ইংল্যান্ড কেন পারে না!

1

ইংল্যান্ড মিডিয়া এবার একটু অবাকই করেছিল। বিশ্বকাপে নিজেদের দল নিয়ে শোরগোল তোলেনি! এটা না করলে তাদের খাবার হজম হতো না এত দিন। এবার সম্ভবত ইংল্যান্ড মিডিয়া বাস্তবতা বুঝতে পেরেছে।
ধন্যবাদ তাদের প্রাপ্য। ইংল্যান্ড প্রথম দুই ম্যাচই হেরে বিদায়ের দ্বারপ্রান্তে। আটান্নর বিশ্বকাপের পর এই প্রথম সম্ভবত প্রথম রাউন্ডেই ছুটি হচ্ছে ইংল্যান্ডের। কারণটা কী? কেন পারে না ইংল্যান্ড?
আমি বলব, সব দলেই খেলার ধরনে কিছু পরিবর্তন এনেছে। ইংল্যান্ডও যে আনেনি তা নয়। ওরা বুঝতে পেরেছে একেবারে ‘ডাইরেক্ট’ ফুটবল খেলে লাভ হবে না এই যুগে। তাই নিচে খেলতে খেলতে ওপরে ওঠার দিকে কিছুটা হলেও গুরুত্ব দিচ্ছে। তার পরও ম্যাচের মোড় ঘোরাতে এবং অপ্রত্যাশিত কিছু করতে সামর্থ্যবান খেলোয়াড় প্রয়োজন। যেটা ইংল্যান্ড দলে সর্বশেষ ছিল গ্যারি লিনেকার, পল গ্যাসকোয়েনদের মধ্যে। নব্বইয়ে সেটার ফলও মিলেছে—ইংল্যান্ড সেমিতে খেলে সেবার। ছেষট্টির পর যেটি এখন পর্যন্ত ইংল্যান্ডের সেরা সাফল্য। তার পর থেকে কোয়ার্টার ফাইনালের গেরোতেই আটকে যাওয়ার গল্প।
হ্যাঁ, আপনি বলতে পারেন ইংলিশ লিগ তো দারুণ হয়। এমন লিগ যে দেশের ফুটবলের বিজ্ঞাপন, ফুটবলের মহামঞ্চে সেই দেশটি এমন খাবি খাচ্ছে কেন? প্রশ্নটা খুবই যৌক্তিক এবং প্রাসঙ্গিকও বটে। কিন্তু কথা হচ্ছে, ইংলিশ লিগে যা কিছু চোখ কাড়া সবই বলতে গেলে বিদেশিদের কল্যাণে। বড় বড় সব দলই বিদেশিনির্ভর। স্প্যানিশ লিগেও বিদেশিরা খেলেন, মেসি-রোনালদোরা তো বিদেশিই। কিন্তু স্পেনের নিজস্ব খেলোয়াড়ও কম নেই, যাঁরা লিগে চোখ কাড়েন নিজেদের ঝলক দেখিয়ে। ইংল্যান্ডে অমন নৈপুণ্যের খেলোয়াড়ের হদিস খুব একটা পাবেন না আপনি।
ঘরোয়া লিগটা জমজমাট হয় বলেই আসলে ইংল্যান্ড প্রচারে আসে। কিন্তু দল হিসেবে তারা বেশ পিছিয়ে। মজার ব্যাপার, সুয়ারেজ ইংলিশ লিগেই খেলেন এবং যাঁর দুই গোল কার্যত বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে দিয়েছে রুনিদের। লিভারপুলের চার সতীর্থ এ ম্যাচে সুয়ারেজের বিপক্ষে খেলেছেন, তাঁদের তো উরুগুইয়ান গোলমেশিনকে আটকানোর পথ জানা থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সুয়ারেজদের মতো খেলোয়াড়কে আটকানো যায় না। যেটা পরশুর এই ম্যাচটা বেশি করে বুঝিয়ে দিল।
রুনি নিজে প্রথম ম্যাচের তুলনায় বেশ ভালো খেলেছেন এবং বিশ্বকাপে নিজের গোলের খাতাও খুলতে পেরেছেন অবশেষে। কিন্তু ইংলিশদের সমস্যা ওই এক জায়গাতেই কেন্দ্রীভূত। টেকনিক্যালি ইংলিশ খেলোয়াড়েরা খুব একটা নম্বর পাবেন না। শুধু দৌড় বা হেড ভালো করলেই চলবে না। ভালো শটও গোল পাওয়ার মূল চাবিকাঠি নয়। ‘ক্লিলিনিক্যাল ফিনিশ’ করার লোক চাই। ইংল্যান্ডের অস্ত্রভান্ডারে তেমন অস্ত্র দেখছি না।
প্রসঙ্গক্রমে জানাই, ইংল্যান্ডে প্রিলিমিনারি কোচিং কোর্স করেছিলাম ১৯৮০ সালে। ১৯৮৭ তে করি কোচিং ডিপ্লোমা। ববি রবসন, গ্রাহাম টেলরের মতো কোচদের ট্রেনিং দেখেছি। কাজেই ইংলিশ ফুটবল তাত্ত্বিককভাবেও লক্ষ করার সুযোগ হয়েছে। আসলে ইংল্যান্ডের খেলার দর্শনই হলো, ‘বল সামনে বাড়াও।’ মানে যত দ্রুত পার অ্যাটাকিং থার্ডে যাও।
এটা করতে হলে বল পায়ে রাখতে হবে না এমন নয়। বল পায়ে না থাকলে সামনে যাবেন কীভাবে? ইংল্যান্ডও যায়, কিন্তু আক্রমণে খেলোয়াড়দের যোগদান তো থাকতে হবে। সেটাই কার্যকরভাবে করতে পারেনি ইংল্যান্ড। একই সঙ্গে অপ্রত্যাশিত কিছু করে ফেলার সামর্থ্যও গুরুত্বপূর্ণ। তবে বল পায়ে দ্রুত টার্ন নেওয়ার মতো খেলোয়াড় ইংল্যান্ড দলে খুব একটা নেই। যদিও আগের চেয়ে তাদের প্রেসিংও ভালো হয়েছে।
উরুগুয়ের রক্ষণ দারুণ জমাট ছিল। সেই কৃতিত্ব তারা পাবেই। ইংল্যান্ডকে ফাঁকফোকর খুব একটা দেয়নি। আর ওপরে সুয়ারেজের মতো খেলোয়াড়, যাঁর নৈপুণ্য ছিল দেখার মতো। গতির সঙ্গে বুদ্ধি, পরিস্থিতির দাবি মিটিয়ে ঠিক কাজটি করা—এগুলোই পার্থক্য গড়ে দেয়। চোট কাটিয়ে মাঠে নেমে সুয়ারেজ পার্থক্য হয়ে দাঁড়ালেন দুই দলের মাঝখানে। তাঁর সঙ্গে কাভানির রসায়নটা এত দারুণ জমল যে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। ম্যাচের মোড় ঘোরানোর ক্ষমতা সব খেলোয়াড়ের থাকে না, যেটা আছে সুয়ারেজের। কাভানিও কম যাননি। তাই জয়টা উরুগুয়ের।
টুর্নামেন্টে টিতে থাকতে যা ‘লাইফ লাইন’ হয়ে থাকল অস্কার তাবারেজের দলের জন্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

The Weeklydesh newspaper