খোলস বদলাচ্ছে জামায়াত

1

চারদিক থেকে নানামুখী চাপে পিষ্ট বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামে খোলস পাল্টাচ্ছে। শীর্ষ দুই পদ বাদ দিয়ে দলটির সর্বস্তরের নেতৃত্বে আসছে পরিবর্তন। জামায়াত সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে একের পর এক রায়, পুলিশি ধরপাকড় ও মামলায় কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জামায়াতে ইসলামী। এর ওপর নির্বাচন কমিশন কর্তৃক দলটির নিবন্ধন বাতিল এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক যুদ্ধাপরাধী দলের অভিযোগ জামায়াতকে আরো সঙ্গীন অবস্থায় ফেলে দিয়েছে। এদিকে দলটির স্মরণকালের এই মহাবিপর্যয়ে শীর্ষ থেকে তৃণমূল পর্যন্ত নেতাকর্মীরা রয়েছেন আতঙ্কে। অনেকেই আছেন হয় কারাগারে, নয় আত্মগোপনে। এ অবস্থায় দলটির তরুণ নেতাদের নেতৃত্বে এনে নতুন করে রাজনীতির মাঠে নামার পরিকল্পনা করছেন জামায়াতের নীতিনির্ধারকরা। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, এর ফলে জামায়াতের বিরুদ্ধে ওঠা মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ অনেকটাই ম্লান হয়ে যাবে। একই সঙ্গে তরুণদের নেতৃত্বে উজ্জীবিত হবে দল। এ পরিকল্পনা ঘিরে গোপনে বৈঠক-আলোচনা ও নানা হিসাব-নিকাশ চলছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এদিকে দলটির ঢাকা মহানগরী পর্যায়ের এক নেতা জানান, এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গোপনে নেতৃত্ব নির্বাচনের মাধ্যমে সংগঠন গুছিয়ে চলেছে জামায়াতে ইসলামী। তিনি আরো জানান, জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ছাত্রশিবিরের নেতৃত্বেও পরিবর্তন আসছে।
জামায়াত সূত্রে জানা গেছে, তৃণমূল রুকন সদস্যদের ভোটে দলটির জেলা ও মহানগর কমিটি নির্বাচন প্রায় শেষ পর্যায়ে। আগামী ডিসেম্বরে নির্বাচন হতে যাচ্ছে দলটির আমির ও সেক্রেটারি জেনারেল পদে। তবে নতুন কমিটিতেও আমির ও সেক্রেটারি জেনারেল পদে বহাল থাকছেন মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ।  কৌশলগত কারণেই তাদের রাখা হচ্ছে। যদিও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নিজামী-মুজাহিদের মৃত্যুদ- হয়েছে।
জামায়াতের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের এক নেতা জানান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল নিজামীসহ দলের অন্য নেতাদের মৃত্যুদ- দেওয়ায় সামনের রায়ে কী হবে সেটা বেশ স্পষ্ট। তাই নিজামী ও মুজাহিদের প্রতি সম্মান রেখেই নেতৃত্ব নির্বাচনকারী ভোটাররা (রুকন) তাদের স্বপদে বহাল রাখবেন। যতদিন তারা কারান্তরীণ থাকবেন, ততদিন ওই দুটি পদে এখনকার মতো কাউকে ভারপ্রাপ্ত করে রাখা হতে পারে। তবে অন্য পদগুলোয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নির্বাচন অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি কারান্তরীণ নেতারাও মূল্যায়িত হচ্ছেন। তৃণমূল রুকনদের কাছ থেকে কেন্দ্র এ ধরনের মতামতই পেয়েছে। অন্যদিকে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে ইসলামী ছাত্রশিবিরের নতুন কমিটি ঘোষণা করা হবে বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে।
নেতৃত্ব নির্বাচন নিয়ে জামায়াত নেতা মতিউর রহমান আকন্দ বলেন, প্রতিকূল অবস্থার কারণে রুকনদের নিয়ে সম্মেলন করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে নেতৃত্ব নির্বাচন কার্যক্রম থেমে নেই। জামায়াতের নির্বাচন কমিশন দ্রুত সময়ের মধ্যে সারা দেশের রুকনদের পছন্দমতো নেতৃত্ব বা কমিটি প্রকাশ করবে। এতে কে কোন পদে আসবেন তা এখনই বলার অবকাশ নেই।
সূত্র জানায়, গত রমজানের পর রুকনদের জন্য জেলায় জেলায় গোপন ব্যালট পাঠিয়ে দেওয়া হয়। জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতারা (নির্বাচন কমিশন সদস্য) প্রতিটি জেলা সফর করে রুকনদের গোপন ব্যালটে জেলা ও মহানগরীর আমির নির্বাচন সম্পন্ন করেন। এ কার্যক্রম শেষ হয় গত অক্টোবরের শেষ দিকে। নভেম্বরের মাঝামাঝি জেলা ও মহানগরের নতুন নেতৃত্বের নাম প্রকাশ করা হবে। এরপর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ নির্বাচন হবে।
জামায়াতের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, তৃণমূল থেকে শীর্ষপদ আমির নির্বাচনের ক্ষমতা সারা দেশে থাকা রুকন সদস্যদের হাতে। নিয়ম অনুযায়ী সম্মেলনের মাধ্যমে গোপন ব্যালটের মাধ্যমে রুকন সদস্যরা তাদের নেতা নির্বাচন করেন। এক্ষেত্রে কারও প্রার্থী হওয়ার সুযোগ নেই। গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সর্বশেষ রুকন সম্মেলন হয়। কিন্তু মহাজোট সরকারের আমলে আটক-গ্রেপ্তার এড়াতে অত্যন্ত গোপনে প্রতিটি ইউনিটে আলাদাভাবে ভোটগ্রহণ করা হয়। এমনকি বছরে দুবার অধিবেশন হওয়ার কথা থাকলেও তা করতে পারেনি দলটি।
জামায়াত সূত্র জানায়, বর্তমানে দলটির ১৫৯ জন কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য রয়েছেন। শূরার পর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দলীয় কাঠামো। শূরা সদস্যের মাধ্যমে নির্বাচিত ৪০ সদস্যের এ পরিষদটি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে। দীর্ঘদিন কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার নির্বাচন না হওয়ায় এই পরিষদ মনোনয়নও বন্ধ রয়েছে।
এদিকে শিবিরের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের এক নেতা জানান, দুঃসময়ে রাজপথের সৈনিক ও তরুণদের প্রাধান্য দিয়ে শিবিরের নেতৃত্ব নির্বাচন প্রায় শেষ দিকে। জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে নতুন কমিটি ঘোষণা করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

The Weeklydesh newspaper