এখতিয়ার ও শর্ত ভেঙে জমি ইজারা দিলেন লতিফ সিদ্দিকী

1

২০১৩ সালে ক্ষমতা ছাড়ার চার দিন আগে ঢাকার মতিঝিলে চট্টগ্রাম সমিতিকে জমি ইজারা দিয়ে গেছেন বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের তখনকার মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী৷ এখন পাট মন্ত্রণালয় বলছে, তখনকার মন্ত্রীর ইচ্ছায় এটা হয়েছিল এবং এটি ছিল মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারবহির্ভূত কাজ৷
বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের জমি ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিক্রির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অনুসন্ধানের জবাবে দেওয়া চিঠিতে এ কথা বলেছে মন্ত্রণালয়৷ চিঠিতে আরও বলা হয়, ওই ইজারা দিতে গিয়ে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দুটি শর্তও ভঙ্গ করা হয়েছে৷
আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী নিশাত জুট মিলের ১১ কাঠা ১৩ ছটাক জমি গত বছর চট্টগ্রাম সমিতি, ঢাকাকে ৯৯ বছরের জন্য ইজারা দেন৷ মতিঝিলে মধুমতি সিনেমা হলের পেছনে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের মালিকানাধীন ওই জমির বর্তমান বাজারমূল্য ১৫০ কোটি টাকা বলে মনে করা হয়। চট্টগ্রাম সমিতিকে জমিটি এক কোটি এক লাখ টাকায় ৯৯ বছরের জন্য ইজারা দেওয়া হয়৷ ওই সমিতির সভাপতি লতিফ সিদ্দিকীর স্ত্রী লায়লা সিদ্দিকী৷ লতিফ সিদ্দিকী এখন ডাক ও টেলিযোগাযোগ, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তিমন্ত্রী৷
পাট মন্ত্রণালয় প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের এই জবাব পাঠানোর পাশাপাশি জমিটি বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষেত্রে আইনগত কী কী ব্যত্যয় ঘটেছে, তা খতিয়ে দেখতে আইন মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করেছে৷
গত বছরের ১১ জুন চট্টগ্রাম সমিতি হাসপাতাল বানানোর কথা বলে জমির জন্য আবেদন করে৷ গত আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার চার দিন আগে গত বছরের ২০ অক্টোবর তৎকালীন বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকী তাতে সম্মতি দেন। পরদিন ২১ অক্টোবর বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব নীলরতন সরকার চট্টগ্রাম সমিতির তখনকার সভাপতি রেজাউল হক চৌধুরী মুশতাককে একটি চিঠি দিয়ে জমিটি ইজারা দেওয়ার কথা জানান৷ ইজারামূল্য প্রতিবছর এক লাখ এক হাজার ১০১ টাকা হিসেবে ৯৯ বছরের জন্য এক কোটি এক লাখ এক হাজার ১০১ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর ১২ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ সরকার শপথ নেয়৷ তার তিন দিনের মাথায় ১৫ জানুয়ারি চট্টগ্রাম সমিতিকে জমিটি ইজারা দলিল করে দেয় মন্ত্রণালয়৷ দলিলে দেখা যায়, জমিদাতা বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব ফণীভূষণ চৌধুরীকে দাতা এবং গ্রহীতা চট্টগ্রাম সমিতির পক্ষে এর ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি ও নির্বাচন কমিশনার আবদুল মোবারক, আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীর স্ত্রী চট্টগ্রাম সমিতির সভাপতি লায়লা সিদ্দিকী এবং সাধারণ সম্পাদক গিয়াস উদ্দীন খান এবং ট্রাস্ট সেক্রেটারি এম এমদাদুল ইসলাম৷
কমিশনার আবদুল মোবারকের বাড়ি চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলায়৷ মন্ত্রীপত্নী লায়লা সিদ্দিকীর বাড়ি পটিয়ায়, গিয়াস উদ্দীন খান ও এম এমদাদুল ইসলামের বাড়ি রাঙ্গুনিয়ায়।
জমিটি ইজারা অনুমোদনের নথিতে আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী লিখেছেন, ‘মেজবান চট্টগ্রাম সমিতির একটি আকর্ষণীয় বাৎসরিক অনুষ্ঠান। ব্যক্তিগত জীবনে আমি চট্টলা কন্যার পাণি গ্রহণ করেছি। ঢাকাস্থ চট্টগ্রাম সমিতি একটি সুপ্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান। তাদের হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় এই ভূমি খণ্ডটির প্রয়োজনীয়তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মানবতার সেবায় তাদের সহযোগিতা করার নৈতিক দায়িত্ববোধ করছি।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে লতিফ সিদ্দিকী ১১ মে মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম সমিতির নামে ওই জমি ইজারা দিয়ে আমি আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার ও রাষ্ট্রীয় আইনের কোনো বরখেলাপ করিনি। যা করেছি তা লিখিতভাবে জানিয়ে করেছি। আমি ক্ষমতার অপব্যবহার করিনি, ক্ষমতার প্রদর্শন করেছি।’
লতিফ সিদ্দিকী বলেন, বিএনপির আমলে সাবেক যোগাযোগ ও রেলমন্ত্রী নাজমুল হুদা বঙ্গবাজারের পাশে রেলের জমি তাঁর স্ত্রী সিগমা হুদার প্রতিষ্ঠানের নামে ইজারা দিয়েছিলেন। ওই বরাদ্দ আওয়ামী লীগ এসে বাতিল করেনি। এই জমিটির ইজারাও সরকার বাতিল করবে না।
জমিটি এখনো বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) দখলে আছে৷ চট্টগ্রাম সমিতি এক কোটি টাকা ইজারামূল্য পরিশোধ করেছে এবং জমিটি বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য বিজেএমসিকে চিঠি দিয়েছে৷
গত ১২ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠানো বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব নীলরতন সরকারের স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে, এই প্লটটি বিক্রির কোনো এখতিয়ার বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের নেই। এই মন্ত্রণালয়ের সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীর লিখিত নির্দেশে ওই ইজারা দেওয়া হয়। এতে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের শর্তও মানা হয়নি।
চিঠিতে বলা হয়, এই জমি গত বছরের ২ অক্টোবর পরিত্যক্ত সম্পত্তি থেকে অবমুক্ত করে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের অনুকূলে অবমুক্ত করে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। অবমুক্ত করার ক্ষেত্রে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় দুটি শর্ত দেয়। তা হলো, প্লটটি কখনো বিক্রয় ও হস্তান্তর করা যাবে না এবং উন্নয়নমূলক কার্যক্রম গ্রহণের মাধ্যমে এটি বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
মিন্ত্রপরিষদ বিভাগ থেকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের যে কার্যপরিধি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে, তাতে পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়কে তাদের কোনো জমি এভাবে ইজারা দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। েকানো পাটকলকে বিলুপ্ত ঘোষণা করলে তা বেসরকারীকরণ কমিশনের মাধ্যমে দরপত্র আহ্বান করে করতে হয়। দরপত্র কমিটি জমি ইজারা বা বিক্রির সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
১১ মে কথা হয় লায়লা সিদ্দিকীর সঙ্গেও৷ স্বামী মন্ত্রী বলেই জমিটি ইজারা পেয়েছেন কি না—প্রশ্ন করলে লায়লা সিদ্দিকী প্রথম আলোকে বলেন, ‘এর আগে আমরা সমিতির হাসপাতালের জন্য পূর্বাচলে প্লট চেয়েছিলাম, পাইনি৷ এটা সত্য, স্বামী মন্ত্রী হওয়ায় আমাদের পক্ষে এই মন্ত্রণালয়ে জমির জন্য যোগাযোগ করা সহজ হয়েছে৷ উনি হৃদয়বান মানুষ, জনস্বার্থে জমিটি দিয়েছেন৷ যেহেতু আমরা জনস্বার্থে হাসপাতালের জন্য জমিটি চেয়েছি, তাই এতে অন্যায়ের কিছু নেই৷’
জমিটি ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হওয়ার আড়াই মাস পর চট্টগ্রাম সমিতির দ্বিবার্ষিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে ২০১৪-১৫ সালের জন্য বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সভাপতি নির্বাচিত হন লায়লা সিদ্দিকী ও সাধারণ সম্পাদক গিয়াস উদ্দীন খান৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

The Weeklydesh newspaper