ত্বকীর মুখ আমাদের দায়

1

গত বছরের ৬ মার্চ নারায়ণগঞ্জে লাইব্রেরিতে পড়তে যাওয়ার সময় স্কুলছাত্র কবি, শিল্পী তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীকে অপহরণ করা হয়। পরে শীতলক্ষ্যা নদীতে নির্যাতনে ক্ষতবিক্ষত তার লাশ পাওয়া যায়। এখানে এর আগেও নির্যাতন ও হত্যার শিকার মানুষের লাশ পাওয়া গেছে। একই গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপিত হলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি কোনো সরকার। কিন্তু আমরা এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ভুলতে পারি না। এখনো ত্বকীর দৃষ্টি, ওর কর্ম, ওর নিষ্পাপ মুখচ্ছবি থেকে মনোযোগ সরাতে পারি না।

যে সমাজে আমরা বাস করি, এই নৃশংস ঘটনা আবারও এই সমাজের প্রকৃত রূপ আমাদের সামনে হাজির করে। দেখায়, এগুলো শুধু এক-দুই ব্যক্তির বিষয় নয়, এদের ক্ষমতার জাল বহুদূর বিস্তৃত। শুধু এক-দুই খুন নয়, আরও বহুবিধ অপরাধে তারা লিপ্ত। তারা ভূমিদস্যু, একের পর এক জলাভূমি, সাধারণ মালিকানাধীন জমি তাদের দখলে। তারা চাঁদাবাজ, পরিবহন থেকে শুরু করে সব ব্যবসা-বাণিজ্য তাদের শিকার। বাসভাড়া থেকে শুরু করে প্রতিটি ক্ষেত্রে নাগরিকদের বাড়তি অর্থ খরচ করতে হয়, যা এই চাঁদাবাজদের কোটি কোটি টাকার সম্পদ তৈরি করে। তারা সন্ত্রাসী, কারণ দখল, লুণ্ঠন ও চাঁদাবাজি কার্যকর করতে তাদের সন্ত্রাসী বাহিনী পুষতে হয়। এই ভাড়াটে বাহিনী শুধু ভাড়া খাটে না, নিজেদের ক্ষুধা মেটাতে নিজেরাও নতুন নতুন পথ সন্ধান করে। এদের হাতে নির্যাতন, ধর্ষণ, হয়রানি— এগুলো তাই নিয়মিত ঘটনা। এই মাফিয়া গোষ্ঠীর হাতে বাঁধা থাকে প্রশাসন, পুলিশ, আইন-আদালত, সরকারি ক্ষমতা। তারা প্রিয়পাত্র, কারণ, তারা আবার জনগণের কাছ থেকে লুণ্ঠিত অর্থের একাংশ ওপরে পৌঁছে দেয়। কাজেই তারা যথেচ্ছাচার করতে পারে। আর তাদের সন্ত্রাসী বাহিনীর ওপর ভর করে সরকার তার ক্ষমতার ভিত্তি টিকিয়ে রাখার আশা করে।

সে জন্য ত্বকী হত্যার পর আমরা যে আশঙ্কা করেছিলাম, সেটাই হয়েছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্ট এবং প্রমাণাদি থাকার পরও অপরাধীদের বিরুদ্ধে কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বরং প্রশাসনের প্রত্যক্ষ মদদে তাদের ঔদ্ধত্য আরও বেড়েছে। অভিযুক্ত আসামিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের পরিবর্তে, এই হত্যাকাণ্ডের অন্যতম অভিযুক্ত আসামিকে নির্বাচনে সরকারি দল থেকে সংসদ সদস্যপদে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। সেই মনোনীত ব্যক্তি অর্থাৎ আসামি শামীম ওসমান এখন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সদস্য! শুধু নির্বাচিত নয়, ত্বকী হত্যার প্রতিবাদে যাঁরা সক্রিয় ছিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী তৎপরতায় আবারও সক্রিয়। প্রশাসন তাঁদেরই সহযোগী।

কেন তারা হত্যা করল ত্বকীকে? ত্বকী স্কুলের মেধাবী ছাত্র, সৃজনশীল কিশোর। লেখাপড়া, কবিতা লেখাসহ সৃজনশীল কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকত ও। লাইব্রেরি ছিল তার প্রিয় গন্তব্য, বই ছিল প্রিয় সঙ্গী, মানুষের সৃজনশীল মুক্ত ভবিষ্যৎ ছিল তার স্বপ্ন। আমরা জানি, মাফিয়া সন্ত্রাসীরা এ রকম মুক্তচিন্তার কিশোর তরুণদের পছন্দ করে না। কিন্তু নির্দিষ্টভাবে ত্বকীকে খুন করল কেন তারা? কারণ এ রকম, ত্বকী ছিল তাদের জন্য অস্বস্তিকর, ভীতির কারণ। দ্বিতীয়ত, ওসমান পরিবার ক্ষমতার মদমত্তে গড়ে তুলেছিল খুনি-উৎপীড়কদের একটি অন্ধকার জগৎ। তারা জানত, তারা যেকোনো অপরাধ করতে পারে, কোনো অপরাধেই তাদের কোনো বিচার হবে না। খেলার ছলে মানুষকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মেরে ফেললেও না। তৃতীয়ত, ত্বকীর বাবা ও তাঁর পরিবার জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এই মাফিয়াদের সব দখল-লুণ্ঠন-অত্যাচারের বিরুদ্ধে একটি শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। এই পরিবারকে চুরমার করতেই দুর্বৃত্তরা বেছে নিয়েছিল নিষ্ঠুরতম পথ। হ্যাঁ, প্রতিরোধের শক্তিকে ভয় দেখানোর জন্যই ওরা কোমলপ্রাণ ত্বকীকে হত্যা করেছিল।

১৬ কোটি মানুষের একটি বিশাল সম্পদশালী দেশ আমাদের বাংলাদেশ। অথচ কতিপয়ের হিংস্র আধিপত্য, লুণ্ঠন ও শোষণে এই দেশের অধিকাংশ মানুষ এখনো মানবেতর জীবন যাপন করছে। পুরো দেশ পরিণত হয়েছে দেশি-বিদেশি হিংস্র দানবদের অভয়ারণ্যে। নারী-শিশুসহ সব পর্যায়ের মানুষ অসম্মান, নিরাপত্তাহীনতা আর সন্ত্রাসী দখলদারদের দাপটের মধ্যে বসবাস করতে এখনো বাধ্য হচ্ছে। বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত বিভিন্ন বাহিনী আইন আদালতকে অকার্যকর প্রমাণ করে একের পর এক ক্রসফায়ারের নামে মানুষ হত্যা করছে। অন্যদিকে সাগর, রুনী, ত্বকীসহ আরও অনেক হত্যাকাণ্ডের মীমাংসায় তারা অক্ষম। এই অক্ষমতা আর নিষ্ক্রিয়তা সন্ত্রাসী দুর্বৃত্তদের রক্ষার কৌশল ছাড়া আর কী?

এত কম বয়সেও নতুন একটি মুক্ত সমাজের স্বপ্ন দেখার বিশালতা অর্জন করেছিল ত্বকী। বাংলাদেশকে নতুন জগতে আহ্বান করে ত্বকী মানুষ হয়ে আবারও মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছিল ওর কবিতায়। শোককে কীভাবে শক্তিতে পরিণত করতে হয়, তা দেখিয়েছেন ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বীসহ স্বজন ও সঙ্গী মানুষেরা। বুকের ওপর শোকের পাথর নিয়ে, দানবদের ফুলে-ফেঁপে ওঠা রাজত্বের আঘাতের মধ্যেও, তাঁরা লড়াই অব্যাহত রেখেছেন। এই লড়াইয়ের শক্তিই ত্বকীর স্বপ্ন বাস্তবায়ন করবে, করতেই হবে। এটা আমাদের সবার দায়। মানুষ যদি মানুষ হয়ে মৃত্যুর সংকল্প করে, তাকে পরাজিত করে সাধ্য কার?

আনু মুহাম্মদ: অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

The Weeklydesh newspaper