৩০ লাখ শহীদ: এ সময়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে কেন?

1

ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান যখন যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ে প্রথম ডকুমেন্টারিটি করেন তখন তিনি বাংলাদেশের আইনবিদ ও রাজনীতিবিদ ড. কামাল হোসেনের জ্যেষ্ঠ কন্যাকে বিয়ে করেননি। ডেভিড-কে নিয়ে তখন আমরা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছি স্বাভাবিকভাবেই। কারণ, যুদ্ধাপরাধ বিচার নিয়ে তখন আন্দোলনের শুরু। লন্ডনেও তখন ড. কামালের কন্যা সারাহ ও বাঙালী তরুণ-তরুণীরা এ প্রক্রিয়ায় অংশ নিচ্ছেন। ডেভিড-কেও তখন তাদের সঙ্গে দেখেছি। এর পর ডেভিড এসেছেন এদেশে মাঝে মাঝে, যোগাযোগ হয়েছে আমাদের অনেকের সঙ্গে, তারপর একসময় ড. কামাল হোসেনের জামাতা হিসেবে এ দেশেই ফিরে এসেছেন। এখন ইংরেজী দৈনিক দি নিউএজে কাজ করছেন।
যুদ্ধাপরাধ বিচার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এ নিয়ে ডেভিড বিভিন্ন প্রতিবেদন লেখা শুরু করলেন পত্রিকায় এবং এ প্রতিবেদনগুলোতে আমরা দেখলাম, আগের ডেভিড নেই। যে প্যাশন নিয়ে তিনি এক সময় যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে নেমেছেন এখন দেখা যাচ্ছে, সেই একই প্যাশন নিয়ে যুদ্ধাপরাধ বিচারের বিরুদ্ধে নেমেছেন। এর কারণটি কী তা আমরা বুঝতে অক্ষম। জামায়াতের লবিস্ট/আইনজীবীরা বিদেশে বিচার প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে যা বলছিল, ডেভিডের ভাষাও ক্রমে দেখা গেল সেরকম হয়ে যাচ্ছে। জামায়াত প্রচুর পয়সা দিয়েছে এবং দিচ্ছে লবিস্টদের। এক প্রতিবেদনে দেখেছিলাম, মীর কাশেম আলী ২৫ মিলিয়ন ডলার দিয়েছেন লবিস্টদের। সত্য মিথ্যা জানি না। ডেভিডের মতো একইরকমভাবে ইকোনমিস্ট ও আল জাজিরাও যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে প্রচার করছে। একসময় আল জাজিরা যুদ্ধাপরাধের বিচারের পক্ষে বলেছিল। এ দু’টি প্রতিষ্ঠানেরই মালিক নাকি কাতারের শেখ পরিবার। এসবের সঙ্গে ডেভিডের সম্পর্ক আছে কী না জানি না, কিন্তু তার বক্তব্য তাদের মতোই।
যুদ্ধাপরাধ বিচার নিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য করায় ডেভিড-কে ইতোমধ্যে আদালত তলব করেছে। ডেভিড-কে দমানো যায়নি কারণ তার বোধহয় এই প্রতীতি জন্মেছে যে, দেশের সেরা আইনবিদ ও সুপরিচিত আইনবিদের তিনি পরিবারভুক্ত। তার কেশাগ্র কেউ স্পর্শ করতে পারবে না।
সম্প্রতি ট্রাইব্যুনালে আবারও ডেভিডকে তলব করা হয়েছে আদালত অবমাননার জন্য। কোন একটি লেখায় ডেভিড মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লক্ষ শহীদ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। এ নিয়ে ২৪ তারিখে ‘দি হিন্দু’ পত্রিকায় ডেভিড একটি কলামও লিখেছেন। বর্তমান নিবন্ধ সেই প্রবন্ধ নিয়ে। প্রথমে দেখা যাক ডেভিডের বক্তব্য কী?
বাংলাদেশ সরকার সবসময় বলে আসছে পাকিস্তানী ও তার সহযোগীরা ৩০ লাখ মানুষকে হত্যা করেছে এটি কি ঠিক? [তার ভাষায় এটি কি ‘ফেয়ার এস্টিমেট’?]
এটিই মূল বক্তব্য এবং তারপর এই বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য নানা ‘তথ্য প্রমাণ’ হাজির করেছেন। তার মতে, স্বাধীনতার ৪০ বছর পেরিয়ে গেলেও বিষয়টি এখনও স্পর্শকাতর। এ স্পর্শকাতরতার কারণ, জন্ম থেকেই একটি শিশু এ কথা শুনছে স্কুলে এটি পড়ানো হয়। দেশের কবিতা-সংস্কৃতির বুননে তা ঢুকে গেছে। সুতরাং এ নিয়ে প্রশ্ন করা একটি গভীর বিশ্বাসকে নিয়ে প্রশ্ন তোলা।
ডেভিডের মতে, যিনি এ কথা প্রথম বলেছেন তিনি এদেশের স্বাধীনতার নেতা, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পিতা শেখ মুজিবুর রহমান। এভাবে বাক্য বিন্যাসের কারণে বোঝা যায়, আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনাকে তার খুব একটা পছন্দ নয়। কারণ, পরবর্তী বাক্যে লিখেছেন, এ সংখ্যাটি বেশি বলে আওয়ামী লীগের নেতা ও সমর্থকরা।
ডেভিড লিখেছেন, ১৯৭১ সাল নিয়ে রক্ষণশীল যে জাতীয়তাবাদী ডিসকোর্স তৈরি হয়েছে তা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অবস্থানের অংশ বা বিরোধী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের বিপরীত। এমনকী, তার মতে, এ সংখ্যা নিয়ে কেউ সন্দেহ প্রকাশ করলে অনেক আওয়ামী লীগার তাকে স্বাধীনতাবিরোধী বা ‘অপজিশনাল মাইন্ডসেট’ বলে আখ্যা দেবে।
সুতরাং বাংলাদেশে ৩০ লক্ষ মৃত-কে নিয়ে যে প্রশ্ন করবে তার মাথা নিচু করে থাকতে হবে, ভীত থাকতে হবে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও ব্যক্তিগত আক্রমণের আশঙ্কায়।
ডেভিড বার্গম্যানের এ বক্তব্য নিয়ে প্রথমে আলোচনা করা যাবে। এটি ঠিক, আমাদের হৃদয়ে এবং ১৯৭১ সালের পর যাদের জন্ম তাদের মাথায় ৩০ লক্ষ শহীদ শব্দটি গেঁথে গেছে। কিন্তু, এতে অস্বাভাবিক কী আছে? ডেভিডও নিশ্চয় বড় হয়েছেন ‘হলোকাস্ট’ শব্দটি শুনে। হলোকাস্ট বা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলার কর্তৃক ইহুদী ও নাজি বিরোধীদের নিধন হলো হলোকাস্ট। এটি বিশ্ববাসী বা ইউরোপীয়দের মধ্যে বিশ্বাস যে, ৩ লক্ষ মানুষ মারা গেছেন হলোকাস্টে। নাজি বা ফ্যাসিবিরোধী ডিসকোর্সের তা অন্তর্গত এবং ইউরোপের যেকোন রাজনৈতিক দল হলোকাস্টের কথা বললে কি মনে হয় যে তা অর্থোডক্স ন্যাশনালিস্ট ডিসকোর্সের অংশ বা কোন দলের বিশ্বাস? হ্যাঁ, হলোকাস্টে মৃতের সংখ্যা নিয়েও মাঝে মাঝে প্রশ্ন করা হয়েছে, কিন্তু যারা এ প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা কি মেইনস্ট্রিম এ্যাকাডেমিকসে জায়গা পেয়েছেন? এবং জার্মানিতে, যে জার্মান সরকার একসময় এ নিধন চালিয়েছে, সে জার্মানিতে কেউ এ প্রশ্ন করলে কি তাকে জার্মান সমাজ গ্রহণ করবে? তাকে কি নাজি সমর্থক মনে করবে না? সে মনে করাটি কি ‘অপজিশনাল’ মাইন্ড সেট’? আমেরিকাতে ইহুদী বিদ্বেষী দু’একজন লেখক এ নিয়ে কথা তুলেছেন এবং খোদ আমেরিকাতে তাদের নিয়ে নিন্দার ঝড় বয়ে গেছে, হাসি ঠাট্টা করা হয়েছে তাদের ‘পা-িত্য’ নিয়ে। তারা পরিশীলিত তাই এ ধরনের ব্যক্তিদের রিভিশনিস্ট বলেছেন। আমাদের দেশের মানুষজন অর্ধশিক্ষিত, অশিক্ষিত, অতটা পরিশীলিত নয়, তাই যারা ৩০ লক্ষকে অস্বীকার করে তাদের হারামজাদা বলে। শব্দগত বা ভাবগত তফাৎ আর কি!
ডেভিড তাঁর শ্বশুরের মতো আওয়ামী লীগকে পছন্দ করেন না। সেটি স্বাভাবিক। কিন্তু ৩০ লাখ শহীদ নিয়ে প্রশ্ন করলে কি শুধু আওয়ামী লীগ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানায়? না। ডেভিডের আওয়ামী লীগকে অপছন্দের কারণে মনে হয়েছে, খালি আওয়ামী লীগ-ই প্রতিক্রিয়া জানাবে। কমিউনিস্ট পার্টি তো ঘোর আওয়ামী লীগ বিরোধী। ডেভিড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমকে জিজ্ঞেস করতে পারেন, ৩০ লক্ষ শহীদে তিনি বিশ্বাস করেন কিনা? বিএনপি-জামায়াত ছাড়া আর কেউ এ নিয়ে প্রশ্ন করে কিনা সেটি ডেভিড পর্যালোচনা করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করবেন না দেখেই আগে ভাগে জানিয়েছেন, এটি আমাদের সংস্কৃতির বুননে মিশে আছে। ডেভিড তাঁর শ্বশুর ড. কামাল হোসেনকে একবার জিজ্ঞেস করলে পারতেন, তিনি এটা বিশ্বাস করেন কিনা? আওয়ামী লীগ করার সময় তো নিশ্চয় বিশ্বাস করতেন। না করলে কি প্রকাশ্যে তিনি তা বলবেন?
ডেভিডের নিবন্ধের প্রথম ভাগ দেখে মনে হচ্ছে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার যে আওয়ামী লীগ করছে সে জন্য তিনি খানিকটা কুপিত। ডেভিড, তাঁর স্ত্রী শ্বশুর-শাশুড়ি, আমরা সবাই এতে বিশ্বাস করতাম এখনও করি। ডেভিড করেন না, তাঁর বিশ্বাস ভঙ্গ হয়েছে, আমাদের বিশ্বাস এখনও অটুট। ডেভিড কেন, আমাদের সবাইর একটি বিষয় মনে রাখা উচিত, এ বিচারটা আওয়ামী লীগ না করলে তাদের অনেক নেতাকর্মী হয়তো খুশি হতেন। আওয়ামী লীগ সবসময় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চেয়েছে কিন্তু প্রথম আমলে তা করেনি। ২০০৮ সালে, তারা জনগণের ম্যান্ডেট চেয়েছে। বিচারে এবং তা পেয়েছে। তারপরেও কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে বিচার কাজ শুরু হয়নি। পরে জনচাপে সেই ম্যান্ডেট আওয়ামী লীগ কার্যকর করছে মাত্র। এটি দলীয় কোন সিদ্ধান্ত কার্যকরের মতো নয়।
নিবন্ধের দ্বিতীয় ভাগে ডেভিড বলছেন, সাংবাদিক বা গবেষকদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ যে এই যে ‘আইকনিক ফিগার’ পর্যালোচনা করবেন। ডেভিড বুদ্ধিমান, পরের লাইনে লিখেছেন, এই পর্যালোচনা পাকিস্তানী ও তাদের সহযোগীদের নিষ্ঠুরতা কম করে দেখানোর জন্য নয়। তার ভাষায়, This is not in order to minimise the extent of atrocities committed by the pakistan military and its collaborators which were undoubtedly very significant, but for the purposes of a more accurate representation of history that is not thrall to partisan interest. শেষ বাক্যটি লক্ষ্য করুন, ইতিহাসের স্বার্থে এবং যা পক্ষপাতমূলক স্বার্থের পক্ষে [পড়ুন আওয়ামী লীগ] যাবে না। অর্থাৎ ৩০ লক্ষ নিয়ে প্রশ্ন ওঠালেই তা আওয়ামী লীগের স্বার্থের বাইরে যাবে। এ ধরনের বাক্য গঠন দেখেই বোঝা যায় একটি বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়েই লেখাটি রচিত হয়েছে- সেটি হচ্ছে অপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া সুষ্ঠু নয়, অভিযোগগুলো বিশেষ করে হত্যার, সুষ্ঠু নয় এবং রাজনৈতিক উদ্দেশেই বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
৩০ লক্ষ শহীদের ব্যাপারটি কীভাবে এলো তারপর তা ব্যাখ্যা করেছেন ডেভিড। ১৯৭২ সালে ১৮ জানুয়ারি ডেভিড ফ্রস্টকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে বঙ্গবন্ধু বলেন-‘3 million people have been killed, including children, women, intellectuals, peasants, workers, students…’ ফ্রস্ট তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, সংখ্যাটি যে ৩ মিলিয়ন তিনি তা কীভাবে বুঝলেন। বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘আমি ফেরার আগেই আমার লোকজন তথ্য সংগ্রহ করছে, বিভিন্ন জায়গা থেকে খবরা খবর আসছে, এখনও সঠিক সংখ্যায় উপনীত হইনি তবে তা কিন্তু ৩ মিলিয়নের নিচে হবে না। এর আগে ১০ জানুয়ারিও তিনি একই সংখ্যার কথা বলেছিলেন।
এরপর ডেভিড এ প্রসঙ্গে কট্টর মুজিব ও আওয়ামী লীগ বিরোধী মাহমুদুর রহমান মার্কা সাংবাদিক, বিবিসির এককালীন কর্মী সিরাজুর রহমানের মন্তব্য উদ্ধৃত করেছেন। সিরাজ লিখেছেন, ৩ লক্ষকে শেখ মুজিব ইংরেজীতে ৩ মিলিয়ন বলেছেন। সিরাজ এ মন্তব্য করে বঙ্গবন্ধুর ইংরেজী জ্ঞানের প্রতি কটাক্ষ করতে চেয়েছেন। সিরাজুর রহমানের বই পড়েছি। ইংরেজী নিশ্চয় ভাল জানেন লন্ডনে থাকার কারণে। বঙ্গবন্ধুর ইংরেজী ভাষণও পড়েছি। সিরাজুর রহমানের ইংরেজী এর চেয়ে উত্তম এমন দাবি করা যায় না। বাংলা গদ্য তো নয়ই। সিরাজুর রহমানের যে দৃষ্টিভঙ্গি তাতে তিন লাখও তার কাছে বেশি মনে হওয়া স্বাভাবিক। সংখ্যাটি ৩০ হাজার হলে বোধহয় তিনি সন্তুষ্ট হতেন।
এসএ করিমের প্রকাশিত বঙ্গবন্ধুর জীবনী থেকেও ডেভিড উদ্ধৃতি দিয়েছেন। তিনিও লিখেছেন, ৩০ লক্ষ ‘no doubt a gross exaggeration’। এ বিষয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রীর দফতরে খোঁজ নিয়ে জেনেছেন, প্রাভদায় সংবাদটি ছাপা হয়েছিল।
বার্গম্যান বলছেন, প্রাভদার হিসেবটা গোলমেলে [কমিউনিস্টদের কাগজ সেজন্য; ইহুদী বা ইউরোপীয়দের হলে না হয় মানা যেত।] কারণ প্রাভদা লিখেছিল, পাকিন্তান সামরিক বাহিনী আত্মসমর্পণের ঠিক পূর্ব মুহূতে [days immediately] ৮০০ বুদ্ধিজীবী হত্যা করা হয়েছিল। আসলে ঠিক সংখ্যা হবে ২০।
বুদ্ধিজীবী নিধন শুরু হয়েছিল ২৫ মার্চ থেকে। এই বুদ্ধিজীবীর অন্তর্গত [দেখুন রশীদ হায়দার সম্পাদিত শহীদ বুদ্ধিজীবী কোষ] বিভিন্ন পেশার মানুষ। ১ ডিসেম্বর থেকে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত মাত্র ২০ জন বুদ্ধিজীবী হত্যা করা হয়েছে?

– মুনতাসীর মামুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

The Weeklydesh newspaper