নির্বাচনকালীন সরকার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব

cartoon


বিবিসি বাংলা বিভাগকে এক সাক্ষাত্কারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনের সময় বিরোধী দলের সমন্বয়ে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের প্রস্তাব দেন। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের উল্লেখ না করলেও কার্যত বিরোধীদলীয় নেতা ওই প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করলেন।

বিরোধীদলীয় নেতার বাইরে এ বিষয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অস্পষ্ট বক্তব্য দিয়ে জনগণকে বোকা বানানোর চেষ্টা করেছেন বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। কারণ, প্রধানমন্ত্রী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিন্যাস বা গঠন কী হবে এতে নির্বাচিত, না অনির্বাচিত ব্যক্তিরা থাকবেন, তা তিনি স্পষ্ট করেননি। মির্জা ফখরুল অবশ্য বলেন, প্রধানমন্ত্রী নীতিগতভাবে নির্দলীয় সরকার চাইলে তা নিয়ে বিএনপি আলোচনায় বসতে পারে। তবে তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের দাবি নির্বাচনকালে একটি নির্দলীয় সরকার থাকবে এবং তাদের অধীনেই নির্বাচন হতে হবে, যা ইতিমধ্যে দলের চেয়ারপার্সন বলে দিয়েছেন এবং এর বাইরে কোনো উপায়ে নির্বাচনে যাবে না বিএনপিসহ ১৮ দলীয় জোট।’ সর্বশেষ বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দেয়া বক্তব্য আমাদেরকে আরো আশাবাদী করে তুলেছে। তিনি বলেন, সরকার ইতিমধ্যে দলীয় সরকারের অবস্থান থেকে সরে এসে সর্বদলীয় সরকারের কথা বলেছে। আমরা এখন চিন্তা করছি নির্দলীয় সরকারের রূপরেখাটি কি হবে। অপরদিকে সম্ভাব্য নির্দলীয় সরকারের মেয়াদ ও কারা প্রধান উপদেষ্টা হতে পারেন সে বিষয়টি। দলীয় অবস্থান থেকে সরে এসে প্রধানমন্ত্রীর দেয়া সর্বদলীয় সরকারের প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে এ রূপরেখা তৈরি করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ও এর বিপরীতে বিরোধীদলীয় নেতা ও তার ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের বক্তব্যের আলোকে বলা যায়, আগামী নির্বাচন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী যেখানে একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ খুঁজছেন, সেখানে বিরোধী দল তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে চাইছে।

এখন বিভিন্ন গোলটেবিল বৈঠকে এ বিষয়ে তুমুল আলোচনা চলছে। আগামী নির্বাচন : প্রেক্ষিত ধরন ও গণতান্ত্রিক ধারা শীর্ষক সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে বিশিষ্ট ব্যক্তিরা আগামী সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তী সরকারের রূপরেখা তুলে ধরতে গিয়ে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের মন্ত্রী থাকবেন আনুপাতিক হারে। ওই মন্ত্রীরা পরবর্তী নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। ওই গোলটেবিল বৈঠকে বিচারপতি এবাদুল হক বলেন, বিরোধী দল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচনে যাবে না বলে হুমকি দেয়ায় দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে। নির্বাচনের ফলাফল যাতে প্রভাবিত না হয় সেজন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার সৃষ্টি। আগে যেভাবে নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করা যেত বর্তমানে সে সুযোগ খুবই কম।

অন্তর্বর্তী সরকারের রূপরেখা সম্পর্কে বিচারপতি এবাদুল হকের মূল্যায়ন হলো, নির্বাচনের তিন মাস আগে বিদ্যমান মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করলেও সংসদ চালু থাকবে, যারা অন্তর্বর্তী সরকারের মন্ত্রী হবেন তারা নির্বাচনে অংশ নেবেন না। এ প্রক্রিয়ায় নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় লোকদের অন্তর্বর্তী সরকারের মন্ত্রিসভায় আনুপাতিক হারে নিয়োগ দেয়া যেতে পারে। স্বরাষ্ট্র, জনপ্রশাসনসহ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে নিরপেক্ষ লোকদের নিয়োগ দেয়া যেতে পারে। গোলটেবিল বৈঠকে অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার অর্থ হলো রাজনীতির প্রতি অনাস্থা, তাছাড়া এ ব্যবস্থা তিন মেয়াদ পর্যন্ত চালু থাকার কথা ছিল, তাও পার হয়ে গেছে। কেউ অপ্রাপ্ত বয়স্ক হলে তার জন্য অভিভাবক হিসেবে তত্ত্বাবধায়ক লাগে। গণতন্ত্র বর্তমানে অপ্রাপ্ত বয়স্ক না হওয়ায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রয়োজন নেই।

একই গোলটেবিল বৈঠকে ব্যারিস্টার আমির-উল-ইসলাম বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার নয়, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য একটি শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন প্রয়োজন। গণতন্ত্রকে ক্ষমতায় আরোহণের উপায় হিসেবে না দেখে জনগণের ক্ষমতায়নের উপায় হিসেবে বিবেচনা করতে হবে এবং শক্তিশালী নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমেই তা সম্ভব। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য, বিরোধীদলীয় নেতার প্রতিক্রিয়া এবং বিভিন্ন গোলটেবিল বৈঠকে বিশিষ্টজনদের দেয়া রূপরেখা বিশ্লেষণে বলা যায়, ১৯৭৫ সালের পর থেকে গত ৩৭ বছরের সংঘাতময় রাজনীতি বিবেচনায় নিলে নিঃসন্দেহে বলা যায় প্রধানমন্ত্রীর এই উচ্চারণ সাহসী ও সময়োপযোগী। তিনি সংঘাতময় রাজনীতির অবসান চান বলেই বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে জিয়ার সন্দেহজনক ভূমিকার প্রশ্নটি অনিষ্পন্ন রেখে বিএনপিকে তার মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করার একটি প্রস্তাব দিয়েছেন। জাতীয় ঐক্যের জন্য এ ধরনের প্রস্তাব আলোর ইশারা হয়ে থাকবে ইতিহাসে। সামগ্রিক বিচারে বলতে হয়, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিকল্প হিসেবে প্রস্তাবিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হওয়ার রাজনৈতিক পরিবেশ দেশে বিদ্যমান নেই। তারপরও প্রধানমন্ত্রীর নতুন এই প্রস্তাবকে রাজনৈতিক সংস্কৃতির দৃষ্টিকোণ থেকে তাত্পর্যপূর্ণ বলতে হবে এই কারণে যে, এ ধরনের প্রস্তাব দেয়ার সত্সাহস আগের কোনো সরকারই দেখাতে পারেননি।

দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয় বলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার সৃষ্টি। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা যখন সৃষ্টি হয় তখন আমাদের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ দূরদর্শিতার পরিচয় দেননি। তারা যদি দূরদর্শী হতেন তাহলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নয়, তারা শক্তিশালী নির্বাচন কমিশনের জন্য আন্দোলন করতেন। আসলে দেশের কোনো রাজনৈতিক দলই আমাদের নির্বাচনী সমস্যার মূলে হাত দেয়নি। সব দলই চেয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ইত্যাদি ঠুনকো ব্যবস্থার পাঁক দিয়ে ক্ষমতায় যেতে। কিন্তু বর্তমান সরকার ক্ষমতারোহণের এই ফাঁক-ফোকরগুলো বন্ধ করতে বদ্ধপরিকর। যেহেতু বর্তমানে সরকারের অধীনে বিরোধী দল নির্বাচন করতে চাচ্ছে না, অথচ সংসদীয় গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখার জন্য যথাসময়ে নির্বাচন প্রয়োজন, সেহেতু প্রধানমন্ত্রী বিএনপিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে যোগ দিতে। বিরোধী দলকে এই বিষয়টি নিয়ে এজন্যই গভীরভাবে ভাবা উচিত যে, অন্তর্বর্তী সময়ে যে মন্ত্রী পরিষদ থাকবে সে মন্ত্রী পরিষদে বিএনপিও থাকবে। যে মন্ত্রী পরিষদের অধীনে নির্বাচন হবে সে মন্ত্রী পরিষদে বিএনপির অংশগ্রহণ থাকার পরও নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে না। আর যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ও তাহলে তা হবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে অংশ নেয়া বিএনপির মন্ত্রীদের জন্যই।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার উপযোগিতা বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় ফুরিয়ে গেছে এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়। এর কারণ হলো বর্তমান মহাজোট সরকারের সময়ে দেশে উপ-নির্বাচন হয়েছে, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হয়েছে, উপজেলা নির্বাচন হয়েছে, পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন হয়েছে। এই নির্বাচনগুলোতে সরকারি দল ও বিরোধী দল সমানতালে জিতেছে। বললে অত্যুক্তি হবে না যে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব নির্বাচনে সরকারি দলের চেয়ে বিরোধী দল ভালো করেছে। নির্বাচিত সরকার যদি নির্বাচনকে প্রভাবিত করতোই তাহলে বিরোধী দলের নির্বাচনে এত ভালো করার কথা না। সবচেয়ে বড় কথা হলো, স্থানীয় সরকার নির্বাচন, উপ-নির্বাচন তথা কোনো নির্বাচনেই কারচুপি হয়েছে এমন অভিযোগ বিরোধী দল তুলতে পারেনি। যেহেতু গত সাড়ে তিন বছরে কোনো নির্বাচনই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হয়নি। সব দলীয় সরকারের অধীনে হয়েছে এবং বিরোধী দল তাদের জনপ্রিয়তা অনুযায়ী জয়লাভ করেছে, সেহেতু বলা যায় আমাদের সময় হয়েছে তত্ত্বাবধায়কের অঙ্গন ভেঙ্গে বেরিয়ে আসার।

যেহেতু বিরোধী দল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চায়, সরকারি দল চায় না এবং সরকারি দল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার চায়, বিরোধী দল চায় না, সেহেতু বর্তমান বাস্তবতায় সরকারের উচিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এমন একটি রূপরেখা প্রণয়ন করা যাতে ওই সরকারে বিরোধী দল অংশ নেয় এবং নির্বাচনে যায়। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি হলো, রাজনৈতিক নেতৃত্ব যখন ক্ষমতায় থাকে, তখন স্থানীয় প্রশাসনের কোনো ভূমিকা থাকে না। স্থানীয় প্রশাসন অনেকটাই রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রভাবে পরিচালিত হয়। এ সমস্যা নিরসনে যৌথ নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন পরিচালিত হওয়ার ফর্মুলা বের করা দরকার। এই ফর্মুলায় প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রী যৌথ প্রশাসনের নেতৃত্ব দেবেন। এক্ষেত্রে দুটি দলের সমানসংখ্যক প্রতিনিধি নিয়ে একটি ছোট্ট মন্ত্রিসভা হতে পারে, যারা দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবেন না। এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলো দুই দলের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে দেয়া যেতে পারে। এই ফর্মুলা গ্রহণ করলে আগামী নির্বাচনের জন্য একটি শান্তিপূর্ণ পথ খুঁজে পাওয়া সহজ হবে। সরকার ও বিরোধী দল এই ফর্মুলা নিয়ে এগিয়ে গেলে জনগণের বুকের ওপর থেকে তত্ত্বাবধায়কের জগদ্দল পাথর নেমে যাবে এবং গণতন্ত্র আরো শক্তিশালী হবে।

লেখক : অধ্যাপক ড. মেসবাহউদ্দিন আহমেদ  (উপাচার্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়)

 

One Response to নির্বাচনকালীন সরকার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব

  1. Mr WordPress says:

    Hi, this is a comment.
    To delete a comment, just log in and view the post's comments. There you will have the option to edit or delete them.

Leave a Reply to Mr WordPress Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

The Weeklydesh newspaper