ফের পেছাল নিজামীর রায়

Maulana Matiur Rahman Nizami chief of Bangladesh's fundamentalist Jamaat-e-Islami party waves at students at rally in Dhaka

জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় আবারো অপেক্ষমাণ রেখেছে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল। অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে কারাকর্তৃপক্ষ তাকে ট্রাইব্যুনালে হাজির না করার পর আজ মঙ্গলবার মামলাটি নতুন করে রায়ের জন্য অপেক্ষমান রাখা হয়।

আজ নিজামীর বিরুদ্ধে মামলার রায় ঘোষণার দিন ধার্য ছিলো। কিন্তু সকালে কারা কর্তৃপক্ষ ট্রাইব্যুনালকে চিঠি দিয়ে জানায়, নিজামী হঠাত্ ‘অসুস্থ’ হয়ে পড়েছেন। তাকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা সম্ভব নয়। এরপর তার অনুপস্থিতিতে রায় ঘোষণা নিয়ে রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের শুনানি শেষে তৃতীয়বারের মতো রায় অপেক্ষমাণ রাখেন বিচারপতি এম. এনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল-১।

শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল আদেশে বলেন, মতিউর রহমান নিজামীর শারীরিক অসুস্থতার বিষয়ে জেল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আমরা একটি প্রতিবেদন পেয়েছি। ঐ প্রতিবেদেন অনুসারে নিজামী অসুস্থ। প্রতিবেদনটি রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের আইনজীবীরা দেখেছেন এবং শুনানি করেছেন। শুনানি শেষে আইন পর্যালোচনা করে আসামির অনুপস্থিতিতে রায় দেয়াটা আমরা যুক্তিসঙ্গত মনে করছি না। তবে যত দ্রুত সম্ভব জেল কর্তৃপক্ষকে নিজামীর শারীরিক অবস্থার ওপর একটি প্রতিবেদন দেয়ার জন্য বলছি। এ অবস্থায় মামলাটির রায় ঘোষণা অপেক্ষমাণ রাখা হচ্ছে।

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা, লুট, ধর্ষণ, উস্কানি ও সহায়তা, পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র এবং বুদ্ধিজীবী হত্যার মতো ১৬টি অভিযোগে নিজামীর বিরুদ্ধে বিচার কাজ শেষ হয়েছে। আজ রায় ঘোষণার দিন ধার্য থাকায় রাজধানীসহ সারা দেশে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। সারা দেশে গোয়েন্দা নজরদারিও বাড়ানো হয়। রায় ঘোষণার সকল প্রস্তুতি ঠিকঠাক থাকলেও সকাল ১০টার দিকে ট্রাইব্যুনালে কারা কর্তৃপক্ষের চিঠি আসার পর রায় নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। পরে বেলা ১১টার দিকে এজলাসে ওঠেন ট্রাইব্যুনাল-১ এর তিন বিচারপতি। এরপর শুনানি শুরু হলে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি মোহাম্মদ আলী বলেন, আসামির অনুপস্থিতিতে রায় ঘোষণার বিষয়টি ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার। ট্রাইব্যুনাল তার অন্তর্নিহিত ক্ষমতাবলে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দিতে পারে। অন্যদিকে, মতিউর রহমান নিজামীর পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট মিজানুল ইসলাম। তিনি বলেন, নিজামী এ মামলার বিচারিক কার্যক্রম চলাকালে একদিনও অনুপস্থিত থাকেননি। সুতরাং তার অনুপস্থিতিতে রায় হওয়ার কোন সুযোগ নেই। চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপুও বলেন, আসামির উপস্থিতিতে রায় ঘোষণা একটি রীতি বলা চলে। সংক্ষিপ্ত শুনানি শেষে মামলাটির রায় অপেক্ষমাণ রাখার সিদ্ধান্ত জানান ট্রাইব্যুনাল। এর মাধ্যমে দুই ট্রাইব্যুনালে আবারো চারটি মামলা রায় অপেক্ষমাণ থাকলো।

অন্যদিকে, নিজামীকে চিকিত্সকের পরামর্শে কারাগারে মেডিকেল সুবিধায় পূর্ণ বিশ্রামে রাখা হয়েছে বলে সাংবাদিকদের জানান ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সুপার ফরমান আলী।

তিনি জানান, সোমবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে গুরুত্বর অসুস্থ হয়ে পড়েন নিজামী। তিনি মারাত্মক উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। এ অবস্থায় রাতেই জেল কর্তৃপক্ষের নিজস্ব চিকিত্সক ডেকে নিজামীকে পরীক্ষা করানো হয় ও চিকিত্সা দেয়া হয়। অবস্থার উন্নতি না হলে সকাল ৮টায় তাকে আরও একবার চিকিত্সক দেখেন এবং পূর্ণ বিশ্রামে রাখার পরামর্শ দেন। চিকিত্সকের পরামর্শেই মতিউর রহমান নিজামীকে ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়নি বলে জানান তিনি।

নিজামীর মামলায় দ্বিতীয় দফা যুক্তিতর্ক শেষে গত ২৪ মার্চ রায় ঘোষণা অপেক্ষমাণ রাখেন ট্রাইব্যুনাল। এর আগে সাবেক চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীরের নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল-১ গত বছরের ১৩ নভেম্বর নিজামীর মামলার কার্যক্রম শেষে রায় ঘোষণা অপেক্ষমাণ রেখেছিলেন। কিন্তু বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীরের চাকরির বয়সসীমা পূর্ণ হওয়ায় তিনি গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর অবসর নেন। সেই থেকে চেয়ারম্যানের পদটি শূন্য ছিল। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিমকে। তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর ১০ মার্চ থেকে এ মামলায় নতুন করে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের দিন ধার্য করেন। এরপর তিন কার্য দিবসে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে রাষ্ট্রপক্ষ। অন্যদিকে, গত ১৩ মার্চ থেকে পাঁচ কার্যদিবসে নিজামীর পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম ও মিজানুল ইসলাম।

উল্লেখ্য, ২০১০ সালের ২৯ জুন মতিউর রহমান নিজামীকে একটি মামলায় গ্রেফতারের পর একই বছরের ২ আগস্ট তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। এরপর ২০১১ সালের ১১ ডিসেম্বর জামায়াতের আমিরের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ উপস্থাপন করে ট্রাইব্যুনালের রাষ্ট্রপক্ষ। ঐ বছরের ২৮ ডিসেম্বর আদালত অভিযোগ আমলে নেয়। ২০১২ সালের ২৮ মে নিজামীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের ১৬টি অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে ট্রাইব্যুনাল-১ এ তার বিচার শুরু হয়। ঐ বছরের ২৬ আগস্ট থেকে এ মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। তদন্ত কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাক খানসহ এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে সাক্ষ্য দেন মোট ২৬ জন। আর নিজামীর পক্ষে তার ছেলে মো. নাজিবুর রহমানসহ মোট চারজন সাফাই সাক্ষ্য দেন।

প্রসঙ্গত, ২০১০ সালের ২৫ মার্চ মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হওয়ার পর এখন পর্যন্ত নয়টি মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে ট্রাইব্যুনাল-১ থেকে তিনটি ও ট্রাইব্যুনাল-২ থেকে ছয়টি মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। নিজামী বাদে দুই ট্রাইব্যুনালে তিনটি মামলার রায় ঘোষণা অপেক্ষমাণ রয়েছে। এর মধ্যে ট্রাইব্যুনাল-১ এ আছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা মোবারক হোসেন ও ফরিদপুর বিএনপির নেতা পলাতক জাহিদ হোসেনের মামলার রায়। আর ট্রাইব্যুনাল-২ এ রায় ঘোষণার অপেক্ষায় আছে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মীর কাসেম আলীর মামলা। এছাড়া সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে শুনানি শেষে রায়ের অপেক্ষায় আছে জামায়াতের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলা। এখন পর্যন্ত যুদ্ধাপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

The Weeklydesh newspaper