটা সংবিধানের কথা বলতে পারি তবু সে সংবিধানটি শুধু সামরিক শাসনের ফরমানে নয়, তারও আগে ও পরে জাতীয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠদের হাতে এমনভাবে পরিবর্তিত হয়েছে যে, তাতে প্রকৃত গণতন্ত্রের লেবাসটুকুও থাকেনি। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি চোখের পলকে চতুর্থ সংশোধনী পাস করে একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করা ছিল কোনো রাখঢাক ছাড়া ডিক্টেটরশিপ প্রবর্তন করা। আর এখন সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করে সংসদ নির্বাচনের সময় নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা তুলে দিয়ে এবং একই সঙ্গে জাতীয় সংসদ বহাল রেখে তার অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার এক অগণতান্ত্রিক ও উদ্ভট প্রক্রিয়া চালু করে বর্তমানের দুঃশাসকদের ক্ষমতায় চিরকাল অধিষ্ঠিত থাকার ব্যবস্থা কায়েম করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার ঘনিষ্ঠজনরা হয়তো মনে করছেন যে, তারা ভোট হওয়ার একটা প্রক্রিয়া দিয়ে রেখেছেন বলে মানুষ মনে করবে যে দেশে গণতন্ত্র আছে। তারা ভুল করছেন। মানুষ ঠিকই জেনে গেছে যে, তাদের সামনে যা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে তা গণতন্ত্রের একটা ছেঁড়াখোঁড়া পরিত্যক্ত লেবাস। যা তারা বুঝতে চাচ্ছেন না, তা হলো বাংলার মানুষ তাদের ধোঁকাবাজি ধরে ফেলেছে এবং তারা প্রতারিত হতে আর রাজি নয়।

একই সময়ে আমরা এও দেখছি কৃষকদের অবজ্ঞা করা হচ্ছে, যে গ্রাম থেকে লাখ লাখ লোক বিদেশে গিয়ে শ্রমিক হিসেবে কাজ করে শ’ শ’ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য চালু রেখেছেন ও বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডারে স্থিতি বজায় রাখতে অমূল্য অবদান রাখছেন তাদের সেই গ্রাম আজও অবহেলিত, তাদের সন্তানরা স্কুলে যায় বাঁশের সাঁকো পেরিয়ে। যত আলো জ্বলে তা সব রাজধানী শহর ঢাকায়, যত অট্টালিকা আর পেটমোটা গাড়ি তা চলে ঢাকায়। এসব দেখে মনে হয় স্বাধীনতাপূর্ব বৈষম্য যেন ফেরত এসেছে প্রতিহিংসা নিতে। মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার রক্ষার জন্য যে মহান ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে স্বাধীনতা সংগ্রামের শুরু, সেই বাংলা ভাষার মাধ্যমে যে সমৃদ্ধ সংস্কৃতির জন্ম হয়েছিল, তা এখন ধুঁকছে। অন্যের গরুর দুধ থেকে তৈরি সর খেয়ে যারা মোটাতাজা হচ্ছে, তারা সংস্কৃতিবান হওয়ার লক্ষ্যে বিদেশে দীক্ষা নিতে ছুটছে।

যারা দেশে পড়ে থাকছে, তাদের মধ্য থেকে ধন ও বলে শক্তিমান হতে ইচ্ছুকরা অনায়াসে আলিঙ্গন করছে দুর্নীতি ও দুষ্কৃতিকে। এই সম্পদ অনুসন্ধান ও শক্তি অর্জনের প্রতিযোগিতা এতটাই ভয়াবহ রূপ নিয়েছে যে, মন্ত্রিসভা পরিণত হয়েছে দেশের সবচেয়ে লোভনীয় বাজারে। আর এই সরকার মূল্যস্ফীতি উসকিয়ে দিয়ে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের জীবিকা নির্বাহ অসহনীয় করে তুলে তাদের বাধ্য করছে হয় বখশিশ চাইতে, না হয় ঘুষ দাবি করতে। ক্ষমতাসীনদের কথাবার্তায়ও নেই আইনের প্রতি কোনো শ্রদ্ধা। এক ব্রিটিশ বিচারপতি লিখেছেন, আইনের শাসন একটা দেশকে সভ্য বলে পরিচিত করে, মানবাধিকার ও গণতন্ত্র নিশ্চিত করে এবং সরকারকে দায়িত্বশীল করে। সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী ও বিএনপি নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী একথা বললেন ‘ম্যাব’ (এমবিএ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ) আয়োজিত সভায় গত রোববার। এই উক্তির আলোকে বাংলাদেশে আইনের শাসন কোনকালে ছিল, তা পরীক্ষা করলে হয়তো কোনো শাসন আমলই পাস করতে পারবে না। বর্তমানেরটি তো নয়ই।

এসব কথা দেশের অধিকাংশ মানুষই জানেন ও বোঝেন। বিদেশিরাও তা বলতে শুরু করেছেন। আজ আবার একথাগুলো মনে পড়ল ম্যাব আয়োজিত ‘কেমন বাংলাদেশ চাই’ আলোচনা সভায় আমন্ত্রিত হয়ে। একইসঙ্গে কষ্ট পাচ্ছি ও চিন্তিত হচ্ছি এই উপলব্ধি থেকে যে, স্বপ্ন দেখার বাংলাদেশ পাওয়ার জন্য যে চিন্তাশীল ও নীতিবান নেতৃত্ব, যা প্রকৃতপক্ষে দলীয় পরিচয় অতিক্রম করে গেছে এবং তাদের চিন্তার স্ফুলিঙ্গ থেকে মশাল জ্বেলে যে নিঃস্বার্থ দেশপ্রেমিক যুবকরা অকুতোভয়ে সংগ্রামে নেমেছিল ও অকাতরে জীবন দিয়েছিল, তেমন নেতৃত্ব ও তেমন তরুণ যোদ্ধারা এই মুহূর্তে দৃশ্যমান নয়। চট করে যে তাদের পাওয়া যাবে, ততটা আশাবাদী হতেও পারছি না। তার কারণ বর্তমান কালটা অবক্ষয়ী।
(সূত্র: আমার দেশ,৩১/০৭/১২)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

The Weeklydesh newspaper