সাঈদীর চন্দ্রাভিযানের এক বছর!

1

দেখতে দেখতে ৩৬৫ দিন পেরিয়ো গেলো। ২০১৩ সালের এই দিনে মহাবিশ্বের ইতিহাসে ঘটেছিল এক বিস্ময়কর ঐতিহাসিক ঘটনা। ফাঁসির রায় ঘোষণার পর সুপারম্যানের মতো চাঁদে চলে যান পিরোজপুরের এক রাজাকার।
দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পিরোজপুরের মেশিনম্যান-খ্যাত দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে ফাঁসির রায় দেন।

তখন সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এসেছে। কারাগার সেলে বসে, নিজেকে প্রস্তুত করে নেন দেলাওয়ার ওরফে দেইল্লা রাজাকার। বেশ কয়েকটা বুকডন দিয়ে শরীরে রক্ত ও অক্সিজেন চলাচল পরীক্ষা করে নেন।

সঙ্গে থাকা আইপ্যাডে দেখে নেন গ্রহমণ্ডলের অবস্থান। তারপর নাসার সঙ্গে নেটওয়ার্ক কানেকশন।

নাসার কর্মকর্তা: হ্যালো…
দেইল্লা: কাইফা হালুকা…
নাসা: হোয়াটস?
দেইল্লা: ও স্যরি…ইউ ইংলিশ ম্যান… আই অ্যাম দেইল্লা, ফ্রম ফাকিস্তান। ওয়ান্ট টু গো মুন। হোয়াটস অ্যাবাউট রুটস?
নাসা: রুটস আর লিটল বিজি। সাম নভোঅ্যাভিয়েশন অ্যান্ড মেটিয়োর আর রানিং ইন স্পেস।
দেইল্লা: বাট আই হ্যাব এ মেশিন টু ডেস্ট্রয় দেম। আই অ্যাম গোয়িং…

ফোন কেটে দিলেন দেইল্লা।

শরীরের পেছনে নিচের অংশে হিলিয়ামের সিলিন্ডার বেঁধে নিলেন। হাতের অটোমেটিক অ্যাভিয়েশন ওয়াচে হিসেব কষলেন সময়ের সঙ্গে গতি কতটুকু হতে হবে। ওয়াচের সিলিকনে লেখা উঠলো সেকেন্ডে ২০ হাজার কিলোমিটার যেতে পারলে ৩ লাখ ৮৪ হাজার কি.মি. যেতে বেশি সময় লাগবে না। কারণ এশার ওয়াক্তের আগেই পৌঁছতে হবে।

বড় জোব্বার ভেতরে পানির বোতল নিয়ে নেন।

বিশেষ সোর্সের মাধ্যমে তিনি খবর পেয়েছেন চাঁদের মাটির ১০,০০,০০০ কণায় পানির কণা হলো ১,০০০। গবেষণায় চন্দ্রপৃষ্ঠের পাথর ও মাটিতে প্রায় ৪৫% অক্সিজেনের প্রমাণ মিলেছে। তাই ভরসা নেই পানি পাওয়ার।

দেইল্লা ট্যাবে চেক করে নেন, গড় ঘনত্ব, বিষবীয় পৃষ্ঠের অভিকর্ষ, মুক্তি বেগ, নাক্ষত্রিক ঘূর্ণনকাল, বিষুবীয় অঞ্চলের ঘূর্ণন বেগ।

ঘূর্ণন বেগ এখন ৪ দশমিক ৬২৭ মি/সে। হুমম.. দাড়িতে হাত বুলিয়ে নেন রাজাকার, এটাই উড্ডয়নের উপযুক্ত সময়।

বিশেষ জোব্বাটা ভাল করে চেক করে নেন। স্বপ্নে পাওয়া এ জোব্বা বিশেষভাবে প্রস্তুত হয়েছে চন্দ্রাভিযানের জন্যে। রায়ের আগের রাতে এটি হাতে পান তিনি। বিশেষ এ জোব্বায় রয়েছে তাপানুকূল ব্যবস্থা।

জোব্বার ভেতরে নিয়ে নিলেন মোবাইল ফোন এবং প্রজেক্টর। সেখানে পৌঁছে আবার এক ষোড়শী প্রিয়তমাকে ফোন দিয়ে জানাতে হবে। এ বয়সে যে তিনি ফোনালাপেই সক্ষম, সেটি ইতোমধ্যে দেশবাসীকে জানিয়েছেন।

এর আগে সকালে বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে যুদ্ধাপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন।

রায়ে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালে সংঘটিত হত্যা, লুণ্ঠন, নির্যাতনসহ অন্তত ২০টি মানবতাবিরোধী অভিযোগের মধ্যে ৮টি অভিযোগ সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবির শুরুতেই বলেন, মি. সাঈদীর ওয়াজের কারণে অথবা জামায়াতে ইসলামীর নেতা হিসেবে পরিচয় থাকলেও, এখানে তার বিচার হয়েছে ৪০ বছর আগে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে তার কর্মকাণ্ডের জন্য।

ট্রাইবুনালে মি. সাঈদীর বিরুদ্ধে মোট ২০টি অভিযোগ আনা হয়েছিল, যার মধ্যে ছিল হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগসহ নানা অভিযোগ।

আদালতের রায়ে বলা হয়, এর মধ্যে ৮টি অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পেরেছেন রাষ্ট্রপক্ষ। এসব অপরাধের মধ্যে রয়েছে, হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন এবং জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করাসহ বিভিন্ন অপরাধ।

এর সব কিছুই সকালের ঘটনা। মাথায় মোটরবাইকের একটি হেলমেট পড়ে নিলেন তিনি। হিলিয়াম সিলিন্ডারের সলতেতে ম্যাচের কাঠি দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ গতিতে মহাকাশে চলে গেলেন মেশিনম্যান।

মহাকাশের পথ বিপদসংকুল। কিছুণন পর পর উল্কাপিণ্ড ছুটে আসে। পোশাকের ভেতর থেকে মেশিন বের করে ফায়ার করেন তিনি। এরপর আবার ডান হাত বাড়িয়ে ছুটে চলেন। ঠিক যেন সুপারম্যান।

এশার ওয়াক্তের আগেই চন্দ্র পৃষ্টে পৌঁছলেন দেইল্লা রাজাকার। সেখানে অভিকর্ষ বল না থাকায় বেশ সুবিধা হলো তার। উড়ে উড়ে চলতে পারলেন। পাখির মতো আকাশে ওড়ার শখ ছিল বহুদিনের।

পকেট থেকে ফোন বের করে, ডায়াল করলেন নির্দিষ্ট নম্বরে।

দেইল্লা: হ্যালো, ডার্লিং…
পৃথিবী থেকে: হ্যালো সুইট…
দেইল্লা: আমি চাঁদে, তোমাকে মিস করছি। চারদিক নিরিবিলি…

এরপর অপ্রকাশিত ব্যাস্ততায় কেটে যায় আধঘণ্টা। দু’টো খুরমা আর পানি খেয়ে আবার শক্তি জুগিয়ে নেন।

জোব্বা থেকে প্রজেক্টর বের করেন, নিজের ছবি বড় করে তাক করেন পৃথিবীর দিকে।

সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের বগুড়ার কয়েকজন হুজুর দেখে ফেলেন মহাপুরুষের চন্দ্রে গমণের বিষয়টি। তাদের ঈমান শক্ত। মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেন, যাদের ঈমান মজবুত তারাও দেখতে পারবেন দেইল্লাকে।

ঈমান যাদের মজবুত, তারা চন্দ্রের দিকে তাকালেই দেখতে পান দেইল্লা চন্দ্র বিজয় করে হাসছেন সেখানে।

চাঁদে জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর চেহারা দেখা গেছে বলে গুজব ছড়িয়েছে চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায়। রাত ১২টার পর সাতকানিয়া সদরসহ আশপাশের এলাকার বেশির ভাগ মসজিদ থেকে সাঈদীকে চাঁদে দেখা গেছে বলে একযোগে মাইকে ঘোষণা দেওয়া হয়। এরপর শত শত মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন।

তবে ফজরের নামাজের পর সাতকানিয়া জামে মসজিদের ইমাম হাবিবুল হক মুসল্লিদের উদ্দেশে বলেন,‘যারা এ ধরনের বক্তব্য দিচ্ছে, তাদের ইমান নষ্ট হয়ে যাবে। যদি সাঈদীকে চাঁদে দেখা যায়, তা হলে তো তিনি গ্রেফতার নেই। তা হলে তাঁর মুক্তি চাওয়ার দরকার কী। যাঁরা এ ধরনের অপপ্রচারে বিব্রত হবেন, তাঁদের ইমান থাকবে না। নষ্ট হয়ে যাবে।’

রাত ১২টার পর সাতকানিয়ার বোয়ালীপাড়া, সামিয়ারপাড়া, খলিফাপাড়া, রুজমপাড়াসহ আশপাশের অনেকগুলো মসজিদ থেকে চাঁদে সাঈদীকে দেখা যাচ্ছে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়। যে যেখানে আছে, সবাইকে বাইরে বেরিয়ে আসতে বলা হয়।

চাঁদ থেকে সাঈদী তার ভক্তদের উদ্দেশ্যে দেন এক ভাষণ। সেখানে তিনি বলেন, আমার চন্দ্র বিজয় নিয়ে যারা প্রশ্ন তুলছেন তারা আমার দেশের ইতিহাস জানেন না। ফাকিস্তানে হরহামেশাই চন্দ্র বিজয় ঘটে।

১৯৬৫ সালে ভারত পাকিস্তান যুদ্ধের সময় ঘটেছিল। এরপর ১৯৭১ সালেও পাকিস্তানের আকাশে দেখা দেয় শৌর্য-বীর্যের প্রতীক। শুরু হয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ। তখন পূর্ব বাংলার মুক্তিকামী মানুষের বিরুদ্ধে ধর্মভীরু পাকিস্তানিদের উসকে দিতে ছড়ানো হলো গুজব। সেসময় পাকিস্তানের একাধিক উর্দুভাষার পত্রিকা আকাশে তরবারি দেখতে পাওয়ার গুজব রটায়।

ওই সময় পাকিস্তানের পত্রিকাগুলোর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পাঞ্জাব ও করাচীর আকাশে জিহাদের তরবারি দেখা গেছে। লক্ষ্য ছিল গুজবের মাধ্যমে পাকিস্তানিদের বাংলাদেশের বিরুদ্ধে জিহাদে অংশ নিতে উৎসাহ দেওয়া।

সাঈদীকে ‘চাঁদের ভেতরে দেখা গেছে’ এমন প্রচারে দেশের উত্তরবঙ্গ হয়ে ওঠে উত্তাল। উত্তরবঙ্গের ছয় জেলায় জামায়াত-পুলিশ সংঘর্ষে পুলিশসহ অন্তত ২৫ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে বগুড়াতেই ১২ জন নিহত হয়। রাজশাহীতে ৪, জয়পুরহাটে ৫, ঝিনাইদহে ১, সাতক্ষীরায় ২ ও গাজীপুরে ১ জনসহ ২৫ জন নিহত হয়েছেন।

আমি তখন মেশিনম্যানের এলাকায়, পিরোজপুর। বগুড়া আর সাতকানিয়ায় সাঈদীকে চাঁদে দেখা গেলেও তার নিজ জেলা পিরোজপুরবাসী বঞ্চিত হয়েছেন এলাকার ছেলের এমন গৌরব দেখা থেকে।

আজ ২৮ ফেব্রুয়ারি, সাঈদীর চন্দ্র বিজয়ের প্রথম বর্ষ। নাসার এক বিশেষ আমন্ত্রণে সাঈদী হয়তো এবার মঙ্গল বিজয়ের পথে উড়াল দেবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

The Weeklydesh newspaper