সংগঠনের প্রতি নজর নেই আওয়ামী লীগের, সর্বত্রই হ-য-ব-র-ল

1

সংগঠনের প্রতি কোনই নজর নেই ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের। ‘মধুচন্দ্রিমা’ যেন কাটছেই না ঐতিহ্যবাহী ও প্রাচীন এই রাজনৈতিক দলটির। দ্বিতীয় মেয়াদে এসেও সাংগঠনিক স্বাধীন সত্তা হারিয়ে সরকারে একাকার হয়ে পড়েছে দলটি। কেন্দ্র থেকে প্রান্ত পর্যন্ত দলটির সর্বত্র হ-য-ব-র-ল অবস্থা চললেও যেন দেখার কেউই নেই। যে যার ইচ্ছে মতো চলছে। সাংগঠনিক কর্মকান্ডে থেকেও যেন নেই দলটির সাধারণ সম্পাদক। কেন্দ্র থেকে সম্মেলনের নির্দেশ গেলেও মানেন না জেলা বা মহানগর নেতারা।

এমনই অবস্থায় ঝিমিয়ে পড়া নেতাকর্মীদের চাঙ্গা ও সংগঠনকে শক্তিশালী করতে জেলাওয়ারী সম্মেলনের কেন্দ্রীয় নেতাদের আওয়াজ এখন কার্যত ফাঁকা বুলতেই পরিণত হয়েছে। সারাদেশে নড়বড়ে সাংগঠনিক অবস্থানকে শক্তিশালী ভিতের ওপর দাঁড় করানোর কেন্দ্রীয় নেতাদের হম্বিতম্বি শুধুই গর্জনেই পরিণত হয়েছে। বছরের পর বছর সংগঠনের প্রতি কেন্দ্রীয় নেতাদের অমনোযোগিতায় ক্ষোভ-অসন্তোষে তৃণমূল নেতাকর্মীরা মাঠের রাজনীতিতে ক্রমেই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছে।

সরকারের প্রথম মেয়াদের ৫ বছরে সম্মেলনের মাধ্যম সংগঠন গোছানোর ব্যর্থতার বড় মাশুল ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগকে গুনতে হলেও তা থেকেও শিক্ষা নেয়নি দলটির বর্তমান কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। একমাত্র ঢাকা মহানগর ছাড়া সাংগঠনিক বিপর্যস্ততার কারণে সারাদেশের কোথাও বিএনপি-জামায়াত জোটের ভয়াল সহিংসতা রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলায় ব্যর্থ হয়েছে আওয়ামী লীগ। দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসারও এক শ’ দিন পেরিয়ে গেছে। তবুও যেন ঘুম ভাঙ্গছে না দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের। শুধু দিবসভিত্তিক কর্মসূচী নির্ভর আওয়ামী লীগের ঘুম ঠিক কবে ভাঙ্গবে, তা বলতে পারে না কেউ-ই।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বছরের পর বছর জেলা, মহানগর, থানা, উপজেলায় সম্মেলন না হওয়ায় সাংগঠনিকভাবে সামনের এগোনোর পরিবর্তে ক্রমেই যেন পিছিয়ে পড়ছে ক্ষমতাসীন দলটি। অঙ্গ সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীদের ওপর জেলার নেতাদের নিয়ন্ত্রণ নেই। গত পাঁচ বছরের মতো এবারও সাংগঠনিকভাবে কেউ কারও খোঁজ রাখছেন না। কোন কর্মসূচী ছাড়া নেতারা এখন দলীয় কার্যালয়ে বসেন না। কর্মসূচীও পালন করা হয় দায়সারাভাবে। ২০০১ ও ২০১২ সালে আওয়ামী লীগের দুইবার কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে চমকের কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হলেও মাঠ পর্যায়ে দলকে গুছিয়ে তুলতে পারেনি তারা।

অতীতের মতো দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর এবারও কেন্দ্রীয় কোন উদ্যোগ না থাকায় প্রান্ত থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত দলের নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশ সাংগঠনিক কাজের চেয়ে যে কোন উপায়ে অর্থ উপার্জনেই বেশি মনোযোগী হয়ে পড়েছে। দীর্ঘ সম্মেলন না হওয়ায় দলটির সর্বত্র দ্বন্দ্ব-কোন্দল, আধিপত্য বিস্তার আর নিয়ন্ত্রণ না থাকায় অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোর মধ্যে খুনোখুনি, মারামারি, দখল-চাঁদাবাজিসহ এন্তার অনৈতিক কর্মকা- জড়িয়ে পড়ায় সরকারের ব্যাপক অর্জন ও সাফল্যকেও প্রায়শই ম্লান করে দিচ্ছে। দল ক্ষমতায় আসার পর থেকেই যে-যার ইচ্ছেমতো চলছে। লাগাম টেনে ধরারও যেন কেউ নেই। স্থবির সংগঠনকে চাঙ্গা করার গত এক শ’ দিনে কোনই কর্মসূচী নিতে পারেনি বর্তমান আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটি।

কয়েকটি জেলার নেতাদের সঙ্গে কথা বললে তাঁদের সব ক্ষোভ যেন কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ওপর। তাঁদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগের প্রাণশক্তি হলো তৃণমূল সংগঠন। এই প্রাণশক্তি ফিরিয়ে আনতে কেন্দ্রীয় নেতাদের যেন কোনই উদ্যোগ নেই। মেয়াদ ফুরিয়ে গেলেও তৃণমূল পর্যায়ে সম্মেলনেরও কোন উদ্যোগ নেই। চেষ্টা নেই দলীয় কোন্দল নিরসনের কার্যকর কোন উদ্যোগ। কেন্দ্রীয় নেতাদের অমনোযোগিতায় ক্ষুব্ধ তৃণমূল নেতারা সংগঠনকে সুসংগঠিত করতে এখনই দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ কামনা করে বলেন, সদ্য সমাপ্ত উপজেলা নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় যে সাংগঠনিক বিশৃঙ্খলা দেখা গেছে, তা দলের ভেতরে অব্যবস্থাপনা ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-কোন্দলেরই বহির্প্রকাশ।

দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, তিন বছর পর পর কাউন্সিল হওয়ার কথা। তবে এক্ষেত্রে গঠনতন্ত্র উপেক্ষা করে দেড় যুগ পুরোনো কমিটি দিয়েই চলছে অধিকাংশ জেলা। কেন্দ্রীয় কমিটির বাইরে মেয়াদোত্তীর্ণ ৭৩টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে মাত্র ১২টি জেলার সম্মেলন হয়েছে গত পাঁচ বছরে। প্রায় ৫০০ উপজেলা ও থানা কমিটির মধ্যে সম্মেলন হয়েছে শ’ দেড়েক কমিটির। অন্তত ২০টি জেলায় পূর্ণাঙ্গ কমিটি নেই বহু বছর ধরে। ভারপ্রাপ্তদের দিয়ে চলছে ১৫টি জেলার কর্মকা-। তিনটি জেলায় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককের দুটি পদেই রয়েছেন ভারপ্রাপ্ত। আটটি জেলায় কাউন্সিল হয় না ১৬ বছর ধরে।

ঢাকা মহানগর আওয়ামীগের সম্মেলনের ১৫ মাস হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কমিটি হয়নি। নগর কমিটি চলছে ফ্রি-স্টাইলে। শুধু সম্মেলনই হয়েছে, নেতৃত্বে পরিবর্তন আসেনি। নামকাওয়াস্তে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে সম্মেলনের নামে বক্তৃতাবাজি চললেও কোথাও কমিটি ঘোষণা করা হয়নি। এ ছাড়া গত ৫ বছরে সাংগঠনিক অনেক সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে পারেনি দলটি। কেবল দিবসভিত্তিক কর্মসূচী পালন এবং সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যানে কয়েকটি সমাবেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল আওয়ামী লীগের দলীয় কর্মকান্ড।

দলের এরকম সাংগঠনিক পরিস্থিতি থাকায় ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিরোধী দলের আন্দোলন ও সহিংসতার বিরুদ্ধে মাঠপর্যায়ে আওয়ামী লীগ দলগতভাবে তেমন কোন প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি; বরং বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সংখ্যালঘুদের প্রশাসনকে নিরাপত্তা দিতে হয়েছে। যেসব জেলা ও মহানগর নেতারা বিএনপি-জামায়াত জোটকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলায় ব্যর্থ হয়েছে তাঁদের শাস্তির বদলে যেন উল্টো পুরস্কৃতই করা হচ্ছে। ব্যর্থতার কোন লজ্জাই যেন নেই ওইসব জেলার নেতাদের। বরং দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর আবারও দলীয় পদের দোর্দ- প্রতাপ খাটিয়ে লাভজনক সব কর্মকা-ের ওপর নিজেদের খবরদারি প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছে এসব ব্যর্থ নেতারা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলটির একাধিক নেতা বলেন, নির্বাচনের আগের কয়েক মাসে যেসব স্থানে বিএনপি-জামায়াত জোট তা-ব চালিয়েছে, সেসব স্থানে আওয়ামী লীগ সাংগঠনিকভাবে দুর্বল। মূলত নানাভাবে বিভক্ত হয়ে পড়া ও দীর্ঘদিন সম্মেলন না হওয়ার কারণেই তারা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ওপর হামলা চালানোর সাহস পেয়েছে। এ ছাড়া পাঁচ দফা উপজেলা নির্বাচনেও দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল আর বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণে অনেক স্থানেই আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীদের ভরাডুবি ঘটেছে।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ২০১১ সালের ২২ নবেম্বর জেলা সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক এবং আহ্বায়ক ও যুগ্ম আহ্বায়কদের কাছে লেখা এক চিঠিতে ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা শাখার সম্মেলন শেষ করার সময়সীমা বেঁধে দেন। এর মধ্যে ২০১২ সালের ৩১ জানুয়ারির মধ্যে ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন, ৩০ এপ্রিলের মধ্যে উপজেলা ও থানা এবং একই বছরের ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে জেলা ও মহানগর কমিটির সম্মেলন শেষ করার সময় বেঁধে দেয়া হয়। চিঠিতে তিনি সদস্য সংগ্রহ ও নবায়ন অভিযানের জন্য তাগিদ দেন।

সৈয়দ আশরাফের প্রেরিত চিঠিতে বলা হয়, সদস্যপদ নবায়ন অথবা নতুন করে দলের সদস্যপদ গ্রহণ না করলে কেউ কোন পর্যায়ের নেতা নির্বাচিত হওয়ার ক্ষেতে যোগ্য নন। বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে সম্মেলন না হওয়ায় সৈয়দ আশরাফুল ২০১২ সালের ১০ জুন দলীয় সব সংসদ সদস্যকে আরেক দফা চিঠি দিয়ে এ বিষয়ে তাগিদ দেনন। কিন্তু এ পর্যন্ত মাত্র ১২টি জেলার সম্মেলন হয়েছে। গ্রামভিত্তিক ১৫০ জন সদস্য সংগ্রহ করার লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। ঢাকা মহানগরসহ অনেক জেলায় তা শুরুই হয়নি। ঢাকাসহ ছয় মহানগর আওয়ামী লীগ চলছে অনেকটাই জোড়াতালি দিয়ে। এ ছাড়া গত পাঁচ বছরে কয়েক দফা কেন্দ্রীয় নেতাদের সাংগঠনিক সফর কর্মসূচী নেয়া হলেও তা দায়সারাভাবে পালিত হয়েছে। জেলায় জেলায় বর্ধিত সভা করার কথা থাকলেও ঢাকা বিভাগে তা হয়নি।

এমনকি ২০১২ সালে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ত্রিবার্ষিক সম্মেলনে দ্বিতীয়বারের মতো সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পর জেলা-মহানগর নেতাদের উদ্দেশে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে সৈয়দ আশরাফ বলেছিলেন, আগামী দুই মাসের মধ্যে জেলা, মহানগর, থানা, ওয়ার্ড সম্মেলন করতে ব্যর্থ হলে সব কমিটি বাতিল করে দেয়া হবে। ব্যর্থ জেলা ও মহানগর কমিটি বাতিল করে আহ্বায়ক কমিটি গঠনের মাধ্যমে সম্মেলন শেষ করা হবে। কিন্তু সৈয়দ আশরাফের ওই হুমকি বা হুঁশিয়ারির দুই বছর পেরিয়ে গেলেও জেলা-মহানগর নেতারা তাতে কর্ণপাত করেননি। বরং ১০-১৫ বছর ধরে দলীয় পদ আঁকড়ে ধরে থেকে নিজেদের আধিপত্য বজায় রেখেছেন, নতুন নেতৃত্ব আসার সকল পথ বন্ধ করে রেখেছেন দলীয় পদ-পদবি ব্যবহার করে।

আন্দোলনের পরিবর্তে বিএনপি ও জামায়াত নেপথ্যে দলকে সুসংগঠিত করার কাজে অধিক মনোযোগী হলেও সেদিকে কোনই দৃষ্টি নেই আওয়ামী লীগের। রাজপথে বিরোধী দলের আন্দোলন বক্তৃতা-বিবৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের রাজপথে কঠোর কর্মসূচী না থাকায় আওয়ামী লীগ চলছে ফুরফুরে মেজাজে। তাই সংগঠনকে ঢেলে সাজানোর দিকে কোন নজর নেই তাদের।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাংগঠনিক কর্মকান্ডে অনেকটাই নিষ্ক্রিয় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও এলজিআরডি মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের নিজের কিশোরগঞ্জ জেলায় সর্বশেষ সম্মেলন হয়েছে ১৯৯৭ সালে। দীর্ঘ ১৭ বছরেও আর কোন সম্মেলন বা কমিটি গঠন করা হয়নি। সর্বশেষ ওই সম্মেলনে বর্তমান রাষ্ট্রপতি এ্যাডভোকেট আবদুল হামিদকে সভাপতি ও শামসুল হক গোলাম মিয়াকে সাধারণ সম্পাদক করে তিন বছর মেয়াদী এই জেলা কমিটি গঠন করা হয়েছিল। বর্তমানে সৈয়দ আশরাফের এই জেলায় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে দুইজনই ভারপ্রাপ্ত। আর দীর্ঘদিন সম্মেলন না হওয়ার কারণেই আওয়ামী লীগের দুর্গ বলে খ্যাত কিশোরগঞ্জে উপজেলা নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর ভরাডুবি ঘটেছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সার্বিক বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার কারণে সংগঠনের প্রতি যেভাবে সময় দেয়ার কথা তা দেয়া হয়নি। ফলে অনেক জায়গায় সংগঠনে কিছুটা দুর্বলতা-শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে, যা উপজেলা নির্বাচনে খানিকটা টের পেয়েছি। খুব শীঘ্রই সংগঠন শক্তিশালী করার প্যাকেজ প্রোগ্রাম নিয়ে কাজ শুরু করব। এর পরই সব কিছু নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

The Weeklydesh newspaper