তাহলে কেমন হবে মোদির ভারত

1


ভারতীয় সমাজের কত সাধারণ স্তর থেকে উঠে এসেছেন নরেন্দ্র মোদি, সেটা বোধহয় এর মধ্যে জেনে গেছি সবাই। তার নেতৃত্বে লোকসভা নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিপুলভাবে জিতেছে বিজেপি, এটাও পুরনো খবর। 

মোদি তার নেগেটিভ ইমেজ ঝেড়ে ফেলেছেন অনেক আগেই। গুজরাটের দাঙ্গায় তার দুই হাত রক্তে রঞ্জিত, এ কথা আমাদের মতো কিছু লোক চিরকালই বলবে অবশ্য। এও সত্য, ওই দাঙ্গার পর গুজরাটের ক্ষমতায় তিনি ফিরে আসেন আরও শক্তিশালী হয়ে। এসে এক পর্যায়ে উপহার দেন তার বহুল আলোচিত ‘গুজরাট মডেল’।

অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলে আর বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়লেই ‘উন্নয়ন’ নিশ্চিত হয় কিনা, তা নিয়ে বিতর্ক ছিল। এখনও আছে। আয়-বৈষম্য বেড়ে যাওয়াটা এ ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা কিনা, কর্মসংস্থান হলেও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে প্রকৃত আয় কমে গেলে পরিস্থিতিটা কী দাঁড়ায়, এসব প্রশ্ন তুলে আপাতত লাভ নেই অবশ্য।ভারতীয় ভোটারের একটি বড় অংশ নরেন্দ্র মোদির গুজরাট মডেলকে বিরাট ঘটনা বলেই কবুল করেছে এবং সারা ভারতে মোদি এটা প্রতিষ্ঠিত করে ছাড়বেন বলে বিশ্বাসও করেছে তারা। যেসব কারণে মোদির বিজেপি ও তার মিত্রদের এভাবে ভোট দিয়েছে ভারতীয়রা, তার মধ্যে এটি নাকি কাজ করেছে প্রবলভাবে।

কেউ ভোটারদের বোঝাতে পারেনি, একই সময়ে গুজরাটের চেয়েও বেশি হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে ভারতের কয়েকটি রাজ্য। গুজরাটে প্রবৃদ্ধি বাড়লেও সামাজিক সূচকে এর অর্জন মোটেও সুখকর নয়। আয়-বৈষম্য অনেক বেড়েছে শুধু তা-ই নয়, পরিবেশের ওপর উন্নয়নের চাপ বেড়েছে গুজরাটে। এর মানে ‘ইনক্লুসিভ গ্রোথ’ বা অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি হয়নি সেখানে।

দফায় দফায় রাজ্যটি পরিচালনা করলেও মোদি ওখানে সুশাসনও নিশ্চিত করতে পারেননি। তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও স্বেচ্ছাচারের নানা অভিযোগ রয়েছে। পুলিশকে নিষ্ক্রিয় রেখে ও নিজে নির্দেশনা দিয়ে গুজরাটে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা চালানোর অভিযোগ রয়েছে যার বিরুদ্ধে, তার পক্ষে কতটাই-বা সংশোধিত হওয়া সম্ভব?

মোদি সংশোধিত হতেন, যদি তার মধ্যে আত্মশক্তির জাগরণ ঘটত। প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে আমরা তেমন দৃষ্টান্ত দেখতে পাই। অন্য উপায়েও মোদি সংশোধিত হতেন, যদি ভারতীয় তদন্ত ও বিচার ব্যবস্থা তাকে দোষী সাব্যস্ত করতে পারত। সেটি সম্ভব হয়নি বলেই শুধু গুজরাট নয়, সারা ভারতে আমরা দেখলাম ‘মোদি-ঝড়’। নির্বাচনী ফল প্রকাশের সময় বোঝা গেল, ওটা আসলে ছিল ‘সুনামি’।

বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট জিতবে বলেই মনে করা হচ্ছিল। দেখা গেল, বিজেপি একাই সরকার গঠনের মতো আসন পেয়ে গেছে। এত ভালো ফল আর করেনি দলটি। ১৯৮৪ সালের পর ভারতের কোনো দলই করেনি। আর ঘটনাটা ঘটল নরেন্দ্র মোদির মতো ব্যক্তির নেতৃত্বে। তাই এদেশের এক তরুণ সম্পাদকের দুঃখমিশ্রিত প্রশ্ন– ‘হোয়াই মোদি’?বিজেপি জোট তো এর আগেও ভারত শাসন করেছে। সেটি অটল বিহারি বাজপেয়ির মতো উদারপন্থী মানুষের নেতৃত্বে। গুজরাটে দাঙ্গার পর তিনি নিজ দলভুক্ত মোদির ব্যর্থতার দিকে আঙুল তুলেছিলেন সরাসরি। তাতে লাভ হয়নি।

মোদিকে দোষী প্রমাণ করতে পারেনি কেউ। উল্টো তিনি শক্তিশালী হন গুজরাটে ও দলে। বেশ ক’জন সিনিয়র নেতা থাকতেও বিজেপি তাকেই নেতা বানিয়ে পাঠায় লোকসভা নির্বাচনে। এতে অপ্রতিদ্বন্দ্বী বীরের মতোই লড়েছেন মোদি। নিজেকে নিয়ে গেছেন এমন এক উচ্চতায়– যেখানে ২০০২ সালে গুজরাটে কী ঘটেছিল, তা উল্লেখ করে কিছু বলাটা যেন খোঁটা দেওয়ার মতো বিষয় হয়ে পড়েছে।

নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি কত আসন পেয়েছে, তার পাশাপাশি বোধহয় দেখা দরকার প্রদত্ত ভোটের কত শতাংশ পেয়েছেন তারা। সেটি দেখছি ৩১ শতাংশ। দেশের এক অগ্রজপ্রতীম সাংবাদিক কিছুটা আশ্বস্ত হয়েই যেন লিখেছেন, বাকি বিপুল সংখ্যক মানুষ কিন্তু বিজেপিকে ভোট দেয়নি। দলটির শরিকদের ভোটের দিকে তিনি তাকাননি বোধহয়। তাহলে দেখতে পেতেন, তাদের মোট প্রাপ্ত ভোট ৩৯ শতাংশ!

তুলনায় ভারতীয় কংগ্রেসের ভোট ২০ শতাংশেরও কম। তার জোট শরিকদের ভোট যোগ করলে হয় ২১ শতাংশ। কংগ্রেস খারাপ করেছে শুধু তা-ই নয়, তার শরিকরাও করেছে। তুলনায় বিজেপির শরিকরা করেছে ভালো। এদের মধ্যে একাধিক দল রয়েছে, যারা বিজেপির চেয়েও উগ্রবাদী। একা সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেলেও বিজেপি কিন্তু জোটসঙ্গীদের নিয়েই সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। ভয়টা সেখানেও।

ভয় কিছুটা কাটবে, যদি দেখা যায় নির্বাচনী প্রচারণা চলাকালে মোদি ও তার অনুসারীরা বাংলাদেশ সীমান্ত পর্যন্ত এসে যা যা বলেছেন, তার বাস্তবায়নে উদ্যোগী হচ্ছেন না। এরই মধ্যে কিন্তু খবর রটেছে, ‘অনুপ্রবেশ’ রোধে পৃথক একটি মন্ত্রণালয় গঠন করতে চান মোদি। অনুপ্রবেশ সত্যিই ঘটে থাকলে সেটি রোধে উদ্যোগী হতে পারে ভারত। এটা হল রাজনৈতিক বা আইনগত দিক। এর অন্য দিকও আছে।

যেসব দেশ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করে, সেখানে মূলত কাজের খোঁজে যায় মানুষ। প্রতিবেশি দেশের মানুষ স্বভাবতই বেশি সুযোগ নিয়ে থাকে এ ক্ষেত্রে। তবে বাংলাদেশ থেকে কিছু মানুষ স্থায়ীভাবে ভারতে চলে যাচ্ছে, এখানে থাকতে না পেরে। এটা আমাদের লজ্জা। মোদি ও তার অনুসারীরা এদের ব্যাপারে মুখে অন্তত সংবেদনশীল। তারা এদের বলছেন ‘শরণার্থী’। মোদিরা মন্ত্রণালয় খোলার পক্ষে আসলে ‘মুসলিম অনুপ্রবেশকারী’ রোধে।সেটি তারা শেষ পর্যন্ত করবেন কিনা কে জানে; তবে নির্বাচনে এ স্লোগানও কাজে দিয়েছে। হিন্দুত্ববাদী ভোটাররা প্রভাবিত হয়েছে এতে। এর বিরুদ্ধে চোখা বক্তব্য দিয়ে আবার পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম ভোটারদের মন জয় করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এ রাজ্য দীর্ঘদিন ছিল সিপিএম নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্টের দখলে। এরপর সেখানে অনেকটা মোদির মতো করেই ঘটে মমতা নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসের উত্থান। লোকসভা নির্বাচনে তার অবস্থানও দৃঢ়তর হয়েছে এবার। মমতা সাফল্য পেয়েছেন নিয়মিত রাজনীতির সঙ্গে সংশ্রবহীন কালচারাল সেলিব্রেটিদের প্রার্থী করে। বিজেপিও এটি করেছে। এদের ভেতর থেকে বিজয়ী একজন মন্ত্রী হবেন বলেও শোনা যাচ্ছে।

বিজেপি ও জোটসাথী দলের বেশ কয়েকজন সিনিয়র নেতা হবেন মোদির মন্ত্রী। সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীকে যতই বলা হোক ‘ফার্স্ট অ্যামং দ্য ইক্যুয়ালস’, ভারতে এখনও সেটা কার্যকর হয়নি বৃটেনের মতো। আর এবারের লোকসভা নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদির যে ধরনের উত্থান ঘটেছে, তা দেখে ভড়কে গেছে সবাই। তিনি হবেন ভারতের কেন্দ্রে একটি শক্তিশালী সরকারের শক্তিশালী প্রধানমন্ত্রী।

তিনি তো জিতেছেন অনেকটা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মতো করে। কংগ্রেস যেটা পারেনি, বিজেপি সেটা পেরেছিল। নরেন্দ্র মোদিকে তাদের প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী করে নামিয়ে দিয়েছিল মাঠে। তার বিপরীতে দাঁড়াতেই পারেননি সোনিয়াপুত্র রাহুল গান্ধী। পারিবারিক আসনে নিজের জয়টাই যেন কেবল নিশ্চিত করতে পেরেছেন তিনি। এ নির্বাচনে তার আর কোনো সাফল্য কি রয়েছে?

একাধিক বিধানসভা নির্বাচন পরিচালনা করতে গিয়েও রাহুল ব্যর্থ হন এর আগে। ততদিনে অবশ্য তার মায়ের নেপথ্য নির্দেশনায় পরিচালিত মনমোহন সরকার অজনপ্রিয় হয়ে পড়েছে। রাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায়ে একাধিক বড় দুর্নীতির অভিযোগে সংকটে পড়ে গেছে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ (ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স) সরকারের ভাবমূর্তি।

উচ্চমাত্রার প্রবৃদ্ধি অর্জনের ধারা থেকেও বিচ্যুত হয়েছে ভারত। বিনিয়োগের গতি মন্থর আর নতুন কর্মসংস্থান কমতে শুরু করেছে। বিশেষত শিক্ষিত মধ্যবিত্ত তরুণদের মধ্যে দেখা দিয়েছে হতাশা। এজন্য অবশ্য রাহুলকে দায়ী করা যায় না। এর দায় মনমোহন সরকারকেই নিতে হবে।

অর্থনীতিতে গতিশীলতা ধরে রাখা অবশ্য সহজ নয়। ভারত যে মুক্তবাজার অর্থনীতিতে প্রবেশ করেছে, তার সুফল যেমন আছে; কুফলও আছে। কুফল হল, একটা পর্যায়ে উচ্চ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে না পারা। প্রবৃদ্ধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আয়-বৈষম্য হ্রাসের বদলে তা বেড়ে যাওয়া। রাষ্ট্রীয় নীতিতে সম্পদশালীদের প্রভাব বেড়ে যাওয়া।

প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়াটাও স্বাভাবিক। মনমোহন সরকারের শেষ সময়টায় খাদ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতি বেড়ে গিয়েছিল অনেক। পেঁয়াজের মতো নিত্যপণ্যের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক দাম ধরে রাখাটাও হয়ে ওঠে চ্যালেঞ্জপূর্ণ। প্রাকৃতিক দুর্যোগও বাড়িয়ে তোলে সংকট। ভারতের মতো জনবহুল দেশে খাদ্য-নিরাপত্তা কিছুটা ভেঙে পড়লেও তা সামলে ওঠা কঠিন।

বেশ কিছু রাজ্যে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে দারিদ্র্য পরিস্থিতি কিন্তু এখনও বেশ খারাপ। ভারতের উন্নয়ন-অগ্রগতির মধ্যে এটা রয়ে গেছে অনেকটা বেমানানভাবে। অমর্ত্য সেনের মতো অর্থনীতিবিদ এটা বলতে গিয়ে কিন্তু বাংলাদেশের প্রশংসা করেন। সামাজিক সূচকে আমাদের অর্জন শুধু ভারত নয়, অনেক দেশের জন্যই দৃষ্টান্ত। আমাদের ‘গ্রোথ’ ভারতের চেয়ে ‘ইনক্লুসিভ’ বলে মনে করেন মি. সেন।অমর্ত্য সেনও কিন্তু মোদি ও বিজেপির উত্থান মানতে পারেননি। নির্বাচনের আগে এমন আলামত দেখতে পেয়ে তিনি বলেছিলেন, এটা বহুত্ববাদী ভারতের জন্য মঙ্গলজনক হবে না। বহুত্ববাদী ভারতকে বিজেপি ও তার সঙ্গীরা একমুখী বা হিন্দুত্ববাদী করে তুলতে চায়, এটা কারও অজানা নয়। বিজেপিও এটা গোপন করে না শুরু থেকে।

গোপন করবে কেন? সে তো দেখতেই পাচ্ছে, এটা তার ‘স্ট্রেন্থ’ বা শক্তি। আমরা অনেকে সাদা চোখে ভারতকে বলে ফেলি সেক্যুলার বা ধর্মনিরপেক্ষ দেশ। খতিয়ে দেখি না, ভারতীয় সংবিধানে এটা আনা হয়েছে ১৯৪৭-এর অনেক পরে। প্রশ্ন হল, এর মধ্যে কি ভারতীয় সমাজ ও রাজনীতিকে ধর্মনিরপেক্ষ করে ফেলা হয়েছে? নাকি সেটি করা হবে বলে স্থির করেছে ভারত?

ভারতীয় কংগ্রেস ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলে আসছে– হিন্দুত্ববাদের বিরোধিতা না করে। রাজনীতিতে ওটা করা গেলেও ভারতীয় সমাজে হিন্দুত্ববাদের বিরোধিতা খুব কঠিন। বিজেপিসহ অনেকেই বলেন, এটা হল ‘ভারতের ঐক্যসূত্র’। বলা হচ্ছে, এটা ধর্ম নয়– সংস্কৃতি। সমস্যা হল, কংগ্রেস রাজনীতিতেও হিন্দুত্ববাদের বিরোধিতা না করে এর সঙ্গে আপস করে চলছে দীর্ঘদিন ধরে। এ ক্ষেত্রে তার অবস্থা অনেকটা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মতো।

সোনিয়া গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস অবশ্য রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল পরপর দুই মেয়াদ। দ্বিতীয় মেয়াদেও ক্ষমতায় টিকে যাওয়ার পর অনেকে ভেবেছিলেন, অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে সুশাসন নিশ্চিত করে কংগ্রেস হয়তো তৃতীয় দফায়ও জনতার ম্যান্ডেট পাবে।

নির্বাচনে ‘খুব বাজেভাবে’ হেরে গেলেও এটা কি অস্বীকার করা যাবে, এশিয়ার উদীয়মান শক্তি হিসেবে এমনকি চীনের পাশে ভারতের নাম উচ্চারিত হতে শুরু করে সোনিয়া-মনমোহন শাসনামলেই? ‘ব্রিকস’ বলতে এখন বোঝানো হয় ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, চায়না ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে। এরা হল উদীয়মান, উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী আর এরাই নাকি আগামীতে নেতৃত্ব দেবে বিশ্বের অর্থনৈতিক অভিযাত্রা। মোদির নেতৃত্বে বিজেপি রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার আগেই কিন্তু ভারত এ মর্যাদা অর্জন করেছে।

এখন কথা হল, বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার কি দেশকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে? কংগ্রেস যতখানি মুক্তবাজারের পক্ষে, মোদির বিজেপি কিন্তু তার কয়েক কাঠি সরেস। মোদি গুজরাটে যেটি করেছেন, সেটি আসলে পুঁজিবাদী পন্থা অনুসরণ। তা করতে গিয়ে পশ্চিমা দেশগুলো যে মান বজায় রাখে, এর পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা যেভাবে নিশ্চিত করে– নরেন্দ্র মোদি সেটি করেননি।

রাজ্যে বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণে অনিয়মের অভিযোগ কিন্তু রয়েছে মোদির বিরুদ্ধে। বড় ব্যবসায়ীদের তিনি অনৈতিক সুবিধা দিয়েছিলেন। মুশকিল হল, লোকসভা নির্বাচনে তার ‘সাফল্যের’ পাশাপাশি ব্যর্থতার এ দিকগুলো উঠে আসতেই পারল না। ‘ব্যর্থ ও দুর্নীতিগ্রস্ত’ কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকারকে ফেলে দিতে ভারতের ভোটাররা নাকি খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল।
নির্বাচনী প্রচারণাটাও ঠিকমতো করতে পারেননি বলে এখন সমালোচনা হচ্ছে রাহুলের। এও বলা হচ্ছে, তিনি নাকি বুঝতে পারছিলেন– উন্মাদনার মাঝে প্রচারণায় কাজ হবে না।

আমাদের দেশেও এমনটি হয়। এক একটা মেয়াদের পর মানুষ পরিবর্তনের জন্য উন্মুখ হয়ে পড়ে। আগের বার যাকে ফেলে দিয়েছিল, তাকেই আবার মাথায় করে এনে রাষ্ট্রক্ষমতায় বসায়। তা সত্ত্বেও বিজেপিকে ভারতের জনগণ এমনিভাবে ক্ষমতায় নিয়ে আসবে, এটা নাকি মোদিও ভাবতে পারেননি।

ভাবতে পারেননি– এতটা তার প্রাপ্য ছিল না বলেই। জিতলেও বিপুল বিজয় নাকি তারা পেতেন না, যদি ভারতের ‘বিগ বিজনেস’ ও মিডিয়া মোদির নেতৃত্বে বিজেপির পক্ষ না নিত। রিলায়েন্সের মতো কোনো কোনো বিজনেস গ্রুপ প্রকাশ্যে মোদির হয়ে টাকা ঢেলেছে। ভারতব্যাপী প্রচারণায় বিজেপির এত ব্যয় হয়েছে যে, এখন সমালোচনা হচ্ছে তাদের বহুল প্রশংসিত নির্বাচন কমিশন এদিকে দৃষ্টি দেয়নি বলে। কথা হল, মোদির বিপুল বিজয়ে অর্থ ও বুদ্ধি বিনিয়োগকারীরা কি তার জনবাদী নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়াবেন না?

মোদি তো কথা দিয়েছেন সব পক্ষকেই। তাদের মাতিয়েও তুলেছেন। কিন্তু দেশপরিচালনায় সবার স্বার্থ কি সমুন্নত রাখতে পারবেন? আমরা দেখি, একটি অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নেও পরস্পরবিরোধী পক্ষের স্বার্থে সমন্বয় ঘটানো যায় না। বিশাল ও বিচিত্র ভারতে মোদিকে তো পার করতে হবে পাঁচটি বছর। বড় ম্যান্ডেট নিয়ে আসায় প্রত্যাশার বড় চাপেও থাকতে হবেতাকে।

নিজে যে সামাজিক স্তর থেকে এসেছেন, তাদেরই-বা কতটা কল্যাণ করতে পারবেন তিনি? দরিদ্র মুসলিমদের কল্যাণ চিন্তাও কি একেবারে পরিহার করতে পারবেন সরকারপ্রধান হয়ে? মধ্যবিত্ত ও তরুণ কর্মজীবীর ‘স্বপ্ন’ পূরণ কিন্তু সহজ হবে না কর্পোরেট ভারতে। আর গুজরাট মডেল ভারতব্যাপী বাস্তবায়ন করা হলে তো আয়-বৈষম্য আরও বাড়বে। জানামতে, ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে মূল্যস্ফীতির রাশ টেনে ধরতে। এ অবস্থায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে অর্থনীতিকে দ্রুত চাঙ্গা করে তোলা কিন্তু কঠিন।

মোদির শাসনামলে ভারতের অর্থনীতি চাঙ্গা হলে তো ভালোই। তাতে আমরাও হয়তো কিছু সুফল পাব। ভারতীয় জনগণকে কিছুটা ভালো থাকতে দেখলে নিশ্চয়ই ভালো লাগবে আমাদের। মোদি সরকার প্রত্যাশার অর্ধেক পূরণ করতে পারলেও তাদের নেতিবাচক দিকগুলো কম প্রকাশ পাবে। হিন্দুত্ববাদ নিয়ে কম নাড়াচাড়া হবে বহুত্ববাদী ভারতে। ক্ষুদ্র প্রতিবেশির সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নেও হয়তো কিছু অগ্রগতি হবে মোদির শাসনামলে।

শেষ ক’বছরে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তীব্র হয়ে উঠেছিল, সে বিষয়ে শুরু থেকে সিরিয়াস থাকতে হবে নরেন্দ্র মোদিকে। তা হল, খোদ সরকারকে দুর্নীতিমুক্ত রাখা। এখন কথা হল, নেপথ্য থেকে হিরো বানিয়ে মোদিকে যারা ক্ষমতায় এনে বসিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে, তারা তাকে ‘ক্লিন’ থাকতে দেবেন তো?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

The Weeklydesh newspaper