বঙ্গবন্ধু : রাজনীতির অমর কবি

mujib


আবদুল্লাহ-হারুন-জুয়েল: শৈশব থেকে বঙ্গবন্ধু আমার জন্য শিহরণ জাগানো এক মহানায়কের নাম। এ উপলব্ধির মূল কারণ আমার বাবা-মা, বিশেষভাবে আমার মা। উল্লেখ্য তারা রাজনীতি-সংশ্লিষ্ট নয়। বঙ্গবন্ধুর কথা শুনলে আমি এত বেশী আবেগ-প্রবণ হয়ে যেতাম যে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের হত্যা করার সুযোগ পেলে হয়তো তাই করতে দ্বিধা করতাম না। কলেজে ভর্তি হবার পর প্রথম জানলাম আমাদের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জন্মদিন ১৫ই আগস্ট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর ১৫ই আগস্ট যখন দেখলাম ইডেনের হেলেন জেরিন খান দলবলসহ নৃত্য করতে করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে, যতটা ক্ষুব্ধ হয়েছিলাম, ততটা অসহায় বোধ করছিলাম।

বঙ্গবন্ধু : রাজনীতির অমর কবি যার প্রতিশব্দ শুধু একটি – বাংলাদেশ

বঙ্গবন্ধু কোন দলীয় ব্যক্তি নন, তিনি কোন দলের নয়, তিনি ১৬ কোটি জনতার। বাংলার কৃষক, মজুর, আমলা সাংবাদিক থেকে বিশ্বের রাষ্ট্রপ্রধান – সকলের জন্য যার দরজা উন্মুক্ত ছিল তিনি বঙ্গবন্ধু। বিশ্বে এমন কতটি দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যাবে আমি জানি না! পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের নাগরিকদের মধ্যে শাসকরা যে মর্যাদার পার্থক্য তৈরি করেছিল সেই বৈষম্য বা শোষণের বিরুদ্ধে কথা বলতে বঙ্গবন্ধুর যাদুময়ী ক্ষমতা আওয়ামী লীগকে একক ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী করে তোলে। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের প্রতি শুধু আপামর জনগণ নয় বয়োজ্যেষ্ঠ হয়েও মাওলানা ভাসানী কখনোই বঙ্গবন্ধুর কোন পদক্ষেপের বিরুদ্ধাচরণ করেন নি। এসব ইতিহাসই সকলের জানা, কিন্তু কিছু বিষয় ভাবলে খুব অবাক হতে হয় কি ঐশ্বরিক ক্ষমতায় তিনি বলীয়ান ছিলেন যা তাঁকে অনন্য ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী করে তোলে!

• স্বাধীনতার তিন মাসের মধ্যে তিনি মিত্র-বাহিনী ফেরত পাঠান যার দৃষ্টান্ত ইতিহাসে নেই।
• যুদ্ধ-বিধ্বস্ত বাংলাদেশে তিনি তিন বছরে যেভাবে বাংলাদেশকে গড়ে তুলেছেন তার তথ্য-উপাত্ত ও সংশ্লিষ্ট উপাদানের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে নিশ্চিত করে বলা যায় বঙ্গবন্ধু-সরকারের সমকক্ষ কেউ হতে পারবে না।
• ভারতের সহায়তার জন্য যতটা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ প্রয়োজন ছিল তা তিনি প্রতিবেশী বন্ধু-প্রতিম দেশ হিসেবেই সীমাবদ্ধ রেখেছেন। প্রশাসনিক সংস্কার ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের সহায়তার প্রস্তাব উপেক্ষা করেছেন, ওআইসি, জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন।
• সকল রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ফিদেল ক্যাস্ট্রো, সাদ্দাম হোসেন সহ সকল রাষ্ট্রের সাথে স্বকীয়তা নিয়ে বাংলাদেশকে আত্মনির্ভরশীল দেশ হিসেবে তুলে ধরেছেন।
• উপজাতিদের বাঙালি জাতিসত্তা নিয়ে সৃষ্ট বিরোধের কথা অনেকেই বলে থাকেন কিন্তু বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায় তো উপজাতিরা কোন বিরুদ্ধাচরণ বা আন্দোলন করেনি!
• বঙ্গবন্ধু যুদ্ধাপরাধীদের সাধারণ ক্ষমা করেছেন। সাধারণ ক্ষমা তাদের জন্য প্রযোজ্য ছিল – যারা নৈতিকভাবে স্বাধীনতা চায় নি বা পরিস্থিতির কারণে পাকিস্তানীদের সহায়তা বা সমর্থন করেছে। কিন্তু সুস্পষ্টভাবে যাদের বিরুদ্ধে হত্যা, লুটপাট ও ধর্ষণের অভিযোগ ছিল তারা এর আওতাধীন ছিল না। এ বিচার প্রক্রিয়া ১৯৭৫ এর ১৫ই আগস্ট পর্যন্ত চলমান ছিল।
• এমন কি কোন দৃষ্টান্ত আছে যে কেউ বঙ্গবন্ধুর কাছে গিয়েছে কিন্তু কোন সহায়তা পাওয়া ছাড়া ফিরে এসেছে!
• এটা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের অসাধারণ ক্যারিশমা যে নির্দেশ মাত্র মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র জমা দিয়েছে। যুদ্ধ-পরবর্তী যেকোনো দেশে কয়েক বছর অরাজকতা চলে যার উদাহরণ ইতিহাসে দেখা যায়।
• ১৯৭২ এর ১০ জানুয়ারি থেকে যে চক্রান্ত শুরু হয় সব উপেক্ষা করে বিশেষ কোন নিরাপত্তা ছাড়াই তিনি জীবন-যাপন করেছেন। বাংলার মানুষের প্রতি তাঁর এতটা আস্থা না থাকলে হয়তো ১৫ই আগস্টের ঘটনাই ঘটতো না।

১৫ই আগস্টের ইন্ধন-দাতা বাঙালিদের বা ঘাতকদের কি বিবেকে এতটুকু বাধে নি? কি অপরিসীম সাহস নিয়ে বন্দুকের সামনে প্রাণ ভিক্ষা না চেয়ে বঙ্গবন্ধু আক্রমণকারীদের নির্দেশের সুরে প্রশ্ন করেছেন, “তোমরা কারা?” বন্দুকধারী হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে যেন মূর্তি হয়ে যায়। আরেক ঘাতক এসে কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালীকে হত্যা করে; পরাধীনতার ২৪ বছরের প্রতিশোধ নেয়া হয় ২৪টি বুলেট দিয়ে।

আমরা কি অকৃতজ্ঞ?

আমাদের বা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পূর্ববর্তী প্রজন্ম তাদের দায়বদ্ধতা এড়াতে পারবে না।
• যে বাঙালি অস্ত্র ধরে শক্তিশালী শাসককে পরাভূত করেছে – কোথায় ঢাকা পড়ে গিয়েছিল তাদের সাহস!
• যারা বঙ্গবন্ধুর হত্যার সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল তারা কি করে অমানুষের মতো এ হত্যায় ইন্ধন দিল বা সম্পৃক্ত হল?
• এদেশে আওয়ামী লীগ-বিরোধী জাতীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত কোন নেতা বঙ্গবন্ধুর উপকার বা সহায়তা অস্বীকার করতে পারবে? তারা যখন বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কটূক্তি করে, বঙ্গবন্ধুর অবদানকে অস্বীকার করে, তখন কি তারা নিজেদের পশু প্রমাণ করেনা?

ষড়যন্ত্রকারীদের ব্যক্তিগত জীবনে কি ঘটে সৃষ্টিকর্তা সেই দৃষ্টান্তও আমাদের জন্য রেখেছেন। খন্দকার মোশতাক কি শেষ জীবনের একটি রাত ঘুমাতে পেরেছিল?

প্রসঙ্গ আমার ও বেগম জিয়ার জন্মদিন:
১৫ই আগস্ট আমার জন্ম। অনেক আকাঙ্ক্ষিত পুত্র সন্তান লাভের আনন্দ বোধ হয় সেদিন অনেক ম্লান হয়ে গিয়েছিল সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সংবাদে। আমার জন্মদিন বেগম জিয়ার মতো বানোয়াট নয়। আমার জন্মদিন কখনো পালিত হয়নি। আমার বিবেকও জন্মদিন পালনে সায় দেয় নি।
বেগম খালেদা জিয়ার এযাবৎ কয়েকটি জন্ম তারিখ পাওয়া গেছে।
• ৫ আগস্ট, ১৯৪৪ ( ম্যারেজ সার্টিফিকেট অনুসারে।)
• ৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৪৬ ( স্কুলের নম্বর-পত্রে)
• ১৯ আগস্ট, ১৯৪৭ (প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ গ্রহণ)
• ১৫ই আগস্ট, ১৯৪৭ (নির্বাচনে প্রার্থিতার আবেদনপত্রে)

কোনটি সত্য তিনি নিজেই হয়তো জানেন না। ব্যক্তিগত/পারিবারিকভাবে বঙ্গবন্ধু যে সহায়তা করেছেন সে প্রসঙ্গ অপ্রকাশিতই থাকুক কিন্তু দেশের প্রতি বঙ্গবন্ধুর অবদান ভুলে গেলেন? এদেশের আপামর জনগণ আওয়ামী লীগের সমর্থক না হলেও বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাদের অকৃত্রিম শ্রদ্ধা রয়েছে। একজন প্রধানমন্ত্রীর বা একটি অন্যতম বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের প্রধান হিসাবে বানোয়াট একটি জন্ম তারিখ লিখতে কি বিবেকে বাধে নি? তিনি এমন একটি তারিখ বেছে নিলেন যেদিন ইতিহাসের নারকীয় হত্যাকাণ্ড ঘটে, যেদিন দেশের প্রতিষ্ঠাতা ও জাতির জনককে হত্যা করা হয়। পাকিস্তান ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে, জন্ম তারিখ নির্ধারণের নেপথ্যে এ কারণ রয়েছে কিনা জানি না!

বাংলাদেশের কোন জাতীয় নেতা বা ব্যক্তিত্বের জন্ম যদি ১৫ই আগস্ট হয় তবে জন্মদিন পালনের আগে তার বিবেক (যদি থাকে) অবশ্যই তাকে প্রশ্ন করবে। বেগম খালেদা জিয়া অনেক ক্ষমতাবান একজন, সরকার প্রধান ছিলেন, বৃহত্তম বিরোধী দলের প্রধান, সারা বিশ্ব তার নাম জানে, তিনি অনেক অর্থ-বিত্তের মালিক। আমি মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করা একজন সাধারণ মানুষ। কিন্তু বিবেক যদি আদালত হয়, তবে নৈতিকভাবে, বিবেকের কাছে আমি বেগম খালেদা জিয়ার চেয়ে অনেক বেশী ঐশ্বর্যশালী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

The Weeklydesh newspaper