সরকারের বিরুদ্ধে মোক্ষম অস্ত্র ড্যাপ!

1

২০১০ সালে তৈরি করা ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় (ড্যাপ) পুরনো বসতিকে দেখানো হয়েছে জলাভূমি হিসেবে। যেসব জমিতে অনেক আগেই ঘরবাড়ি তৈরি করে মানুষ বসবাস করছে, সেসব জমিকে দেখানো হয়েছে বন্যাপ্রবাহ এলাকা হিসেবে। হাইড্রোলজিক্যাল সার্ভে না করে ও সঠিকভাবে ভূমির অবস্থা পর্যালোচনা না করে যে ড্যাপ তৈরি করা হয়েছিল তাতে ভুল ছিল বলে স্বীকার করেছেন স্বয়ং ড্যাপ পর্যালোচনা কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী। অথচ সেই ড্যাপ বাস্তবায়নের নামে শুরু হয়েছে নতুন ষড়যন্ত্র।

একটি মহল সেই ‘ভুলে ভরা’ ড্যাপ বাস্তবায়নের জন্য সরকারের শীর্ষ পর্যায়কে ভুল বোঝানোর চেষ্টা করছে বলে জানা গেছে। আর এদের উদ্দেশ্য হলো, ড্যাপ বাস্তবায়নের নামে ঢাকার বাসিন্দাদের খেপিয়ে তোলা এবং দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়া। অন্য কোনোভাবে সরকারের বিরুদ্ধে মানুষকে খেপিয়ে তুলতে না পেরে তারা এবার ড্যাপকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে ঢাকায়
গণ-অসন্তোষ তৈরির চেষ্টা করছে বলে ধারণা করছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।
সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমান অবস্থায় ড্যাপ বাস্তবায়ন করতে হলে দুই হাজার ৭৭৪টি শিল্প কারখানা সরিয়ে ফেলতে হবে। ভাঙতে হবে পাঁচ লাখেরও বেশি স্থাপনা। এতে যেমন বহু মানুষ বেকার হবে, তেমনি ঘরবাড়ি হারাবে অনেক পরিবার। দেশের অনেক মানুষ ও প্রবাসীরা প্লট কেনার জন্য যেসব আবাসন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ, তারাও বড় সংকটে পড়বে।
বর্তমানে ঢাকা মহানগরীর এক হাজার ৫২৮ বর্গ কিলোমিটার (৫৯০ বর্গ মাইল) এলাকা ড্যাপের আওতাধীন। বর্তমান ‘ত্রুটিপূর্ণ ও বিতর্কিত’ ড্যাপের গেজেট প্রকাশ করা হয় ২০১০ সালের ২২ জুন। এ নিয়ে নানা বিতর্ক হয়েছে। সংশোধনের জন্য মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়েছে। সেই কমিটি বিশেষ কোনো কার্যক্রম পরিচালনা না করায় গত ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পর বর্তমান গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনকে প্রধান করে কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে।
কিন্তু ওই স্বার্থান্বেষী মহলটি চায় আগের ভুলে ভরা ড্যাপ হুবহু বাস্তবায়ন করা হোক। অথচ গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শেষ সময়ে তড়িঘড়ি করে আগের ড্যাপকে পাল্টে ফেলে তৈরি করা ড্যাপ নিয়ে নানা প্রশ্ন আছে। সংশ্লিষ্টরা জানায়, সরকারের বিরুদ্ধে ঢাকার মানুষকে খেপিয়ে তোলার এখন বড় হাতিয়ার ড্যাপ। মানবতাবিরোধী অপরাধীদের একের পর এক ফাঁসির রায়ে জনমনে ভালো অবস্থান তৈরি হওয়ায় ওই মহলটি সরকারকে বিপাকে ফেলার আর কোনো উপায় দেখছে না। ওদিকে পশ্চিমবঙ্গে সরকারবিরোধীদের অর্থের জোগান দেওয়া একটি গোষ্ঠীও ধরা পড়েছে। সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রকারী জঙ্গিরাও এখন ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের অভিযানে আটক হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের সদস্য পদ লাভ, কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনের (সিপিএ) নির্বাচনে জয় আন্তর্জাতিক সমর্থন প্রশ্নে সরকারের অবস্থান সুদৃঢ় করেছে। ফলে সরকারকে হটানোর আর কোনো পথ দেখছে না ওই মহলটি।
এদিকে সরকারের প্রতিপক্ষ দলগুলো আগামী জানুয়ারি নাগাদ আন্দোলন জমিয়ে তুলতে চায়। সরকারও জানুয়ারি ঘিরে সতর্ক অবস্থানে আছে। প্রতিপক্ষ দলগুলোও ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে ঢাকায় আন্দোলনের ব্যর্থতা মাথায় রেখে এগোচ্ছে। সে ক্ষেত্রে ঢাকার বাসিন্দাদের খেপিয়ে তুললে তাদের জন্য অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হবে বলে তাদের ধারণা।
ইতিমধ্যে ড্যাপের কারণে বহুমাত্রিক বিপর্যয় নেমে এসেছে দেশের আবাসন ও এর সহযোগী ২৬৯টি শিল্প খাতে। ড্যাপের কারণে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) গত ১২ বছরে নতুন কোনো আবাসন প্রকল্পের অনুমোদন দিতে পারেনি। ফলে আবাসন খাতে গতি কমে যাওয়ায় ওই খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ২৬৯টি শিল্প খাতের উৎপাদিত পণ্যের চাহিদা কমে গেছে। ফলে ওই সব খাতে নতুন কর্মসংস্থান হচ্ছে না, চলছে ছাঁটাই।
২০০৮ সালে প্রথম খসড়া ড্যাপ প্রজ্ঞাপন আকারে প্রকাশ করা হয়। ওই প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছিল ড্যাপের ওপর গণশুনানি ও জনমত গ্রহণের জন্য। ২০০৮ সালের ৫ অক্টোবর থেকে ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত এ বিষয়ে গণশুনানি ও জনমত নেওয়া হয় এবং গ্রহণযোগ্য মতামত সন্নিবেশ করা হয়। মতামত গ্রহণ শেষে ড্যাপ গেজেট আকারে প্রকাশ করার সময়সীমা ছিল ২০০৯ সালের ২৪ জানুয়ারির মধ্যে।
কিন্তু প্রায় চূড়ান্ত ড্যাপ গেজেট আকারে প্রকাশ করার বদলে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা ২০০৮ সালের ২৩ ডিসেম্বর একটি ‘তথাকথিত’ জাতীয় সেমিনার আয়োজন করেন। ওই সেমিনারে ড্যাপ পর্যালোচনার জন্য একটি রিভিউ কমিটি গঠন করার সুপারিশ করা হয়।
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ার দুই দিন পরে এবং নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক দিন আগে তড়িঘড়ি করে ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি একটি সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ১২ সদস্যের একটি রিভিউ কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি আগের ড্যাপকে পাল্টে ফেলে ২০০৯ সালের ২৯ অক্টোবর একটি ‘ভুলে ভরা, অবাস্তব ও বাস্তবায়নের অযোগ্য’ একটি ড্যাপ তৈরি করে তা গেজেট আকারে প্রকাশের জন্য পাঠায় বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।
তীব্র আপত্তির মুখে ২০১০ সালের ৭ মার্চ ড্যাপ পর্যালোচনার জন্য ছয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু ওই কমিটি কোনো আপত্তি বিবেচনায় না নিয়ে নিজেদের মতো করে প্রতিবেদন তৈরি করে। পরে ২০১০ সালের ২২ জুন ড্যাপের গেজেট প্রকাশ করা হয়। এর পরই ড্যাপ নিয়ে প্রকাশ্যেই নিজেদের অসন্তোষ প্রকাশ করতে শুরু করেন ঢাকার জনপ্রতিনিধিরা। তাঁরা বিভিন্ন এলাকায় গণবিস্ফোরণের আশঙ্কাও প্রকাশ করেন। তাঁদের আশঙ্কা সত্য প্রমাণিত হয় ড্যাপের গেজেট প্রকাশিত হওয়ার এক মাসের মধ্যেই। ২০১০ সালের জুলাই মাসে গাজীপুরে গণবিস্ফোরণ হয়।
ড্যাপে শুধু সাধারণ মানুষের বাড়িঘর ও রাস্তাঘাটকে জলাশয়, বন্যাপ্রবাহ এলাকা হিসেবে দেখানো হয়নি, অনেক স্বনামধন্য এবং রাজউক অনুমোদিত আবাসিক প্রকল্পের ৬০ ফুট রাস্তাকে ৮০ ফুট হিসেবে দেখানো হয়েছে। ফলে ওই সব রাস্তার পাশে ইতিমধ্যে গড়ে ওঠা শত শত বহুতল ভবন ভাঙার প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল।
গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ড্যাপে কিছু ভুল ছিল বলে স্বীকার করেন ড্যাপ পর্যালোচনা কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী। তিনি বিজিএমইএ ভবনে এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ড্যাপ প্রণয়নকালে যে চারটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তারা অনেক জমিকে জলাভূমি হিসেবে দেখিয়েছিল, যা আসলে জলাভূমি নয়।
প্রখ্যাত ওই স্থপতি আরো বলেন, ‘পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলো কোন জমিকে কী হিসেবে চিহ্নিত করেছে তা পর্যালোচনা কমিটির পক্ষে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করে দেখা সম্ভব হয়নি। তারা জলাভূমি নয়, এমন এলাকাকেও জলাভূমি হিসেবে দেখিয়েছিল। আমরা আশা করি, ভুল চিহ্নিত করার পর ২০১৫ সালের মধ্যে আমরা একটি নতুন ড্যাপ পাব।’
ঢাকার আশপাশে কোটি কোটি টন বালু দিয়ে নিচু এলাকা ভরাট করে যেসব আবাসন প্রকল্প গড়ে উঠেছে সেগুলো আবার সরিয়ে নিয়ে জলাভূমিতে রূপান্তর করা সম্ভব কি না, জানতে চাইলে ড্যাপ রিভিউ কমিটির সাবেক সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. রেজওয়ান হোসেন ভূঁইয়া সম্প্রতি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সে জন্যই বলছি, বর্তমান অবস্থা বজায় রেখে ড্যাপ বাস্তবায়ন করা দরকার। নইলে যা আছে তাও রক্ষা করা যাবে না।’
তিনি বলেন, ‘আমরা পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে যে মতামত দিয়েছিলাম তার ৫০ শতাংশ রক্ষা করেও ড্যাপ করা হলে ঢাকাকে অনেকাংশে রক্ষা করা সম্ভব হবে। পুরোটা এখন আর করা সম্ভব নয়। কারণ অনেক জমি ভরাট হয়ে গেছে, বিক্রি হয়ে গেছে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

The Weeklydesh newspaper