ভাববেন না জিতে গেছি

1

“আমি দেশবাসীকে নির্বাচনের নামে ৫ জানুয়ারির কলঙ্কময় প্রহসন পুরোপুরি বর্জনের আহ্বান জানাচ্ছি। এই প্রহসনকে দেশে-বিদেশে কোথাও কেউ নির্বাচন হিসেবে বৈধতা দেবে না। এর মাধ্যমে বৈধতার খোলস ছেড়ে অবৈধ মূর্তিতে আবির্ভূত হবে আওয়ামী লীগ সরকার।”

নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিবৃতি ছিল এটি। নির্বাচন বানচাল করতে এমনিতেই অবরোধ কর্মসূচি দিয়ে রেখেছিল দলটি। এর সঙ্গে ৪৮ ঘণ্টার হরতাল যোগ করে বিরোধী নেত্রী এই বিবৃতিটি দিয়েছিলেন। লন্ডনে থাকা তার ছেলেও ভিডিওবার্তায় অনুরুপ বক্তব্য দিয়েছিলেন। তিনিও বলেছেন,“আজ সময় এসেছে আমাদের সবার ৫ জানুয়ারির নির্বাচন প্রতিরোধ, প্রতিহত এবং বর্জন করার। ব্যক্তিগত স্বার্থে নয়, দেশের অস্তিত্বের স্বার্থে।”

তার আগে ঢাকার ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম ‘প্লিজ, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বন্ধ করুন’ শিরোনামে নির্বাচন নিয়ে তার আকুতি প্রকাশ করেছেন। নিজ পত্রিকায় নিবন্ধটি ইংরেজিতে প্রকাশিত হলেও নির্বাচন এবং সরকারবিরোধী আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল পত্রিকাগুলো সেটি বাংলা করে প্রকাশ করেছে। ফলে খালেদা জিয়ার বিবৃতির মতোই মাহফুজ আনামের নিবন্ধটিও ব্যাপক প্রচার পেয়েছে।

কেবল বিএনপি চেয়ারপারসন বা ‘সুশীল’ সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচিত মাহফুজ আনামই যে নির্বাচন বন্ধের জন্য উচ্চকণ্ঠ ছিলেন তা নয়। ৪ জানুয়ারি প্রকাশ হওয়া ঢাকার প্রধান প্রধান দৈনিক পত্রিকাগুলোর দিকে চোখ রাখলেও দেখা গেছে ভোট নিয়ে, নির্বাচন নিয়ে, ভোটারদের উৎসাহিত করতে পারে এমন ইতিবাচক কোনো তথ্য বা সংবাদ নেই।

এমনকি জনগণকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আওয়ামী লীগের কোনো নেতা বা মন্ত্রীর কোনো বক্তৃতা বা বিবৃতিও চোখে পড়েনি। হয়তো তারা এমন কোনো আহ্বান জানাননি। অথবা তারা জানিয়েছেন, ঢাকার পত্রিকাগুলো দৃশ্যমান জায়গায় সেগুলো প্রকাশ করেনি।

সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতেও তারকাখ্যাতি পাওয়া সাংবাদিক বন্ধুদের অনেককেই দেখছি নির্বাচন প্রশ্নে সরকারের সমালোচনায় মুখর। অথচ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নে এদের প্রত্যেকেই সরকারকে নিঃশর্ত সমর্থনই কেবল দেননি, নানা ফোরামে সরব থেকেছেন। তাহলে?

অপ্রিয় হলেও সত্য, সরকার প্রচার-প্রচারণায় হলেও নির্বাচনের পক্ষে একটি আবহ তৈরি করতে পারেনি। সরকারের মন্ত্রীদের মধ্যে অধিকাংশই কথা বলেন না। দুএকজন যারা বলেন, তারা উপকারের চেয়ে দলের ক্ষতি বেশি করেন।

মাহফুজ আনাম বা ‘সুশীল’ সমাজের যারা নির্বাচন বন্ধ করতে উচ্চকণ্ঠ ছিলেন তারা বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতার কথা বলছেন। কিন্তু সমঝোতাটি হবে কীভাবে সেটি তারা বলছেন না। যেখানে জাতিসংঘের প্রতিনিধির মধ্যস্থতাও দুটি দলকে সমঝোতায় আনা যায়নি, সেখানে আর সমঝোতার সুযোগ থাকে কোথায়! এ ব্যাপারে তারা কিছু বলেন না।

হ্যাঁ, বিএনপি অবশ্য বলেছে, শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দিলে তারা নির্বাচনে আসবে। বিএনপি তাদের অবস্থানটা পরিষ্কার করে দিয়েছে। মাহফুজ আনাম বা ‘সুশীল’ সমাজও বিএনপির সেই দাবিই বাস্তবায়নের চেষ্টা করছেন কিনা, সে কথাটা তারা পরিষ্কার করে বলেন না। তারা সমঝোতার কথা বলেন। খালেদা জিয়ার এক দফা দাবিতে সম্মতি জানাতে হলে তো আর সমঝোতা হয় না। সমঝোতা হয় যখন দুই পক্ষই নিজ নিজ অবস্থান থেকে খানিকটা ছাড় দিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছে।

এ ক্ষেত্রে খালেদা জিয়ার কথা মেনে হাসিনাকে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে হলে ছাড়ের কোনো সুযোগ থাকে না। তবু মাহফুজ আনাম এবং ‘সুশীল’ সমাজ এ নিয়ে একটা চেষ্টা করে দেখতে পারতেন। কিন্তু তারা সেটি না করে, নির্বাচনের একদিন আগে নির্বাচন বন্ধের অনুরোধ জানিয়ে কঠিন নিবন্ধ লিখছেন। ধরে নিই, মাহফুজ আনামদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে সরকার নির্বাচন স্থগিত করে দিল। তারপর? বিএনপি যে কোনো ধরনের সমঝোতায় যেত তার গ্যারান্টি কি মাহফুজ আনামদের কাছে আছে?

বিএনপি একটি দাবি নিয়ে আন্দোলন করছে। নানা চেষ্টার পরও সরকারের সঙ্গে সমঝোতা না হলে বিএনপির একটাই পথ থাকে– আন্দোলন করে সরকারকে দাবি মানতে বাধ্য করা। গত কয়েক মাস ধরে জামাত-বিএনপি সে চেষ্টাটাই করে যাচ্ছে। কিন্তু তাদের আন্দোলনে জনগণ তো অনেক পরের কথা, নিজ দলের নেতাদেরও সম্পৃক্ত করতে পারেনি বিএনপি। বিএনপির আন্দোলন দমনে আজকে আওয়ামী লীগ যে আচরণ করছে, বিএনপিও একই আচরণ করেছে আওয়ামী লীগের সঙ্গে।

তৎকালীন বিএনপি সরকারের দমন-নিপীড়ন উপেক্ষা করেই আওয়ামী লীগ অন্তত দলের অগুণতি কর্মীদের মাঠে নামাতে পেরেছিল। বিএনপি সেটি করে উঠতে পারেনি। তারা হরতাল-অবরোধ ডেকে বসে থাকেন আর জায়গায় জায়গায় সন্ত্রাসীরা পেট্টোল বোমা মেরে, আগুনে পুড়িয়ে মানুষ মারেন। সুশীল সমাজ কিন্তু এই সহিংসতার বিরুদ্ধে জোরালো অবস্থান নেয়নি।

নির্বাচনের আগের দিন নানা জায়গায় স্কুলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হল। মিডিয়া, এমনকি মাহফুজ আনামের ডেইলি স্টারও বলেছে ‘আন আইডেন্টিফাইড মিসক্রিয়েন্টস’রা নাকি ভোট কেন্দ্রে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। তার মানে কী? জনগণ প্রতিরোধে নামেনি, রাজনৈতিক দল প্রতিরোধে নামেনি, দুর্বৃত্তরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ নানা স্থাপনায় নাশকতা চালাচ্ছে! তাহলে তো এটা রাজনীতির ব্যাপার নয়, দুর্বৃত্তপনার ব্যাপার, আইন-শৃংখলার ব্যাপার। সেখানে আর সমঝোতার কথা উঠে কেন? বরং সরকারের উচিত কঠোর হস্তে এইসব ‘অজ্ঞাত দুর্বৃত্তদের’ দমন করা।

মজার ব্যাপার, ঢাকার ‘সুশীল’ সমাজ যখন সমঝোতার জন্য চিৎকার করছে, ঠিক তখনই যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা সাময়িকী ফরেন পলিসি বলেছে, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের রোডম্যাপ তৈরি না করে কেবল নির্বাচন স্থগিত করার মধ্য দিয়ে (যেমনটা করতে অনেকেই পরামর্শ দিচ্ছেন) কোনো সমাধান বয়ে আনবে না। তারা বলছে, এ সমস্যার সমাধানে হল একটি সুষ্ঠু নির্বাচন এবং স্থিতিশীল ও দায়িত্ববান সরকার গঠন করা। এ জন্য শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে পরস্পরের প্রতি নাক সিঁটকানো বন্ধ করে সমাধানের রোডম্যাপ তৈরির জন্য সমঝোতায় উপনীত হতে হবে। সেই রোডম্যাপটি কীভাবে হবে সেটি নিয়ে কিন্তু মাহফুজ আনাম বা সুশীল সমাজ কিছুই বলেন না।

তবে নির্বাচনটা সরকারকে একটা চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। ‘বিএনপিকে নির্বাচনে আনা যেত না’– এটা আমি বিশ্বাস করি। তবে অন্যান্য প্রগতিশীল দলের সঙ্গে আওয়ামী লীগ সঠিক ব্যবহার করেনি। এ নিয়ে কেউ তর্ক করতে পারেন, কিন্তু শেখ হাসিনাকে যারাই বুদ্ধি দিয়ে ছোট ছোট প্রগতিশীল দলগুলো থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছেন, তারা যে সুবুদ্ধি দেননি এটি তো নিশ্চিত। নির্বাচনবিরোধী প্রবল প্রপাগাণ্ডার মধ্যে নির্বাচনের আগের দিনে এসে ‘মা–বেটা’ (শেখ হাসিনা এবং সজীব ওয়াজেদ জয়) ছাড়া নির্বাচন নিয়ে জোরালোভাবে কথা বলার জন্য আর কাউকে দেখা যায়নি।

বিগত নির্বাচনে ভূমিধ্বস জয় লাভ করে আওয়ামী লীগ যে সরকার গঠন করে, তাতে যোগ্যতার চেয়েও ‘অন্য কিছুকে’ গুরুত্ব দিয়ে অনেককে মন্ত্রীসভায় ঠাঁই দেওয়া হয়েছিল। ফলে সরকারের পুরো মেয়াদ ধরে প্রধানমন্ত্রীকেই সব মন্ত্রীদের হয়ে কাজ করে যেতে হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের কাজ, দলের কাজে এই মন্ত্রীরা ‘দক্ষতার’ পরিচয় দিতে না পারলেও, সম্পদ বানানোর ক্ষেত্রে কেউ কিন্তু কম দক্ষতার পরিচয় দেননি। একেকজনের ‘বৈধ’ সম্পদ বাড়ার ইতিবৃত্ত দেখে দলের নেতা কর্মী তো বটেই, জাতি স্তম্ভিত হয়ে গেছে। এই নেতারা নিজেদের সম্পদ বাড়ানো নিয়ে এতই ব্যস্ত ছিলেন যে, তারা এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ রাখার প্রয়োজন বোধ করেননি, এমনকি দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গেও তাদের যোগাযোগ ছিল না।

অনেককেই বলতে শুনি, একতরফা নির্বাচন, এতে আর হারজিতের কী আছে! এই ভাবনাটা একেবারেই ভুল। অবশ্যই হারজিতের আছে। ওই যে শেখ হাসিনা বলেছেন, ’ভাববেন না, জিতে গেছি, সবাই কেন্দ্রে যাবেন।‘ একতরফা হলেও এই নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের সবচেয়ে বড় ব্যারোমিটারই এটি– ভোটারদের উপস্থিতি। ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে হাজির করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের– এ কথা সত্য। তবু নির্বাচনে প্রার্থীরা ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে আনার ব্যাপারে তৎপর থাকেন। ভোটার সংখ্যা বাড়ানোর ব্যাপারে প্রতিটি প্রার্থীরই নিজস্ব তৎপরতা, পরিকল্পনা থাকে।

দল হিসেবে আওয়ামী লীগের এই ব্যাপারে কী পরিকল্পনা ছিল, তা আমাদের জানা নেই। তবে দল ও সরকার হিসেবে এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের হারজিতের ব্যারোমিটার কিন্তু ভোটার উপস্থিতি দিয়ে পরিমাপ হবে। গত পাঁচ বছরে ক্ষমতায় থেকে সুবিধাভোগী নেতারা দলের এই ক্রান্তিকালে কী ভূমিকা পালন করলেন, সেটিও কিন্তু দেখার বিষয়।

শেখ হাসিনার কথা ধার করে আমরাও আওয়ামী লীগকে বলতে পারি– ‘ভাববেন না জিতে গেছি’।

শওগাত আলী সাগর: দৈনিক প্রথম আলো’র সাবেক বিজনেস এডিটর, টরন্টো থেকে প্রকাশিত নতুনদেশ ডটকমের প্রধান সম্পাদক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

The Weeklydesh newspaper