গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে এখনও উদ্বিগ্ন যুক্তরাষ্ট্র

muhammad-yunus

গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে আবারও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। সোমবার হোয়াইট হাউসের নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে সরকার নিযুক্ত প্রেসিডেন্টকে গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি নিয়োগে ক্ষমতা দেয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ভিক্টোরিয়া নুল্যান্ড এই উদ্বেগের কথা জানান। পাশাপাশি গ্রামীণ ব্যাংকের অখণ্ডতা ও কার্যকারিতা কমে যাওয়ার মতো কোনো ব্যবস্থা না নিতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি দেশটির পক্ষ থেকে আহ্বান জানানো হয়েছে। গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে সরকারের সাম্প্রতিক কার্যক্রম যুক্তরাষ্ট্র গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বলেও জানান তিনি।

এদিকে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, সরকার ড. ইউনূসকে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে বিচ্ছিন্ন করেনি। বরং তিনি নিজেই গ্রামীণ ব্যাংক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন। অর্থমন্ত্রী বলেন, ইউনূস সাহেব বিদেশে ভুয়া প্রচারণা চালাচ্ছেন। গতকাল সচিবালয়ের নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে অর্থমন্ত্রী এ মন্তব্য করেন। তিনি জানান, এক সপ্তাহের মধ্যে গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি নিয়োগে সার্চ কমিটি গঠন করা হবে। এ কমিটিতে ড. ইউনূসকে রাখা হবে না। গ্রামীণ ব্যাংককে সরকার দখলে নিয়ে যাচ্ছে বলে ড. ইউনূস দেশ-বিদেশে মিথ্যা প্রচারণা চালাচ্ছেন বলেও দাবি করেন তিনি।

হোয়াইট হাউসের নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে নুল্যান্ড বলেন, সরকারের নিয়োগকৃত চেয়ারম্যানের পরামর্শ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগে সরকারি সিদ্ধান্তে যুক্ররাষ্ট্র গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। ব্যাংকটির অখণ্ডতা ও কার্যকারিতা যাতে হ্রাস না পায়, এ জন্য আমরা বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। একই সঙ্গে নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতেও বলা হয়েছে।

ভিক্টোরিয়া নুল্যান্ড বলেন, গ্রামীণ ব্যাংকের নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং ব্যাংকটির সার্বিক দক্ষতা ও সক্ষমতা বজায় রাখতে আমেরিকা এখনও অব্যাহতভাবে বাংলাদেশ সরকারকে বলে যাচ্ছে। ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বের নানা অংশে একটি আদর্শে পরিণত হয়েছে উল্লেখ করে ভিক্টোরিয়া নুল্যান্ড বলেন, ‘আমরা এটা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি।

তিনি আরও বলেন, মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের ঢাকা সফরে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে এটা তীব্র আলোচনার বিষয় ছিল। তিনি সেখানে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাত্ করেছেন। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের বিষয়টি সোজাসাপ্টা ছিল। আগস্টের ৩ তারিখে উদ্বেগ জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বিবৃতিও দেয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, গ্রামীণ ব্যাংক বাংলাদেশের একটি প্রাণবন্ত অংশে পরিণত হয়েছে। সংস্থাটি বিশ্বের অন্যান্য অংশের জন্য আদর্শ হয়ে আছে। ফলে আমরা এটা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি।

এর আগে গ্রামীণ ব্যাংকের ওপর আরও বেশি করে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সরকারি চেষ্টার বিষয়ে গভীর হতাশা প্রকাশ করেছিলেন মার্কিন সিনেটর বারবারা বক্সার। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনার বিষয়ে সরকারকে এ ধরনের হস্তক্ষেপ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

৩ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিকে দেয়া এক বিবৃতিতে বারবারা বলেন, গ্রামীণ ব্যাংকের ওপর বাংলাদেশ সরকারের নিয়ন্ত্রণ আরোপের চেষ্টায় আমি ভীষণ হতাশ। এ পদক্ষেপ বাংলাদেশের লাখ লাখ নারীর দারিদ্র্য কাটিয়ে ওঠার সামর্থ্যকে হুমকির মুখে ফেলবে। গ্রামীণ ব্যাংকের নেতৃত্বের বিষয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়ার ভার প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদকেই দেয়া উচিত।

এদিকে গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগের জন্য এক সপ্তাহের মধ্যে সার্চ কমিটি গঠন করা হবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। ওই সার্চ কমিটিতে ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহাম্মদ ইউনূসকে রাখা হবে না বলেও তিনি জানান।

অর্থমন্ত্রী বলেন, এক সপ্তাহের মধ্যে সার্চ কমিটি গঠন করা হবে। এরপর এই কমিটি এমডি নিয়োগের জন্য ‘আগ্রহপত্র’ আহ্বান করবে। গ্রামীণ ব্যাংকের পরবর্তী ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের কমিটিতে ড. ইউনূসকে রাখার যে প্রস্তাব এসেছে, তা প্রত্যাখ্যান করে মুহিত বলেন, সার্চ কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে মুহাম্মদ ইউনূসকে নিয়োগের কোনো সম্ভাবনা নেই। এ সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে তিনি বলেন, তাকে নিয়োগ দিলে তিনি তার ইচ্ছামতো উত্তরসূরি নির্বাচন করবেন।

তিনি বলেন, ‘ইউনূস সার্চ কমিটির চেয়ারম্যান হতে চেয়েছিলেন। যিনি এর আগে ব্যাংকের এমডি ছিলেন। তিনি কিছুতেই সার্চ কমিটির চেয়ারম্যান হতে পারেন না। দুনিয়ার কোথাও এমন নিয়ম নেই।

অর্থমন্ত্রী বলেন, গ্রামীণ ব্যাংক বাঁচাও বলে যে প্রচারণা চলছে, তা ভুয়া। তার (ইউনূস) এই ‘ভুয়া’ প্রচারণার জন্য অনেকে চিঠি লিখে আক্রোশ প্রকাশ করছেন বলেও জানান তিনি। অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে কিছুদিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে থাকা একজন বিদেশি লেখক তার লেখায় সরকারের প্রতি চরম আক্রোশ প্রকাশ করেছেন।

দ্বিতীয় দফায় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার ড. ইউনূসকে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে বিচ্ছিন্ন করেনি, তিনি নিজেই বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন। তিনি বলেন, আদালতে যাওয়ার আগে ড. ইউনূসকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগের পরামর্শ দেয়া হয়েছিল। পাশাপাশি গ্রামীণ ব্যাংকে তাকে আজীবন একটি সম্মানজনক পদ দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি সেটা গ্রহণ করেননি।

গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি নিয়োগে সার্চ কমিটি গঠন প্রসঙ্গে পরে অর্থমন্ত্রী বলেন, গ্রামীণ ব্যাংকের আইনে যে সংশোধনী আনা হয়েছে, ছুটির কারণে সেটা প্রজ্ঞাপন আকারে জারি ও গেজেট আকারে প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। গেজেট প্রকাশের পরপরই সার্চ কমিটি গঠন করা হবে।

প্রসঙ্গ পদ্মা সেতু : পদ্মা সেতু নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, বিষয়টির সুরাহার জন্য সরকারের হাতে আর মাত্র ৭-৮ দিন সময় রয়েছে।
উল্লেখ্য, বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে পদ্মা সেতুর বিষয়টির সুরাহা করতে পদ্মা সেতু প্রকল্পের অন্য দুই অংশীদার এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) ও জাইকা তাদের চুক্তির মেয়াদ গত মাসে আরও এক মাস বাড়িয়েছিল। সে হিসাবে ৩১ আগস্ট তাদের চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে।

তবে আলোচনার অগ্রগতি বা আলোচনায় সরকার কতটা আশাবাদী—এ প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আলোচনা চলাকালে আমি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না। তবে বিশ্বব্যাংকের ঋণচুক্তি বাতিল করাটা অন্যায় হয়েছে। আমি চাই, বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন করুক।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

The Weeklydesh newspaper