ভাঙা জানালায় প্রবৃদ্ধির সুবাস

1

বাজেট ঘোষণার প্রাক্কালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) বিদায়ী অর্থবছরের ৬ দশমিক ১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির একটি আশ্চর্য ব্যাখ্যা নিয়ে হাজির হয়েছিল, যা প্রতিষ্ঠানটির পরিসংখ্যানগত নির্ভরযোগ্যতার বিতর্ক আরেকবার উসকে দিয়েছে। পরিকল্পনামন্ত্রী অবশ্য বলেছেন, প্রতিষ্ঠানটিই দেশের জাতীয় আয় নিরূপণের ‘একমাত্র’ কর্তৃপক্ষ৷ কেননা এটাই মাঠপর্যায় থেকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে। সবাই অবশ্য গত বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের কম হবে বলেই ধরে নিয়েছিলেন। এমনকি বিশ্বব্যাংকের হিসাবে এটা হয়েছিল ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। হঠাৎ করেই এ রকম একটি অভাবনীয় প্রবৃদ্ধির ব্যাখ্যা বিবিএস দিয়েছে এভাবে: সেবা খাতের মূল্য রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। অর্থাৎ একই পরিমাণে সেবা প্রদানের জন্য ভোক্তা কয়েক গুণ খরচ করেছেন, যা কিনা প্রবৃদ্ধি বাড়াতে সহায়তা করেছে। এটা আমাদের সেই গল্পের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়: একদল উচ্ছৃঙ্খল লোক রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ তাদের মধ্য থেকে কেউ পাশের বাড়িতে ঢিল ছুড়ে জানালার কাচ ভেঙে ফেলল। আপনি হয়তো বলবেন, বিমা কোম্পানি এটা ঠিক করে দেবে। এরপর অনেক রক্ত ঝরল; বাড়িঘর-দোকানপাট জ্বালানো হলো, সম্পদ ধ্বংস হলো। এবার আপনি আবার বলবেন, এটা খুব একটা খারাপ নয়৷ কেননা মানুষ জীবনযাত্রা স্বাভাবিক রাখার জন্য বেশি খরচ করেছে, এতে লোকের আয় বেড়েছে। অর্থনীতিও লাভবান হয়েছে।
ব্যয়বহুল প্রবৃদ্ধির এই গল্প ১৮৫০ সালে ফেদেরিক বাস্তিয়াতের দেওয়া ‘ব্রোকেন উইন্ডো ফ্যালাসি’ বা ভাঙা জানালার ভ্রান্ত যুক্তি ছাড়া আর কিছু নয়। তিনি দেখিয়েছেন যে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড এবং তা থেকে উত্তরণের জন্য অতিরিক্ত অর্থব্যয় সমাজের জন্য আসলে লাভজনক নয়। বিবিএস সেবা খাতের জিডিপি নির্ণয় করে সেবার আর্থিক মূল্যের অনুমানের ভিত্তিতে, সেবার নিরূপিত পরিমাণের সঙ্গে প্রত্যেকের বাজারমূল্যের গুণফলের ভিত্তিতে নয়। অবশ্য এই আপাতদৃষ্টিতে ‘বোনাস’ প্রবৃদ্ধি, যা কিনা এসেছে লাখ লাখ মানুষের অবর্ণনীয় কষ্ট থেকে, তাকে একই বা কম পরিমাণ সেবার সঙ্গে সমন্বয় করে এর প্রকৃত মূল্য নিরূপণ করা যেত। বিবিএস সম্ভবত চলতি বাজারমূল্যে সেবা খাতের খরচকে হিসাব করে তাকে ভিত্তিবছরের মূল্যের সঙ্গে সমন্বয় করছে। এটা প্রতিষ্ঠানটির পরিসংখ্যান সম্পর্কে সবার কাছে সম্পূর্ণ ভুল বার্তা দিচ্ছে। বরং মোটামুটি সঠিক হিসাব পেতে গত অর্থবছরের সেবার মূল্যের সাপেক্ষে এ বছরের মূল্যস্ফীতির সমন্বয় করে এরপর আবার ভিত্তিবছরের মূল্যের সঙ্গে হিসাবটি সমন্বয় করা যেত। সে ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে জীবনযাত্রার সাময়িক অস্বাভাবিক ব্যয়বৃদ্ধির বিষয়টি পরিসংখ্যানিকভাবে সামাল দেওয়া যেত।
বোঝাই যায়, বাজেট ঘোষণার প্রাক্কালে প্রবৃদ্ধির ৬ শতাংশের অন্তরায় কাটিয়ে উঠতে পেরে সরকার বেশ স্বস্তিতেই আছে৷ কেননা, বিবিএসের পরিসংখ্যান চ্যালেঞ্জ করার যথাযথ ‘কর্তৃত্ব’ কারও নেই। অবশ্য ৬ শতাংশকে আজকাল অনেকটা ‘ঘুমন্ত প্রবৃদ্ধি’ মনে করা হয়৷ কেননা, এটি মূলত নিউটনের গতির প্রথম সূত্রের মতো। আর গত বছরের এ রকম ভয়াবহ রাজনৈতিক সংকটের পরও যেহেতু প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ পেরিয়েছে, তাই অর্থমন্ত্রী তাঁর বাজেট বক্তৃতার সময় আগামী অর্থবছরের স্বাভাবিক সময়ে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির ‘সুবাস’ পেয়েছেন বলেই মনে হয়। কিন্তু ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুসারে উঁচু প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে চাইলে রাজস্ব কার্যক্রম ও সরকারি বিনিয়োগ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বেসরকারি বিনিয়োগে একটি ব্যাপকভিত্তিক প্রণোদনা দিতে হবে। বিদায়ী অর্থবছরে এত সংকটের পরেও বাংলাদেশের অর্থনীতি যে সহজাত শক্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, তার মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করতে অবশ্য দ্বৈত সম্প্রসারণ দরকার। বর্তমানে এটি ‘একক’ সম্প্রসারণের মধ্যে রয়েছে, যেখানে রাজস্ব সম্প্রসারণ আশাব্যঞ্জক হলেও মুদ্রানীতি এখনো অনেকটা সতর্ক।
আশা করা যায়, প্রস্তাবিত বাজেটের সঙ্গে মিল রেখে আগামী মুদ্রানীতিও খানিকটা সম্প্রসারণমূলক হবে। তাহলে ৭ শতাংশের ওপরে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য খুব একটা বড় হবে না।
অনেকে প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়নকে একটি বড় চ্যালেঞ্জ মনে করলেও আসলে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা। আড়াই লাখ কোটি টাকার বাজেটে কিছু প্রণোদনা ও পুনর্বণ্টনমূলক ব্যবস্থা থাকলেও এটি আসলে অর্থনীতিতে শুধু গতির সূচনা করবে। বেসরকারি বিনিয়োগের মূল দুটো সমস্যা অবকাঠামো আর জ্বালানি-সংকটের টেকসই সমাধানের ব্যাপারে ৮০ হাজার কোটি টাকার এডিপিতে দৃঢ় পদক্ষেপের ইঙ্গিত নেই। এর প্রধান কারণ হলো বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) আগামী অর্থবছরেও মূলত গতানুগতিক থাকবে—এখানে নিম্ন অভিঘাতসম্পন্ন প্রকল্প থেকে উচ্চ মানসম্পন্ন মধ্যমেয়াদি সরকারি বিনিয়োগ কর্মসূচিতে উত্তরণের কোনো প্রতিশ্রুতি নেই। তাই টাকা অনেক বিশাল দেখালেও এডিপি মূলত একটি সম্প্রসারণশীল গহ্বরে বিলীন হবে বলে আশঙ্কা হয়। এডিপি বরাদ্দের ২৩ দশমিক ৩ শতাংশ পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে এবং ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দেওয়া হলেও তা মরুর বুকে কয়েক ফোঁটা পানির মতোই হয়তো সাময়িক কাজ করবে। আগামী অর্থবছরে অবকাঠামো ও জ্বালানি খাতে মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়া হচ্ছে না বলে ৭ শতাংশের ওপর প্রবৃদ্ধি উচ্চাকাঙ্ক্ষা হিসেবেই থেকে যেতে পারে। ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডর থেকে জিডিপির অর্ধেকের মতো হলেও এ মহাসড়কটি এ পর্যন্ত ছয় লেনে উন্নীত করার কথা চিন্তাই করা হচ্ছে না। অতি লোভে সাঙ্গু গ্যাসক্ষেত্রের অকালপ্রয়াণ হয়েছে বলে চট্টগ্রাম শিল্পাঞ্চল গ্যাস-সংকটে ধুঁকছে। এসব সংকট সমাধানের উদ্যোগ বাজেটে নেই।
অন্যদিকে, অর্থমন্ত্রী অবশ্য দেরিতে হলেও যথাযথই বলেছেন যে অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহে আয়করই আমাদের ভবিষ্যৎ। অনেক দিন ধরেই আমাদের আয়বৈষম্যের মাত্রাটি অনেক উঁচু এবং বেশ চেষ্টা-তদবির সত্ত্বেও খুব একটা নিচে নামছে না। তাই আয়ের এই বিরাট অসমতা এবং অল্পসংখ্যক লোকের হাতে ব্যাপক সম্পদ জমা হওয়ার প্রবণতা হ্রাস করতে ৪৪ লাখ ২০ হাজার টাকার বেশি ব্যক্তিগত আয়ের ওপর একটি অতি-আয়কর ধার্য করেছেন তিনি। আশ্চর্যের বিষয় হলো, কর-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলো আসে মূলত আমাদের ‘ধারণা’ ও জনপ্রিয় দাবিগুলো থেকে—করের অভিঘাত ও নিট সামাজিক উপকারের বিশ্লেষণ থেকে নয়। এতে উঁচু আয়-অসমতা ও অর্থনীতিতে অন্যান্য ব্যাধি স্থায়ী হচ্ছে। আমাদের আয়কর কাঠামো অনেক দিন ধরেই অধোগতিশীল। প্রস্তাবিত নতুন আয়কর কাঠামোও একে বদলে দেবে না। এতে মধ্যম আয়ের নাগরিকেরা বেশি হারে কর দেবেন এবং উঁচু আয়ের মানুষ আয়কর দেবেন কম হারে। অন্যদিকে, বেশির ভাগ উচ্চমধ্যবিত্ত ব্যক্তি মোট কর দেবেন প্রগতিশীল করের চেয়ে অনেক কম।
কেন্দ্রীয় থেকে স্থানীয় পর্যায়ে বাজেট বরাদ্দের কার্যকর প্রবাহ আঞ্চলিক অসমতা দূর করার এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে গতি আদায়ে একটি পূর্বশর্ত। এটি উঁচু প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক হিসেবেও কাজ করে। মধ্যমেয়াদি বাজেটকাঠামো ২০১৩-১৪ থেকে ২০১৭-১৮-তে স্থানীয় সরকার বিভাগের বাজেটের সিংহভাগ আগামী অর্থছরের বাজেট থেকে স্থানীয় সরকার ইউনিটগুলোয় যাওয়ার কথা ছিল, যাতে তারা যে উন্নয়ন ব্যয় করবে, তা আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হয়। প্রস্তাবিত বাজেট এ প্রতিশ্রুতি থেকে পুরোপুরি সরে গেছে। এতে বিকেন্দ্রায়ণ ও স্থানীয় সরকার শুধু নিরুৎসাহিতই হবে না, বরং স্থানীয় উৎস থেকে আয় এবং টেকসই স্থানীয় উন্নয়ন অনেকটাই শ্লথ হয়ে পড়বে। দেশের উত্তর-দক্ষিণ ব্যবধান আরও প্রকট হবে।
স্বপ্নের প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য তাই দরকার বেসরকারি বিনিয়োগে একটি দৃশ্যমান উল্লম্ফন, অবকাঠামো ও জ্বালানি খাতে টেকসই ও উঁচু মানের সরকারি বিনিয়োগ কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক অসমতা হ্রাস। অবশ্য প্রথমে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে হবে। প্রস্তাবিত বাজেটে পুঁুজিবাজারের জন্য কিছু সুবিধা ঘোষণা করার তাৎক্ষণিক ফল আমরা দেখতে পেয়েছি। আগামী অর্থবছরে প্রত্যাশিত বেসরকারি বিনিয়োগে আস্থার বিষয়টি অবশ্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপরও অনেকখানি নির্ভর করবে।
তাই আগামী অর্থবছরের বাজেটে নির্বাচনের পরবর্তী অর্থবছরের সুবিধাগুলো নেওয়ার বার্তাটি দেওয়ার দরকার ছিল। আমাদের দেশে অতীতে সব সময়ই এ বছরটি প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ–সহায়ক ছিল। অর্থমন্ত্রী অবশ্য এ বিষয়ে বাজেট পাস হওয়ার আগেই অতিরিক্ত আরও কিছু ঘোষণা দিতে পারেন। সবাইকে অবশ্য মনে রাখতে হবে যে ধ্বংস কখনো অর্থনীতি ও সমাজের জন্য ভালো ফল বয়ে আনে না। আর এটি অর্থনীতির সহজাত অন্তর্নিহিত শক্তিকে ধ্বংস করলে তার পরিণাম সবাইকে ভোগ করতে হয়।
ড. মাহফুজ কবীর: অর্থনীতিবিদ ও গবেষক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

The Weeklydesh newspaper