হলমার্ক গ্রুপের অর্থ জালিয়াতি: ব্যাংকগুলোর অনিয়মে ক্ষুব্ধ গভর্নর

atiur


ব্যাংকগুলোর অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণে চরম অসন্তোষ এবং ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান। গত সোমবার ও মঙ্গলবার দু’দিনে তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বেশ কয়েক দফা বৈঠক করেন। এতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নররা, নির্বাহী পরিচালকসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।বৈঠক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, এ সময় গভর্নর ড. আতিউর রহমান ব্যাংকগুলোর অনিয়ম বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনকালে ধরা পড়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে নির্দেশ দিয়েছেন। কেন সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষাতে বিষয়টি উঠে আসছে না তাও দেখার কথা বলেন তিনি। পরে কেউ যদি তথ্য গোপন করতে কাজ করেন, তারা কারা তাদের খুঁজে বের করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেন আরো কঠোর অবস্থান নেয়, সে ব্যাপারেও বলেছেন গভর্নর।

প্রয়োজনে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সহায়তা নেওয়ার কথাও বলেন গভর্নর। সূত্র জানায়, গভর্নর এ সময় বলেন, যারা রাষ্ট্রায়াত্ব ব্যাংকগুলো লুটপাট করছে তাদের চিহ্নিত করা হবে। তাদের চিহ্নিত করে আইনের কাছে তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক এএফএম আসাদুজ্জামান বাংলানিউজকে জানান, সম্প্রতি রাষ্ট্রায়ত্ব সোনালী, জনতা, কৃষি ব্যাংকসহ বেসরকারি বেশ কিছু ব্যাংকে অনিয়মের বেশ বড় তথ্য বেরিয়ে এসেছে। রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকগুলোর যেখানে অনুসন্ধান করা হচ্ছে ব্যাপক অনিয়ম ধরা পরছে। এভাবে চলতে দেওয়া যায় না। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো ধরনের অনিয়মকে প্রশ্রয় দেবে না। কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যাদের বিরুদ্ধে প্রমাণ মিলবে তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সম্প্রতি রাষ্ট্রায়ত্ব সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও কৃষি ব্যাংকসহ বেশ কিছু বেসরকারি ব্যাংকের অনিয়ম ও দুর্নীতির ব্যাপক খবর সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

সোনালী ব্যাংক থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে হলমার্ক গ্রুপের অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় ব্যাংকের সাবেক এমডি হুমায়ুন কবিরসহ ৩৮ কর্মকর্তার জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়েছে ব্যাংক নিযুক্ত বহিঃনিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশে সোনালী ব্যাংক এ বিষয়ে নিরীক্ষার (অডিট) জন্য হুদা ভাসি চৌধুরী অ্যান্ড কোম্পানিকে নিযুক্ত করে। ওই প্রতিষ্ঠান গত সোমবার সোনালী ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের কাছে তাদের অডিট রিপোর্ট জমা দিয়েছে। দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, অডিট প্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষায় ব্যাংকের রূপসী বাংলা (সাবেক শেরাটন) শাখা থেকে হলমার্কসহ ৬টি প্রতিষ্ঠানের ৩ হাজার ৫৪৭ কোটি টাকা আত্মসাতের সঙ্গে প্রধান কার্যালয়, নিয়ন্ত্রণকারী জিএম অফিস ও সংশ্লিষ্ট শাখার মোট ৩৮ কর্মকর্তার সম্পৃক্ত থাকার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকে গতকাল মঙ্গলবার ওই রিপোর্টটি জমা দিয়েছে সোনালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত ও সোনালী ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষায়ও এসব কর্মকর্তার জড়িত থাকার তথ্য ছিল। ব্যাংকের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে হলমার্ক গ্রুপের বিরুদ্ধে ২ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এসেছে । স্বল্প পরিচিত এই ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর কর্ণধার তানভীর মাহমুদ। ভুয়া এলসির বিপরীতে ঋণ প্রদান এবং বিল ক্রয় করে হলমার্ক গ্রুপকে ওই পরিমাণ টাকা দিয়েছে রূপসী বাংলা শাখা। আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অনিয়মের মাধ্যমে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা নিয়েছে। সব প্রতিষ্ঠানই ব্যাংকের কাছে তাদের দায় স্বীকার করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুরোধে দুদক এখন বিষয়টি তদন্ত করছে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী বলেন, সোনালী ব্যাংকের অর্থ আত্মসাতের বিষয়ে বহিঃনিরীক্ষকের রিপোর্ট তারা পেয়েছেন। এই অর্থ আত্মসাতের বিষয়ে এখনও পুরো তদন্ত কাজ শেষ হয়নি। বিষয়টি সুরাহা করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সোনালী ব্যাংককে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছে। জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তি দিতে ব্যাংককে আগেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। পুরো তদন্ত কাজ শেষ হলে পরবর্তী নির্দেশনা দেওয়া হবে।
যাদের নাম এসেছে: অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংকের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হুমায়ুন কবিরকে তার দায়িত্বে অবহেলা কিংবা প্রভাব বিস্তারের কারণে শাখা কর্মকর্তারা অনিয়মের সুযোগ পেয়েছেন। এ ছাড়া ঘটনার জন্য দায়ী হিসেবে তৎকালীন শাখা ব্যবস্থাপকের দায়িত্বে থাকা এ.কে.এ. আজিজুর রহমান (ডিজিএম), উপ-ব্যবস্থাপক মো. সাইফুল হাসান (এজিএম), নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবদুুল মতিন, সিনিয়র অফিসার মিহির চন্দ্র মজুমদার, উজ্জ্বল কিশোর ধর, মো. ওয়াহিদুজ্জামান, কর্মকর্তা মো. উকিল উদ্দিন আহম্মেদ ও মো. সাইদুর রহমানের সম্পৃক্ততা ছিল। এ ছাড়া অডিট রিপোর্টে রূপসী বাংলা শাখা নিয়ন্ত্রণকারী জিএম অফিসের দায়িত্বে থাকা জিএম মীর মহিদুর রহমান ও ননীগোপাল নাথ, উপ-মহাব্যবস্থাপক আনম হেদায়েত উল্লাহ ও সবিতা সিরাজ, সহকারী-মহাব্যবস্থাপক গোলাম নবী মলি্লক ও আশরাফ আলী পাটোয়ারি এবং সিনিয়র নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ওয়াহিদ উদ্দিন আহমেদের নাম এসেছে। অন্যদিকে ঘটনার সময় প্রধান কার্যালয়ের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অর্থায়ন, ভিজিলেন্স অ্যান্ড কন্ট্রোল বিভাগের দায়িত্বে থাকা ব্যাংকের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী ফখরুল ইসলাম (বর্তমানে বেসিক ব্যাংকের এমডি), মো. আতিকুর রহমান ও মো. মইনুল ইসলাম, মহাব্যবস্থাপক নওশের আলী খোন্দকার ও মো. মাহবুবুল হক, উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. মুছা ও শেখ আলতাফ হোসেন, সহকারী-মহাব্যবস্থাপক মো. সফিজ উদ্দিন আহমেদ এবং জ্যেষ্ঠ নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সোহরাব হোসেনকে দায়ী করা হয়েছে। প্রধান কার্যালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা বিভাগের দায়িত্বে থাকা উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুশতাক আহমেদ ও মইনুল হক, মহাব্যবস্থাপক মো. মোস্তাফিজুর রহমান ও আলী হোসেন খান, উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. আহসান উল্লাহ ও আজিজুন্নাহার, সহকারী মহাব্যবস্থাপক বিজন কুমার পাল, আবুল বাশার মিজি, দেলোয়ার হোসেন আব্বাসী ও আনোয়ার হোসেন খান ছাড়াও প্রধান কার্যালয়ের উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. মোরশেদ আলম খোন্দকার, এজিএম আবদুুল মোমিন পাটোয়ারি, শ্যামল কান্তি নাথ ও মো. শাহজাহানকে এ ঘটনায় দায়ী করা হয়েছে।
অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষায় আ.ন.ম. মাসরুল হুদা সিরাজীর (জিএম) নাম থাকলেও বহিঃনিরীক্ষকের অডিট প্রতিবেদনে তার নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। রূপসী বাংলা শাখার অনিয়মের বিষয়টি জানার পর জিএমদের মধ্যে তিনিই প্রথম তদন্তের উদ্যোগ নেন। এর পর তাকে বদলি করে প্রথমে সিলেট ও কুমিল্লা জেলার দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরবর্তীতে আবার বদলি করে রংপুর অফিসে পাঠানো হয়।
এসব বিষয়ে ব্যাংকের তৎকালীন এমডি মো. হুমায়ুন কবীর বলেন, ব্যক্তিগত জীবনে তিনি অত্যন্ত সৎ মানুষ। কখনো কোনো অনিয়মকে প্রশ্রয় দেননি। রূপসী বাংলা শাখায় অনিয়মের সঙ্গেও তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তিনি বলেন, শাখার মাধ্যমে এসব অনিয়ম হয়েছে। সে সময় কী হয়েছে তা সে সময়ে দায়িত্বে থাকা শাখা ব্যবস্থাপক জানেন। ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা মোতাবেক দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সামনেও যখন যে নির্দেশনা আসবে তা পরিপালন করা হবে। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার দায়ে এরই মধ্যে ব্যাংকের পক্ষ থেকে রূপসী বাংলা শাখার ব্যবস্থাপক এ.কে.এ. আজিজুর রহমান (ডিজিএম) ও উপ-ব্যবস্থাপক মো. সাইফুল হাসানকে (এজিএম) সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। সে সময়ে এমডির দায়িত্বে থাকা হুমায়ুন কবিরসহ বেশ কয়েক জন এরই মধ্যে অবসরে গেছেন। এ ছাড়া অনেক কর্মকর্তাকে বিভিন্ন স্থানে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছে। অভিযুক্ত সব কর্মকর্তাকে আত্মপক্ষ সমার্থনের সুযোগ দেওয়া হবে। লিখিতভাবে দায়িত্বে অবহেলার সুনির্দিষ্ট কারণ ব্যাখ্যা করতে বলা হবে। কোনো কর্মকর্তা কারণ ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থ হলে তাকে চাকরিচ্যুতসহ বড় ধরনের শাস্তি দেওয়া হবে। এ ছাড়া বিষয়টি দুদক যেহেতু তদন্ত করছে, তারাও এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে।
রূপসী বাংলা শাখার অনিয়ম বিষয়ে একটি অভিযোগের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথমে গত মার্চ মাসে ওই শাখায় তদন্ত চালায়। তদন্তে বড় অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হয়। তবে ব্যাংকের পক্ষ থেকে তদন্ত কাজে অসহযোগিতার কারণে অনিয়মের ধরন ও কত টাকার অনিয়ম হয়েছে, তা বের করা কঠিন হয়ে পড়ে। এর পর ব্যাংকের পক্ষ থেকে ওই শাখায় নিরীক্ষা চালাতে বলা হয়। সেখানে এসব বিষয় উঠে আসে। পরবর্তীতে বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের সেই তদন্ত প্রতিবেদন এবং ব্যাংকের নিরীক্ষা প্রতিবেদন অধিকতর তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দুদকে পাঠায়।
দুদককে দেওয়া চিঠিতে বলা হয়, হলমার্কসহ ৬টি প্রতিষ্ঠানের মালিক ও ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশে জালিয়াতির মাধ্যমে সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখা থেকে ৩ হাজার ৫৪৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। ঘটনা সংঘটিত হওয়ার সময় ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক থেকে শাখা পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী বেশ কিছু কর্মকর্তা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত। ওই প্রতিবেদনে যেসব ব্যক্তির নাম এসেছে তারা আসলেই এই অর্থ আত্মসাতে সহযোগিতা করেছে কিনা  সে বিষয়ে প্রফেশনাল অডিট ফার্ম দিয়ে নিরীক্ষা করতে সোনালী ব্যাংককে নির্দেশ দেওয়া হয়। সে মোতাবেক ব্যাংকটি হুদাভাসি নামে একটি অডিট ফার্ম দিয়ে এই নিরীক্ষা করিয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

The Weeklydesh newspaper