এমপির অনুসারীদের সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত

1

পল্লবীর কালশী বিহারি ক্যাম্পে আগুনে পুড়ে এক পরিবারের ৯ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু ও পুলিশ-জনতার সংঘর্ষে একজনের নিহত হওয়ার ঘটনার নানা দিক অনুসন্ধান করছেন পুলিশ ও গোয়েন্দারা। এ-সংক্রান্ত এক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে কালশীর বিহারি ক্যাম্প ঘিরে স্থানীয় রাজনীতিবিদদের প্রভাববলয় ও নানা কর্মের চিত্র। এ-সংক্রান্ত একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে। আর এ প্রতিবেদনে আটকে পড়া পাকিস্তানিদের নিয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগের ত্রিমুখী রাজনৈতিক বলয় ও বিরোধের বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। কালশীর এ ঘটনায় স্থানীয় সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লার অনুসারী যুবলীগ নেতা জুয়েল রানাসহ কয়েকজনের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের তথ্য মিলেছে, যা পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শবেবরাতের রাতে কালশীর বিহারি ক্যাম্পে সংঘর্ষ এবং পরে ১০ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় পুলিশ ও একাধিক গোয়েন্দাদল কারণ অনুসন্ধান ও দায়ীদের চিহ্নিত করতে কাজ করছে। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে এ ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলেও নানা প্রশ্ন ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। এ অবস্থায় ‘প্রকৃত চিত্র’ জানতে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের তাগাদা দেওয়া হয়। ফলে একটি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। সেখানে এ ট্র্যাজিক ঘটনার নেপথ্যে কী ধরনের বিরোধ নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে, এর উল্লেখ রয়েছে। এখন সংঘর্ষ ও খুনের ঘটনায় জড়িতদের ব্যাপারে অনুসন্ধানে নেমেছেন মামলার তদন্তকারীরা। গোয়েন্দারা এ বিষয়ে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করলেও পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এ বিষয়টির উল্লেখ নেই। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে বিরোধ, বিহারিদের মধ্যে পুলিশবিদ্বেষী তীব্র মনোভাবসহ নানা কারণে মর্মান্তিক ওই ঘটনা ঘটেছে।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মিরপুর ১২ নম্বর সেকশনের ‘ই’ ও ‘ডি’ ব্লকে অবস্থিত আলোচিত কুর্মিটোলা বিহারি ক্যাম্পে বসবাসকারীর সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার। এ ক্যাম্পের ৭৭৪ পরিবারের জন্য রয়েছে মাত্র একটি বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার। ক্যাম্পের ঠিক পূর্ব দিকে রাজু বস্তির অবস্থান। বাউনিয়া বাঁধসংলগ্ন জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের জমিতে বিহারি রাজু, বিহারি আমানত, বুলু ও শাকিলের সহযোগিতায় পাঁচ বছর আগে ৪০০ পরিবার নিয়ে এ বস্তি গড়ে ওঠে। দুই বছর আগে রাজু বিহারি মারা গেলে অন্যরা এ বস্তির নিয়ন্ত্রণ নেয়। বস্তিতে ঘর তোলার সময় এ চক্র ২০-২৫ হাজার টাকা করে ৪০০ পরিবারের কাছ থেকে নিয়েছিল। আর এখন বিদ্যুৎ বিল বাবদ প্রতি মাসে ঘরপ্রতি ৬০ টাকা করে আদায় করা হচ্ছে। এ আর্থিক লেনদেন ঘিরেই সরকার সমর্থক একটি গোষ্ঠী সেখানে নিয়ন্ত্রণ কায়েমের চেষ্টায় নামে। বর্তমানে রাজু বস্তিটি স্থানীয় সংসদ সদস্যের অনুগত হিসেবে পরিচিত জুয়েল রানার নিয়ন্ত্রণে। বস্তিটি গড়ে ওঠার পর পাশের কুর্মিটোলা ক্যাম্প থেকে বিদ্যুৎ সংযোগ নেওয়া হলেও আকস্মিকভাবে গত ১০ জুন সংযোগটি বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। স্থানীয় সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লা আবার সংযোগ দেওয়ার জন্য কুর্মিটোলা ক্যাম্পের সভাপতি জালাল উদ্দিনকে অনুরোধ করেন। বিদ্যুৎ বিল বেশি হওয়া এবং ট্রান্সফরমার জ্বলে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে পুনঃসংযোগ প্রদান থেকে বিরত থাকেন ক্যাম্পের নেতারা। এ নিয়ে কুর্মিটোলা বিহারি ক্যাম্প ও রাজু বস্তির মধ্যে বিরোধ যখন তুঙ্গে, তখন ১১ জুন রাত সাড়ে ১১টার দিকে সেখানে উপস্থিত হয়ে সংসদ সদস্য সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দেন। সে সময় সংসদ সদস্য ও তাঁর সঙ্গে থাকা স্থানীয় যুবলীগ নেতা-কর্মী এবং কুর্মিটোলা ক্যাম্পের বিহারিদের মধ্যে বাগ্‌বিতণ্ডা ও হাতাহাতি হয়। পরে ক্যাম্প সভাপতি জালাল উদ্দিনসহ ২০ জনের বিরুদ্ধে পল্লবী থানায় মামলা হয়। যুবলীগ নেতা জুয়েল রানার হুমকি ও মামলার কারণে জালাল উদ্দিন পালিয়ে যান।
১৩ জুন পবিত্র শবেবরাত উপলক্ষে কিছু উচ্ছৃঙ্খল লোক আতশবাজি ও পটকা ফোটালে পল্লবী থানার পুলিশ ভোর পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে বিহারি ক্যাম্প এবং আশপাশ থেকে বিহারি ও বাঙালিসহ প্রায় ৬০ জনকে আটক করে। এদের মধ্যে পাঁচজন কুর্মিটোলা বিহারি ক্যাম্পের বাসিন্দা। তারা বিদ্যুৎ নিয়ে আন্দোলনে এমপির প্রতিহিংসার শিকার বলে মনে করে বিহারিরা। ভোর সাড়ে ৪টায় পল্লবী থানার পুলিশের একটি টহলদল কুর্মিটোলা ক্যাম্প থেকে আতশবাজি ফোটানোর অপরাধে এক বিহারিকে আটক করলে শুরু হয় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া। পরে তা ত্রিমুখী সংঘর্ষে রূপ নেয়। পুলিশ-বিহারি বিরোধের মধ্যে আগের জের ধরে যোগ দেয় বাউনিয়া বাঁধ ও রাজু বস্তির লোকজনও। একপর্যায়ে সকাল সাড়ে ৭টার দিকে অজ্ঞাতপরিচয় সন্ত্রাসীরা ক্যাম্পের বাসিন্দা ইয়াসিন মিয়ার ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা জলকামান থেকে পানি দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। পরে ফায়ার সার্ভিস আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এ আগুনে ক্যাম্পের মোট ছয়টি ঘর পুড়ে যায়। আর একই পরিবারের ৯ জন দগ্ধ হয়ে মারা যায়। এর বাইরে সংঘর্ষ চলাকালে গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে মারা যান আজাদ নামের আরেকজন ক্যাম্পবাসী। আগুন ও সংঘর্ষে অন্তত ২০ জন বিহারি, চারজন বাঙালি ও ১০ পুলিশ সদস্য আহত হন। ভোর সাড়ে ৪টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ শটগানের ৫১০ রাউন্ড গুলি, ১৩৪ রাউন্ড গ্যাসগানের টিয়ার শেল এবং ৬০টি সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এ ঘটনায় পল্লবী থানায় মোট সাতটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের চিত্র উল্লেখ করে প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ঢাকা-১৬ আসনটিতে গত ৫ জানুয়ারি আলহাজ ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লা বিজয়ী হন। এ এলাকায় ক্ষমতাসীন দলের তিনটি গ্রুপ রয়েছে, যার একটির নেতৃত্বে বর্তমান সংসদ সদস্য নিজেই। দ্বিতীয়টি আওয়ামী লীগ নেতা এস এম কচি এবং তৃতীয় গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছেন সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার ও সংরক্ষিত মহিলা আসনের সাবেক এমপি সাহেদা তারেক দীপ্তি। দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিরোধ চলে আসছে। সুযোগ পেলেই তাঁরা একে অন্যকে রাজনৈতিকভাবে ঘায়েল করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হন।
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে ইলিয়াস মোল্লা দলীয় মনোনয়ন পান। কিন্তু আওয়ামী লীগ সমর্থকরা ত্রিধারায় বিভক্ত হয়ে পড়ে, যা এখনো বিদ্যমান। এ সংসদীয় এলাকায় মোট ৪০টি বিহারি ক্যাম্প রয়েছে, যাতে ৬০-৭০ হাজার বিহারি বসবাস করে। এর মধ্যে কুর্মিটোলা ক্যাম্পে প্রায় পাঁচ হাজার বিহারির বাস। নির্বাচনকালে এই বিহারিদের ভোট পাওয়ার জন্য সব পক্ষই নানা ধরনের কৌশল অবলম্বন করে থাকে। কুর্মিটোলা ক্যাম্পের পাশের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার আব্দুর রব নান্নুর ভাই এস এম কচি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে এ এলাকা থেকে ভোট বেশি পান। এর পর থেকে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী আশানুরূপ ভোট না পাওয়ার অজুহাত তুলে সংসদ সদস্যের অনুসারীরা বিরূপ আচরণ শুরু করে।
এদিকে পল্লবী বিহারি ক্যাম্পে বসবাসরত বিহারিদের মধ্যে অনেকেই মাদক ব্যবসাসহ অন্যান্য অপরাধে জড়িত থাকায় পুলিশ তাদের আটক করতে প্রায়ই অভিযান চালায়। ফলে তাদের মধ্যে পুলিশবিদ্বেষী মনোভাব দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানি ক্যাম্পে বসবাসকারী জনি নামের এক যুবক পুলিশ হেফাজতে মারা গেলে তা নিয়েও পুলিশের সঙ্গে বিরোধ আরো বাড়ে।
পুলিশ, জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ সম্পর্কের জের ধরেই বিহারিপল্লীর বাসিন্দারা এ ঘটনার শিকার হয়েছে বলে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা অভিমত দেন। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে ঘটনার নেপথ্য কারণগুলো উল্লেখ করা হয়েছে বলে জানান কর্মকর্তারা। এখনো বিষয়টি তদন্তাধীন এবং পরবর্তী সময়ে দায়ীদের চিহ্নিত করে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন তৈরি করা হবে বলে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

The Weeklydesh newspaper