এবার জন-আতঙ্কে ওসমান পরিবার

1

গুম-খুন, সন্ত্রাস-চাঁদাবাজিসহ নানা ঘটনায় বিতর্কিত যে পরিবারটি এত দিন নারায়ণগঞ্জবাসীর আতঙ্কের কারণ ছিল, নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে সেই ওসমান পরিবার এখন আতঙ্কে পড়েছে৷ তাদের এই আতঙ্কের কারণ সেখানকার সাধারণ মানুষ তথা ভোটাররা।
স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, কয়েক মাস ধরে নারায়ণগঞ্জে ঘটে চলা একের পর এক অপহরণ-গুম-খুনের ঘটনায় পুরো জেলার মানুষ ওসমান পরিবারের ওপর ক্ষুব্ধ। এমতাবস্থায় আগামী ২৬ জুন অনুষ্ঠেয় উপনির্বাচনে মানুষের কাছে ভোট চাইতে যেতে আতঙ্কে ভুগছেন পরিবারটির সদস্যরা। এর আগে ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনে এই সংকট ছিল না৷ তখন নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা-সিদ্ধিরগঞ্জ) আসনে শামীম ওসমান ও নারায়ণগঞ্জ-৫ (শহর ও বন্দর) আসনে তাঁর বড় ভাই নাসিম ওসমান বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সাংসদ নির্বাচিত হন৷ গত ২৮ এপ্রিল নাসিম ওসমান মারা যাওয়ায় তাঁর আসনটি শূন্য হয়৷
উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগ এ আসনটি জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দেওয়ার মাধ্যমে কার্যত ওসমান পরিবারকে ছেড়ে দিয়েছে৷ কারণ, এ জেলায় আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি, উভয় দলেরই রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে ওসমান পরিবার৷ কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এ উপনির্বাচনে পরিবারটি কাকে প্রার্থী করাবে, তা নিয়েও বারবার সিদ্ধান্ত বদল করেছে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে৷ এর মধ্যে প্রথম আলোচনায় আসে যে প্রয়াত নাসিম ওসমানের স্ত্রী পারভীন ওসমানকে দাঁড় করানো হবে৷ কিন্তু তাতে ভরসা না পেয়ে ছেলে আজমেরী ওসমানের কথা ভাবা হয়৷ কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ও মানুষের কাছে ভয়ংকর খুনি হিসেবে পরিচিত আজমিরী ওসমানের পক্ষে ভোট চাইতে গিয়ে গণরোষের মুখে পড়ার আশঙ্কার কথাও আলোচনায় আসে৷ এরপর নাসিম ওসমানের ছোট মেয়ে আফরিন ওসমানের নাম আসে৷ এই তিনটি নাম নিয়ে জাতীয় পার্টিতেও আলোচনা হয়৷ কিন্তু পরে একপর্যায়ে ওসমান পরিবারের বাইরের এক ব্যবসায়ীকেও প্রস্তাব করা হয়েছিল প্রার্থী হওয়ার জন্য৷ কিন্তু ওই ব৵বসায়ী রাজি হননি৷ তবে তিনি নির্বাচনে ওসমান পরিবারকে সহযোগিতা করবেন বলে আশ্বস্ত করেন। অনেকটা তাঁর আশ্বাসের কারণে শেষ মুহূর্তে শামীম ওসমানের ভাই সেলিম ওসমানকে দাঁড় করানোর সিদ্ধান্ত নেয় পরিবারটি৷ সে অনুযায়ী জাতীয় পার্টি গতকাল বুধবার দলের সংসদীয় বোর্ডের বৈঠকে সেলিম ওসমানকে প্রার্থী মনোনয়ন দেয়৷
এ উপনির্বাচন নিয়ে সাংবাদিকেরা গত শুক্রবার ঢাকায় শামীম ওসমানকে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘আমি টায়ার্ড, এই নির্বাচন নিয়ে আমার ও আমাদের পরিবারের কোনো আগ্রহ নেই।’
এ নির্বাচনে প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি অংশ নিচ্ছে না৷ তার পরও ওসমান পরিবারের ভীতির কারণ কী? জানতে চাইলে পরিবারটির ঘনিষ্ঠ একাধিক সূত্র জানায়, এমনিতে নারায়ণগঞ্জে পরিবারটির ভাবমূর্তি ভালো নয়৷ ২০১১ সালের ৩০ অক্টোবর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করেও শামীম ওসমান হেরে যান সেলিনা হায়াৎ আইভীর কাছে৷ এরপর ভোটের সময় আইভীর পক্ষে কাজ করা সংস্কৃতিকর্মী দিদারুল আলম (চঞ্চল) হত্যা, মেধাবী ছাত্র ত্বকী হত্যাসহ বিভিন্ন ঘটনায় আরও ব্যাপকভাবে বিতর্কিত হয় ওসমান পরিবার৷ এর সঙ্গে সর্বশেষ যোগ হয়েছে আইনজীবী চন্দন সরকার, কাউন্সিলর নজরুল ইসলামসহ সাতজনকে অপহরণ ও খুনের ঘটনা৷ এ ঘটনায় র‌্যাব-১১-এর সাবেক তিন কর্মকর্তার পাশাপাশি অনেকের সন্দেহের আঙুল শামীম ওসমানের দিকে৷ এ-সংক্রান্ত মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনের সঙ্গে শামীম ওসমানের টেলিফোনে কথোপকথন সম্প্রতি প্রকাশ হওয়ায় এ সন্দেহ আরও জোরালো হয়েছে৷
সব মিলিয়ে ভোটের রাজনীিততে নাজুক অবস্থানে আছে ওসমান পরিবার৷ সুষ্ঠু ভোট হলে ব্যালটের মাধ্যমে মানুষ ক্ষোভের নীরব প্রকাশ ঘটাতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে৷ তা ছাড়া সাত খুনের ঘটনার পর ওই পরিবারের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থাকা সন্ত্রাসীদের বড় অংশ এখন এলাকা ছাড়া। একই সঙ্গে অনুগত পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা সম্প্রতি বদলি হয়ে গেছেন৷ তাই পেশিশক্তি খাটিয়ে নির্বাচনে জেতাটাও কঠিন হয়ে পড়েছে৷
এ নিয়ে নারায়ণগঞ্জ আদালত প্রাঙ্গণে কথা হচ্ছিল আইনজীবী মুজিবুর রহমানের সঙ্গে৷ তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, এবার উপনির্বাচনে ওসমানদের জন্য নারায়ণগঞ্জের সাধারণ মানুষই ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। অথচ পরিবারটি এর আগে কখনো সাধারণ মানুষকে ‘গোনার মধ্যে’ রাখেনি৷
সংিশ্লষ্ট কয়েকটি সূত্র থেকে জানা গেছে, এত দিন সরাসরি রাজনীতি থেকে দূরে থাকা সেলিম ওসমানকে এ নির্বাচনে প্রার্থী হতে কয়েক দিন ধরেই পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছিল। কিন্তু জাতীয় পার্টি থেকে দাঁড়ালে হেরে যাওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকায় তিনি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ থেকে প্রার্থী হওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ দেখান৷ কিন্তু আওয়ামী লীগ এই আসনে কোনো প্রার্থী না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় সে পথ রুদ্ধ হয়ে যায়।
এদিকে এ উপনির্বাচনে ওসমান পরিবারের দুশ্চিন্তার আরেকটি কারণ হলো সাবেক সাংসদ ও আওয়ামী লীগের নেতা এস এম আকরাম, ত্বকীর বাবা ও নাগরিক সমাজের নেতা রফিউর রাব্বি ও নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন। এই তিনজনই মনোনয়নপত্র কিনেছেন৷ তিনজনই ওসমান পরিবারের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সরব৷ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তাঁরা একযোগে সেলিনা হায়াৎ আইভীর পক্ষে সক্রিয় ছিলেন৷ অবশ্য তাঁদের মধ্যে শেষ পর্যন্ত একজন প্রার্থী থাকার সম্ভাবনা বেশি৷
জানতে চাইলে এস এম আকরাম প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘আমি, আনোয়ার, রাব্বি, তিনজনে মিলে সেলিনা হায়াত্ আইভীর মেয়র নির্বাচন করেছি। আমাদের মধ্যে কোনো বিভেদ নেই। আমাদের লক্ষ্য ও আদর্শ এক। আর, তা হলো হত্যা, গুম, সন্ত্রাস থেকে নারায়ণগঞ্জের মানুষকে মুক্ত করা।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

The Weeklydesh newspaper